চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উন্নয়নশীল আটটি মুসলিম দেশের জোট ডি-৮’র (ডেভেলপিং-৮) ২০তম সম্মেলন। করোনাপরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে ওঠাসহ ভূরাজনৈতিক বিষয় গুরুত্ব পাবে এই বৈঠকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৭ জুলাই ঢাকায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনকে ঘিরে ব্যস্ত মন্ত্রণালয়। সদস্য দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এরই মধ্যে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এই সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোপুত্র বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। এছাড়া জোটের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোটের অন্য সদস্য দেশ মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও যথাযথ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে থাকা বাংলাদেশ দূতরা আমন্ত্রিতদের কাছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করবেন।
এবার ডি-৮ প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ফলে ঢাকার সম্মেলনে ডি-৮’র রজতজয়ন্তীও পালন হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ডি-৮ মন্ত্রী পর্যায়ের ২০তম সম্মেলন নিজ নিজ দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সুযোগ উল্লেখ করে সম্মেলনের গুরুত্ব তুলে ধরে সদস্য দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা আগামী বছরগুলোতে ডি-৮ সদস্য দেশগুলোকে বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও প্রভাবশালী ভূমিকায় নিয়ে যাবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে আটটি মুসলিম উন্নয়নশীল দেশের নেতারা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একমত হন। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার এবং ফলস্বরূপ অসংখ্য অংশীদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে অনেক ল্যান্ডমার্ক অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
বিলাওয়ালকে পাঠানো চিঠিতে মোমেন লিখেছেন, ‘আগামী ২৭ জুলাই ঢাকায় ডি-৮’র মন্ত্রী পর্যায়ের ২০তম অধিবেশনে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। পঁচিশ বছর আগে আটটি মুসলিম উন্নয়নশীল দেশের নেতারা অভিন্ন লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য ডেভেলপিং-৮ প্রতিষ্ঠায় একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে উপনীত হয়েছিলেন। আমি যখন সংগঠনটির যাত্রার দিকে ফিরে তাকাই তখন দেখি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে আমরা অনেক যুগান্তকারী অর্জন সাধন করেছি। আমি এ জন্য সন্তুষ্ট। আশা করি, আগামী বছরগুলোতে ডি-৮ সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা রয়েছে।’
বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডি-৮ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করতে যাচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী মোমেন বলেন, ‘এটি এমন একটি সময়, যখন আশাবাদের ধারণা নিয়ে আমরা বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯’র পুনরুদ্ধারের পর্যায় প্রত্যক্ষ করছি। এটি আমাদের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সুযোগ। এর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জোরদার এবং শক্তিশালী করার প্রয়াস চালাতে পারি। মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা ঐতিহ্যগত এবং উদীয়মান উভয় ক্ষেত্রেই সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এটি ডি-৮ প্রতিষ্ঠার রজতজয়ন্তীও বটে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অধিবেশনের সাইডলাইনে ব্যবসায়িক সেশন ছাড়াও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছেÑ যা ডি-৮ প্রতিষ্ঠার ২৫তম বছর স্মরণে আয়োজিত হবে। এটা সদস্য দেশগুলোর বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও জোরদার ও শক্তিশালী করবে।
সম্মেলনটি ঐতিহ্যগত এবং উদীয়মান উভয় ক্ষেত্রেই সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে, যা সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে উন্নীত এবং সংস্থার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে।
এবারের ডি-৮’র প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান উন্নত করা, বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি, নতুন সুযোগ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সদস্য দেশগুলোর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
মুসলিম প্রধান উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রাথমিক ধারণাটি তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ড. নেকমেটিন এরবাকান উত্থাপন করেছিলেন। তিনি ডি-৮’র ধারণা দেন ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ‘উন্নয়নে সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনারে। সভায় ডি-৮’র সীমানা নির্ধারণ করা হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত উন্নয়নশীল মুসলিম প্রধান দেশগুলো।
সেমিনারে বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ওই সম্মেলনটি ছিল ডি-৮ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। পরবর্তীতে ধারাবাহিক কয়েকটি বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালের ১৫ জুন তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আনুষ্ঠানিকভাবে ডি-৮ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের শেষে জারি করা ইস্তাম্বুল ঘোষণার মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
ডি-৮’র উদ্দেশ্য হলোÑ সংঘর্ষের পরিবর্তে শান্তি। বিরোধিতার পরিবর্তে সংলাপ। শোষণের পরিবর্তে সহযোগিতা। দ্বিমুখিতার পরিবর্তে ন্যায়বিচার। বৈষম্যের পরিবর্তে সমতা ও নিপীড়নের বদলে গণতন্ত্র।
