দেশব্যাপী লোডশেডিং চলছে। ঢাকা ও বরিশাল ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় সূচিভিত্তিক লোডশেডিংয়ে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রংপুর বিভাগের আট জেলায়। আবার দেশজুড়ে দাবদাহ চলছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সামান্য বৃষ্টি হলেও বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি, ফলে গরম অনুভূত হচ্ছে। সহসা লোডশেডিং থেকে মুক্তি মেলার সম্ভাবনা নেই। ভারী বৃষ্টিপাতের খবরও নেই। ফলে লোডশেডিং ও গরমে দিন পার করতে হবে জনগণকে।
সারা দেশে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি। ভ্যাপসা গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ। গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে রংপুরে তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র তাপমাত্রার পাশাপাশি এসব এলাকায় আর্দ্রতা বেশি ছিল। ফলে ভ্যাপসা গরম অনুভূত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল।
লোডশেডিংয়ের শীর্ষে উত্তরের আট জেলা: গতকাল বৃহস্পতিবার উত্তরবঙ্গের আট জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছিল। এসব জেলায় স্থানবিশেষে ৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
দেশ রূপান্তরের ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি ফিরোজ আমিন সরকার জানিয়েছেন, লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রাহকরা। এক ঘণ্টার স্থলে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। রাতে ভোগান্তি কয়েক গুণ বেশি। গ্রাহকদের অভিযোগ, মানা হচ্ছে না শিডিউল, লোডশেডিংয়ের সময়সূচি জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার অর্ধেক, কখনো তারও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের তথ্যও আগাম জানানো সম্ভব হচ্ছে না। ভ্যাপসা গরমে মানুষকে অর্ধেক রাত নির্ভর করতে হয় হাতপাখার ওপর। সন্ধ্যার পর পুরো শহরে ভুতুড়ে অন্ধকার নেমে আসে। বিদ্যুতের অভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যেও ক্ষতি হচ্ছে। লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের।
ঠাকুরগাঁও বাসস্ট্যান্ড, চৌধুরীহাট, ঠাকুরগাঁও শহর, অফিসপাড়া, ঘোষপাড়া, কলেজপাড়া, রোডবাজার এবং মথুরাপুর প্রতিটি ফিডারে দিনে ৪ ঘণ্টা এবং রাতে এক-দুই ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। বুধবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দিনে (পিক সময়েও) ১৮ মেগাওয়াটের স্থলে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে ৯ মেগাওয়াট এবং রাতে ১১ মেগাওয়াট। গতকাল সকালের পর সরবরাহ ছিল মাত্র ৮ মেগাওয়াট।
নেসকোর বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুনুর রশিদ বলেন, চাহিদার ৪০-৫০ ভাগ বিদ্যুৎ মিলছে। তাই লোডশেডিংয়ের সময় বেড়ে যাচ্ছে, গ্রাহকদের আগাম জানানো সম্ভব হচ্ছে না। একই চিত্র পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিরও। জেলায় পল্লীবিদ্যুতের চাহিদা ৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু বরাদ্দ মিলছে ২৫ থেকে ২৮ মেগাওয়াট। গ্রামাঞ্চলেও লোডশেডিংয়ের চিত্র একই রকম।
দেশ রূপান্তরের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি মো. জুয়েল রানা জানিয়েছেন, সরকারঘোষিত এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টার লোডশেডিং কুড়িগ্রামের কোথাও মানা হচ্ছে না।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ব্যাটারিচালিত ফ্যান ও চার্জার লাইটের দোকানে। নিম্ন আয়ের মানুষ, মধ্যবিত্তরাও ভিড় করছেন জেলার ইলেকট্রিক দোকানগুলোতে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাচালকরা পড়েছেন বিপাকে। পর্যাপ্ত পরিমাণে চার্জ করতে না পাড়ায় দৈনন্দিন আয় নিয়ে বিপাকে আছেন অনেকে।
গতকাল জেলা শহরে রাত ৭টা ও রাত ১২টায় লোডশেডিংয়ের কবলে ছিল পৌরবাসী। মুদি দোকানে মোমবাতির ব্যবসা বেড়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে রোপা আমন মৌসুমে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা।
নেসকো অফিস সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলা শহরে ৩০ হাজার গ্রাহকের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১২ মেগাওয়াট। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৬-৭ ও ৮ মেগাওয়াট।
কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ৭টি উপজেলায় ৪ লাখ ৬৬ হাজার গ্রাহকের দৈনিক চাহিদা ১২৯ মেগাওয়াট হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭৩ মেগাওয়াট। দিনের চাহিদা ৫৬ মেগাওয়াট, পাওয়া যাচ্ছে ৩১ মেগাওয়াট। রাতের চাহিদা ৭৩ মেগাওয়াট, পাওয়া যাচ্ছে ৪২ মেগাওয়াট।
সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের মিলপাড়ার ব্যবসায়ী মিন্টু মিয়া বলেন, ‘প্রচুর গরম আমাদের এখানে। বিদ্যুৎ ঠিকমতো না থাকায় রাতে ঘুমাতে পারছি না। ছোট বাচ্চারা ঘুমাতে পারছে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩-৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।’
কুড়িগ্রাাম পৌর শহরের ঘোষপাড়ার স্বপ্ন স্টোরের মালিক মোকছেদুল হক বলেন, ‘আমাদের শহরে গড়ে ৩-৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। যে পরিমাণে গরম পড়ছে বিদ্যুৎ ছাড়া ২ মিনিটও থাকা যায় না। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা করতেও সমস্যা হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (কারিগরি) মো. আবির হোসেন জানান, কুড়িগ্রামের ৭ উপজেলায় ৪ লাখ ৬৬ হাজার গ্রাহকের চাহিদা দিনে-রাতে ১২৯ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে ৭৩ মেগাওয়াট।
কুড়িগ্রাম নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলিমুল ইসলাম সেলিম জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ কম পাওয়ার কারণে লোডশেডিং একটু বেশি হচ্ছে। জেলা শহরে ৩-৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ১২ মেগাওয়াট চাহিদা, পাওয়া যাচ্ছে ৬-৭ ও ৮ মেগাওয়াট ।
দেশ রূপান্তরের দিনাজপুর প্রতিনিধি কুরবান আলী জানিয়েছেন, বৃষ্টি না থাকায় জমি ফেটে চৌচির। জমিতে আমনের চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে ধানের চারায় পানি দেওয়া যাচ্ছে না। গতকাল সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চারবার লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুতের শিডিউল বিপর্যয়ে রয়েছে দিনাজপুর। পাঁচবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। দিনাজপুর শহরের রাজবাটী এলাকার বাসিন্দা সমাপ্তী অধিকারী বলেন, শিডিউল অনুযায়ী দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত লোডশেডিং হওয়ার কথা। কিন্তু বুধবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা ২৭ মিনিট পর্যন্ত, দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত লোডশেডিং দেওয়া হয়। সকালে অল্প সময়ের জন্য দুবার লোডশেডিং হয়েছিল।
দিনাজপুর শহরের বটতলী এলাকার ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ী আক্তারুল ইসলাম বলেন, দিনে একবার বিদ্যুৎ যাওয়ার কথা থাকলেও চার-পাঁচবার যাচ্ছে। একই এলাকার মোটরসাইকেল পার্টস ব্যবসায়ী সৌরভ অধিকারী বলেন, ‘দিনাজপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও আমরা লোডশেডিংয়ের মধ্যে বসবাস করছি। দেশের অনেক জেলা রয়েছে, যেখানে কোনো লোডশেডিং দেওয়া হয় না। তাই দিনাজপুরের চাহিদা মিটিয়ে বাইরে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানাচ্ছি।’
দিনাজপুর নেসকো-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুর রহমান বলেন, এ ইউনিটের অধীনে চাহিদা ১৭.৭ মেগাওয়াট। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছ ১৩ মেগাওয়াট।
দিনাজপুর নেসকো-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন বলেন, এ ইউনিটের অধীনে চাহিদা ২২ থেকে ২৪ মেগাওয়াট, পাওয়া যাচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ মেগাওয়াট।
বৃষ্টির খবর নেই, ভ্যাপসা গরম গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত কয়েক দিনের তুলনায় অনেক কম। গত কয়েক দিন গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৪ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তারপর ভ্যাপসা গরম একই রকম। আগামী কয়েক দিনে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এটি দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। ফলে ওই এলাকার তাপমাত্রা কিছু কমেছে। এ ছাড়া ঢাকায় ১৩ মিলিমিটার, নেত্রকোনা ও পটুয়াখালীতে ১৪ মিলিমিটার এবং খুলনায় ১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এসব এলাকায় তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও বাতাসে জলীয় বাষ্পের কারণে গরম বেশি।
আগামী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়, রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে রংপুরে ৩৪, ময়মনসিংহে ৩২ দশমিক ৯, সিলেটে ৩৩ দশমিক ৮, চট্টগ্রামে ২৯ দশমিক ৩, খুলনা ও বরিশালে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
এসএমএসের মাধ্যমে লোডশেডিংয়ের তথ্য জানাতে হবে : সারা দেশে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের বিষয়ে বিতরণ সংস্থাগুলোকে সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গত বুধবার এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, দুটি এসএমএসের মাধ্যমে লোডশেডিংয়ের বিষয়টি গ্রাহকদের অবহিত করতে হবে। এসএমএস দুটি হলো
১. লোডশেডিং এবং নির্দিষ্ট এলাকার লোডশেডিংয়ের জন্য দুঃখিত।
২. নির্দিষ্ট সময়সূচির বাইরে কোনো লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কথা যাতে ভোক্তারা জানতে পারেন, সে কারণে হটলাইন, কমপ্লেইন সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট ডিউটি অফিসারের নম্বরে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হলো।
