ক্রিকেটারদের গাড়ি ভাববেন না

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২২, ১২:১৫ এএম

৫টি ক্লান্তিকর ওভার, চেস্টার লি স্ট্রিটের মাঠে রোদে পোড়া লাল চেহারা, আর ৫টি ভুলে যাওয়া রান। ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের নায়কের শেষ ওয়ানডের টুকরো এগুলো। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৬২ রানের হার বেন স্টোকস ভুলে যেতে চাইবেন অবশ্যই। কিন্তু শেষ ওয়ানডের এই টুকরোগুলো কখনো কি ভুলতে পারবেন? স্টোকস পারবেন না। কারণ এই ক্লান্তির কারণেই যে পারফরমটা করতে পারছেন না। তাই ক্রিকেটের এই ফরম্যাটটাকে বিদায় বলে দিলেন। গত ২৫ দিন ধরে বলা যায় মাঠেই আছেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা। প্রথমে নিউজিল্যান্ড এরপর ভারত আর এখন দক্ষিণ আফ্রিকা। অবসরের ঘোষণা দেওয়া স্টোকস তো বলেই দিলেন ‘আমাদের গাড়ি ভাববেন না’।

মালিকরা গাড়িতে পেট্রল ভরেন আর চলতে থাকেন। স্টোকসের মতে ক্রিকেটারদের গাড়ি ভাবছেন ক্রিকেট নীতিনির্ধারকরা। তাই এত খেলা, ক্রিকেটাররা খেলতে পারবেন কিনা তা কেউ ভাবেন না। স্টোকস কিছুদিন আগে মানসিক অবসাদে খেলাটি থেকে বিরতি নিয়েছিলেন অনির্দিষ্ট কাল। কয়েকমাস পর ঐতিহ্যের অ্যাশেজে ফিরেছিলেন গত অস্ট্রেলীয় সামারে। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া মৌসুমের সময় জো রুটের কাছ থেকে পেয়েছেন টেস্ট নেতৃত্ব। যা স্টোকসের দায়িত্ব আরও বাড়িয়েছে। সঙ্গেও মাঠে উপস্থিতিও বেড়েছে, সমান মাত্রায় বেড়েছে চাপও। এতকিছু আর সইতে পারছেন না স্টোকস।

ইংল্যান্ড অলরাউন্ডারের বয়স এখন ৩১। ক্রিকেটারদের অবসরের সময় ধরা হয় ৩৬-৩৭ বছরকে। আর সেরা ফর্ম থাকে ৩৪-৩৫ বয়স পর্যন্ত! ধরা যাক স্টোকস আর ৪ বছর ক্রিকেট খেলবেন। তাহলে আরও ৫০ টেস্ট, অর্থাৎ ২৫০ দিন মাঠে থাকা। ৯০ ওভারে এক-একদিন ধরলে আরও ২২৫টি (প্রায়) ওয়ানডের সমান খেলা হয়ে যায় স্টোকসের। আন্তর্জাতিকে ১০ বছরে ১০৫ ওয়ানডে খেলেছেন এই ক্রিকেটার। আরও চার বছর ওয়ানডে খেললে সংখ্যাটা ১৫০-৬০ এ যাবে। তার মানে টেস্টে এমনিতেই ওয়ানডের কয়েকগুণ পরিশ্রম করতে হচ্ছে স্টোকসকে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট নেতৃত্ব পাওয়ার পর ‘নিজের সবটুকু উজাড়’ করে দেওয়ার পণ করেছেন স্টোকস। তা সাদা পোশাকের জন্য। টেস্টে নিজেকে বেশিদিন রাখতে হলে বিরতি নিতেই হবে স্টোকসকে। তাহলে ওয়ানডেতে সময় দেবেন কেন।

