আজ করোনা টিকার ৭৫ লাখ বুস্টার ও দ্বিতীয় ডোজ

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২২, ০৬:৪০ এএম

আজ মঙ্গলবার এক দিনে দেশের ৭৫ লাখ মানুষকে করোনা টিকার তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ ও দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেবে সরকার। দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ও তুলনামূলক কম বুস্টার ডোজ পাওয়ায় এ বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এ কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলাসমূহের ওয়ার্ড পর্যায়ে ৬২৩টি স্থায়ী ও ১৫ হাজার ৫৫৮টি অস্থায়ী কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে। এ কর্মসূচিতে ৩৩ হাজার ২৪৬ টিকাদানকর্মী এবং ৪৯ হাজার ৮৬৯ জন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করবেন।

সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ পাওয়ার চার মাস পার হয়েছে এমন ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠী বুস্টার ডোজ পাবেন। পাশাপাশি প্রথম ডোজ পাওয়ার নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যারা দ্বিতীয় ডোজ নেননি এমন ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীকে দ্বিতীয় ডোজও দেওয়া হবে।

বুস্টার ডোজসংক্রান্ত এক নির্দেশনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ টিকা নিতে সবাইকে কভিড-১৯ টিকার কার্ড বা সনদ আনতে হবে। যেকোনো টিকাদান কেন্দ্র থেকেই টিকা নেওয়া যাবে। সকাল ৯টা থেকে টিকা দেওয়া শুরু হবে।

বুস্টার ডোজ ও দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘কভিড-১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন একটি কার্যকর সমাধান। ভ্যাকসিন কভিড-১৯ জনিত মৃত্যুঝুঁকি কমায়। গবেষণা হতে পাওয়া তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যারা অন্তত দুই ডোজ ভ্যাকসিনের পাশাপাশি বুস্টার ডোজ গ্রহণ করেছেন, তাদের অধিকাংশেরই আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আসুন চলমান কভিড-১৯ মহামারীকে আমাদের দেশ এমনকি সমগ্র বিশ্ব থেকে দূর করতে সব নেতিবাচক চিন্তা পরিত্যাগ করি। কুসংস্কার না ছড়িয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে সচেষ্ট হই।’ দেশের প্রান্তিক জনগণের দোরগোড়ায় ভ্যাকসিন পৌঁছে দেওয়ার এ মহতী উদ্যোগে সবার সহযোগিতাও কামনা করেন মন্ত্রী।

দেওয়া হবে ফাইজারের দুই ধরনের টিকা : কভিড-১০ টিকা ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন বাংলাদেশের কাছে দুই ধরনের ফাইজার টিকা রয়েছে। একটা হলো আগের টিকা, যেটা রাখতে হয় মাইনাস ৭০-৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রায়। কাউকে দেওয়ার আগে সেটা সাধারণ ২-৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় এনেই দিতে হয়। এ ধরনের টিকার সঙ্গে ডাইলুয়েন্ট মেশাতে হয়। সেই ডাইলুয়েন্ট রাখতে হয় ১৫-২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায়। এসব টিকা দেওয়া হবে কেন্দ্রগুলোতে। আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে দেওয়া হবে নতুন ধরনের ফাইজার। এ ধরনের টিকার সঙ্গে ডাইলুয়েন্ট মেশানোই থাকে। এটা ২-৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখা যায়। এটার জন্য আর আলাদা এসি রুমের প্রয়োজন হয় না। এগুলো আমরা একেবারে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত টিকার সাধারণ ক্যারিয়ারে করেই নিয়ে যেতে পারব।’

মজুদ না কমালে টিকা দেবে না কোভ্যাক্স : গতকালের সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে পাঁচ ধরনের (অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার, সিনোফার্ম, সিনোভ্যাক এবং জনসন ও জনসন) প্রায় ২ কোটি ৭৮ লাখ ডোজ টিকা মজুদ রয়েছে। কিন্তু সবাইকে বুস্টার ডোজ দিতে এবং ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনতে আরও ১০ কোটির মতো টিকা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে তিন কোটি টিকা পাওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে। আরও টিকা দরকার। সেই টিকা পাওয়া যাবে টিকার বৈশ্বিক জোট কোভ্যাক্স থেকে। তবে যেসব দেশে বিপুল পরিমাণ টিকা মজুদ আছে, তাদের টিকা দিচ্ছে না কোভ্যাক্স। সুতরাং মানুষকে দ্রুত টিকা নিতে হবে। মজুদ কমে আসার পর আবেদন করলে টিকা পাওয়া যাবে।

বিশ্বব্যাপী সমাদৃত বাংলাদেশ : গতকালের সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কভিড-১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই দেশের মোট জনসংখ্যার ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশকে করোনা টিকার প্রথম ডোজ, ৭০ দশমিক ৩ শতাংশকে দ্বিতীয় এবং ১৭ দশমিক ৯ শতাংশকে বুস্টার ডোজ দিয়ে সারা বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে। সরকার দেশের দুর্গম অঞ্চলসমূহে বসবাসরত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, ভাসমান জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী, পরিবহন ও কলকারখানাসহ সব স্তরের শ্রমিক, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, স্কুল-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ সব বিশেষ জনগোষ্ঠীকে কভিড-১৯ টিকার আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের টিকা নিশ্চিত করে সার্বিক সংক্রমণ হার হ্রাস করার মাধ্যমে জনজীবন ও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে স্থিতিশীল করতে সফল হয়েছি। এরই ফলশ্রুতিতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন পর খুলে দেওয়া হয়েছে। চলমান মহামারী নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের এই প্রয়াস বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে।’

শিগগির শিশুদের টিকা : সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, অচিরেই দেশের ৫-১১ বছর বয়সী শিশুদেরও কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনা হবে। সরকার এ বিষয়ে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রাথমিক পরিকল্পনা শেষ হয়েছে। বর্তমানে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্যান্য বয়সসীমার জনগোষ্ঠীর মতো ৫-১১ বছর শিশুদেরও সুরক্ষা ওয়েবপোর্টাল/অ্যাপে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ফাইজার করোনা টিকা দেওয়া হবে। টিকা নিতে সুরক্ষা রেজিস্ট্রেশনের জন্য শিশুদের ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন নাম্বারের প্রয়োজন হবে। এজন্য অভিভাবকদের দ্রুত শিশুর ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন শেষ করতে হবে।

বুস্টার ডোজ পেয়েছেন ২৫% মানুষ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে দ্বিতীয় ডোজের বিপরীতে বুস্টার ডোজ পেয়েছেন ২৫ দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ। এর আগে গত ৪-১০ জুন পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী বুস্টার ডোজের বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছিল সরকার। সেই সাত দিনে দেড় কোটি মানুষকে বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত দিতে পেরেছে ১ কোটি ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৬ জনকে।

বেশি ঢাকা বিভাগ ও গাজীপুর জেলায় : গত ১৭ জুলাই পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে বেশি বুস্টার ডোজ পেয়েছেন ঢাকা বিভাগ ও গাজীপুর জেলার মানুষ। ঢাকা বিভাগে পেয়েছেন বিভাগের মোট জনসংখ্যা ২২ শতাংশ ও গাজীপুরে ২৯ শতাংশ। বিভাগের মধ্যে খুলনায় ২১ শতাংশ, রংপুরে ১৮ শতাংশ, সিলেটে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ, বরিশাল ও ময়মনসিংহে ১৫ শতাংশ করে এবং চট্টগ্রামে সবচেয়ে কম ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ বুস্টার ডোজ পেয়েছেন।

জেলার মধ্যে গাজীপুরের পর সর্বোচ্চ বুস্টার ডোজ পেয়েছেন খুলনার ২৮ শতাংশ মানুষ। অন্যান্য জেলার মধ্যে বাগেরহাট ও নড়াইলের ২৬ শতাংশ, ঢাকা, পঞ্চগড় ও মুন্সীগঞ্জের ২৫ শতাংশ, নরসিংদীর ২৪ শতাংশ, ঠাকুরগাঁওয়ের ২৩ শতাংশ, রংপুর ও মাগুরার ২২ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জ ও রাজশাহীর ২১ শতাংশ এবং গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও মানিকগঞ্জের ২০ শতাংশ করে মানুষ বুস্টার ডোজ পেয়েছেন।

কম চট্টগ্রাম বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় : গত ১৭ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে সবচেয়ে কম বুস্টার ডোজ পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মানুষ। চট্টগ্রাম বিভাগে পেয়েছেন ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৯ শতাংশ মানুষ। এছাড়া সিরাজগঞ্জের ১০ শতাংশ, লক্ষ্মীপুরের ১১ শতাংশ, পাবনা, গাইবান্ধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নোয়াখালীর ১২ শতাংশ এবং চাঁদপুর, ময়মনসিংহ ও কুড়িগ্রামের ১৩ শতাংশ মানুষ বুস্টার ডোজ পেয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত