বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামাল খানকে ‘কুপিয়ে জখম’ করতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথের বিরুদ্ধে। মেয়র কামালের সমর্থকরা বলছেন, মেহেন্দীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তৌহিদুজ্জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় তাকে সংসদ সদস্য নিজেই ওই নির্দেশের কথা জানান। এ ছাড়া কথিত ওই ফোনালাপের একটি অডিও ক্লিপ কয়েক দিন আগে ফাঁস হয়েছে। ১ মিনিট ৯ সেকেন্ডের অডিও ক্লিপটি ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দেশ রূপান্তরের হাতেও ওই অডিও রেকর্ড এসেছে।
তবে সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথের দাবি, ওই অডিও ক্লিপের কণ্ঠস্বর তার না। এটা নকল।
এদিকে পৌর মেয়র কামালকে ‘কোপানোর’ কথিত নির্দেশ দেওয়ার প্রতিবাদে এবং পঙ্কজ নাথের সংসদ সদদ্য পদ বাতিলের দাবিতে গতকাল শনিবার মেহেন্দীগঞ্জ পৌর শহরে লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের নেতাকর্মীরা। এ সময় পঙ্কজ নাথের ছবিসংবলিত বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ভাঙচুর করে বিক্ষোভকারীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেহেন্দীগঞ্জ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা অভিযোগ করে বলেন, এমপি পঙ্কজ নাথের অনুসারীরা ৪ জুলাই পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক রাতুল চৌধুরীকে কুপিয়ে দুই হাতের রগ কেটে দেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে কর্মসূচি পালনের জন্য রাতুলের অনুসারীরা পরদিন ৫ জুলাই পৌর ভবনের সামনে জড়ো হয়। খবর পেয়ে সেখানে ফোর্সসহ উপস্থিত হন মেহেন্দীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তৌহিদুজ্জামান। তখন তার মোবাইল ফোনে কল করেন এমপি পঙ্কজ। এ সময় মেয়র কামাল খানকে কোপাতে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে পুলিশ পরিদর্শককে জানান তিনি।
সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ এবং পরিদর্শক তৌহিদুজ্জামানের ১ মিনিট ৯ সেকেন্ডের কথিত ওই কথোপকথন নিচে তুলে ধরা হলো-
পঙ্কজ নাথ: তুমি কোথায় এখন?
পরিদর্শক (তদন্ত) : স্যার, আদাব স্যার।
পঙ্কজ: আদাব, ভালো আছেন? হ্যাঁ।
পরিদর্শক: জি স্যার। স্যার।
পঙ্কজ: আপনি কোথায় এখন? থানায় না, বাইরে?
পরিদর্শক: স্যার, আমি পৌরসভার সামনে আছি স্যার।
পঙ্কজ: যা হইছে হইছে। ওই শালায় তো খারাপ। ওরা মারামারি করলে আমাগো লোকজনরে কইয়া দিছি রামদা লইয়া ওপেন মিছিল করতে। কামাল খানরে শুইদ্দা কোপাইবে...ফাইজলামি করলে কিন্তু কামাল খান (পৌর মেয়র) কোপ খাইবে। আমি কইয়া দিছি...কেমন?
পরিদর্শক: আচ্ছা স্যার, দেখি।
পঙ্কজ: সিদ্ধান্ত হইছে মেয়র সামনে পড়লে মেয়ররে কোপাইব। যে সামনে পড়বে, তারেই কোপাইব। কেমন?
পরিদর্শক: আচ্ছা স্যার, দেখি স্যার। আমরা আছি স্যার, বাইরে আছি।
পঙ্কজ: ওসি কই? ওসি কই?
পরিদর্শক: ওসি স্যার বরিশাল আছে, স্যার।
পঙ্কজ: যে কোপ খাইছে (পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক রাতুল চৌধুরী) ওইডা খারাপ। নেশাখোর, অ্যাডিকটেড...তাই না? এ নিয়া যেন মাতবরি না করে, বাড়াবাড়ি না করে...আমি পোলাপানরে রেডি হইতে কইছি। তোরা রেডি হ...যা আছে কপালে...যুদ্ধ হইয়া যাইব একটা।
তবে সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথের দাবি, ওই অডিও ক্লিপের কণ্ঠস্বর তার না। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফোনালাপের বিষয়ে লোকমুখে জেনেছি। তবে আমি নিজে শুনিনি। এটা আমার কি না, সেটি নিশ্চিত না হয়ে খবর প্রকাশ করা ঠিক হবে না। আর হেমন্তের মতো সুর দিয়ে গান তো অনেকেই গাইতে পারে। এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’
অবশ্য সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথের সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়টি স্বীকার করেন পরিদর্শক তৌহিদুজ্জামান। তিনি গতকাল বিকেলে মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি অনেক আগের একটি ফোন কল ছিল। কিন্তু এটি কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল তা আমি বলতে পারছি না।’
পঙ্কজ নাথ বিরোধীদের সশস্ত্র বিক্ষোভ: পৌর মেয়রকে ‘কোপানোর’ কথিত নির্দেশের প্রতিবাদে এবং পঙ্কজ নাথের সংসদ সদদ্য পদ বাতিলের দাবিতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল দুপুর ১২টায় পৌর শহরের পাতারহাট বন্দরের শহীদ মিনার মাঠে সমাবেশ হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মইদুল ইসলাম। সমাবেশে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুনসুর আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাব আহমেদ ও সদস্য সৈয়দ মনিরসহ অন্যান্য নেতা বক্তব্য দেন।
সমাবেশ শেষে শহীদ মিনার মাঠ থেকে লাঠিসোঁটা, বাঁশ, রড ও বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র নিয়ে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি পৌর শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তেমাথা এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। মিছিল থেকে এমপি পঙ্কজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন নেতাকর্মীরা। মিছিলটির সামনে-পেছনে পুলিশ থাকলেও বিক্ষোভকারীরা সড়কের পাশে সাঁটানো এমপি পঙ্কজ নাথের ছবিসংবলিত বিভিন্ন শুভেচ্ছা বিলবোর্ড, ফ্যাস্টুন ও ব্যানার তছনছ করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মেহেন্দীগঞ্জ থানার পরিদর্শক তৌহিদুজ্জামান বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল।’
উল্লেখ্য, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৪ আসনে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এমপি পঙ্কজ দেবনাথ ও তার বিরোধী একটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। গত কয়েক বছরে দুই পক্ষের আধিপত্য নিয়ে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী নিহত ও গুরুতর আহত হয়েছেন।
সর্বশেষ ৪ জুলাই রাতে মেহেন্দীগঞ্জ পৌর শহরের চরহোগলায় রাতুল চৌধুরী নামে এক যুবককে কুপিয়ে জখম করা হয়। এমপি বিরোধী পক্ষ রাতুলকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা দাবি করলেও সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথ ও তার পক্ষের নেতারা তাকে সন্ত্রাসী ও মাদকসেবী হিসেবে দাবি করেন।