টেস্টে নিজের সবটা ঢেলে দিতে এখনই সতর্ক হয়ে উঠেছেন স্টোকস। খেলেননি ভারতের সঙ্গে টি-টোয়েন্টি সিরিজ। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গেও টি-টোয়েন্টি সিরিজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এমনকি নিজেদের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ দি হান্ড্রেডেও থাকছেন না তিনি। সবকিছুই টেস্টে নিজেকে আরও ভালোভাবে পাওয়ার জন্য। এখন ক্রিকেটাররা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে জাতীয় দল থেকে অবসরে যান। কিন্তু স্টোকস এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আর তাই ক্রিকেট নীতিনির্ধারকদের এক হাত নেওয়া তার পক্ষেই সাজে। নিজের অবসরে যেন বোর্ডগুলোর টনক নড়ে সেই আশা করে স্টোকস বলেন, ‘আমার গাড়ি না যে পূর্ণ করবেন (পেট্রল) মাঠে নামব এরপর আবার পূর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হব। আমাদের একটা টেস্ট সিরিজ মাত্র খেললাম। সঙ্গে-সঙ্গে আবার ওয়ানডে সিরিজ খেলতে হচ্ছে, এটা বোকামি ছাড়া আর কি। ক্রিকেটারদের ওপর সব ফরম্যাটের খেলা এখন বস্তার মতো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আগে এমন ছিল না। অবশ্যই আপনি যতটা সম্ভব ক্রিকেট খেলতে চাইবেন কিন্তু এমন অবস্থা চললে, মানে চার-পাঁচ মাস পেছনে তাকিয়ে যদি দেখেন শুধু ক্রিকেটই খেলেছেন তখন অবশ্যই আপনার ক্লান্ত ও বিরক্ত লাগবে।’

উদাহরণ হিসেবে জেমস অ্যান্ডারসন ও স্টুয়ার্ট ব্রডকে টানলেন স্টোকস। এ দুজন ইংল্যান্ডের হয়ে রঙিন পোশাকে শেষ খেলেছেন যথাক্রমে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে। এরপর শুধু টেস্টে এগিয়ে এসে ২০২২-এও দলটির বোলিং আক্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। স্টোকসের মতে কাজের চাপ কমিয়ে দুজনই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অ্যান্ডারসন ও ব্রডের মতো ১৫০ টেস্টের কোটা ছুঁতে হলে নিজেকেও এই পথে নিতে চান স্টোকস, ‘আমি ব্রডকে জিজ্ঞাস করেছিলাম সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল কিনা। সে বলল, যদি ক্যারিয়ার লম্বা করতে হয় এমন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। এখন সবাই চায় সব ফরম্যাটে সেরা ক্রিকেটাররা খেলুক। একইসঙ্গে ভালো পারফরমও চায়। কিন্তু দুটোই একসঙ্গে সম্ভব না। আমি এই চিন্তাই করেছি। আমি চাই ৩৫-৩৬ বয়সেও খেলে যেতে। তার জন্য আমাকে একটা ফরম্যাট থেকে সরে যেতেই হতো। টি-টোয়েন্টিতে আপনি ৪টা ওভার এদিক-ওদিক করে দিতেই পারেন। কিন্তু ওয়ানডেতে ১০ ওভার করতে হয়। তো সবমিলিয়ে আমি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে খুশি।’

অবশ্য ক্যারিয়ারের শেষ ওয়ানডেতে খুশি ছড়াতে পারেননি স্টোকস। তার দল হেরেছে ৬২ রানে। দক্ষিণ আফ্রিকার ৫ উইকেটে করা ৩৩৩ রানের জবাবে ২৭১ এ থামে ইংল্যান্ড। প্রোটিয়া ব্যাটার ফন ডার ডুসেন ১৩৪ ও মার্করাম ৭৭ রান করেন। ইংল্যান্ডের হয় সর্বোচ্চ ৮৬ জো রুট ও ৬৩ করেন জনি বেয়ারস্টো। আর কোনো ব্যাটার বড় স্কোর করতে পারেননি। লম্বা সময় ধরে খেলে যাওয়ার ক্লান্তিতেই ইংলিশ ক্রিকেটারদের পিছিয়ে দিয়েছে এ ম্যাচে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত