‘শিক্ষা’ আর ‘দুর্নীতি’ শব্দ দুটি একইসঙ্গে উচ্চারিত হওয়াই লজ্জাজনক। কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে, সংবাদমাধ্যমকেও নিয়মিতই শিক্ষা খাতের দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন ছাপতে হয়, সম্পাদকীয় লিখতে হয়। শিক্ষাক্ষেত্রের প্রাণ যে শিক্ষকরা তাদেরও মুখে মুখে ফেরে ‘শিক্ষা ভবন’-এর দুর্নীতির কথা। কারণ, শিক্ষকরাই তাদের দুর্নীতির প্রধান শিকার। এই শিক্ষা ভবন হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এই শিক্ষা ভবন দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের আখড়া হিসেবে বহুল সমালোচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাঠপর্যায়ে গবেষণানির্ভর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, এমপিওভুক্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে পদে পদে ঘুষ লেনদেন করা হয় শিক্ষা ভবনে। অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এমনকি এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশ পাওয়া সহকারী শিক্ষকদেরও ঘুষ দিয়ে কাজে যোগ দিতে হয়। মাউশিতে এমন দুর্নীতি যে কতটা সর্বব্যাপী সেটা বোঝা যায় সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিত্ত-বৈভব দেখেও। এমনকি মাউশির দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরাও আয়ের সঙ্গে সংগতিহীনভাবে বিপুল সম্পদের মালিক।
দেশ রূপান্তরে বুধবার ‘এত কোটিপতি শিক্ষা ভবনে!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে মাউশির এই লাগামহীন দুর্নীতির বাস্তবিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। মাউশির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা বেতন পান ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এ টাকা দিয়ে রাজধানীতে সংসার চালানোই দায় হওয়ার কথা। কিন্তু তারা ব্যক্তিগত গাড়িতে অফিসে যান। রাজধানীতে তাদের আছে একাধিক ফ্ল্যাট। ঢাকার বাইরেও বাড়ি আছে, আছে বিপুল সম্পত্তি। কিম আশ্চর্যম বলে চোখ কপালে তোলা যেতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য হলেও এটাই বাস্তব এবং এটাই রূঢ় সত্য। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে মাউশির ১০৫ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে অন্তত ১৮ জনই কোটিপতি। তাদের প্রায় সবাই ১০ বছরের বেশি সময় ধরে মাউশি অধিদপ্তরে কর্মরত। অনিয়ম দুর্নীতি করে তারা বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। মাউশি অধিদপ্তরে একাধিক কর্মচারী-সিন্ডিকেট রয়েছে। কর্মচারীদের বদলি-পদায়নকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে প্রশাসন শাখার একটি সিন্ডিকেট। বেসরকারি মাধ্যমিক ও বেসরকারি কলেজের নাম সংশোধন, পদবি সংশোধন, বিভিন্ন অভিযোগ-নিষ্পত্তি, বকেয়া বেতন পরিশোধ প্রভৃতি কাজের জন্য গড়ে উঠেছে আরও দুটি সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেট-সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা বিভিন্ন কাজের জন্য নিজেরাই অর্থ গ্রহণ করেন; ভাগ দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও। এমন সব অনিয়ম দুর্নীতি করেই কর্মচারীরা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ঢাকায় ও নিজ নিজ এলাকায় তাদের আছে জমি, ভবন ও ফ্ল্যাট। তবে তাদের বেশিরভাগ সম্পদ স্ত্রী অথবা শ^শুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনের নামে। এমন অনেক কর্মচারী ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করলেও তারা হয়তো ‘চক্ষুলজ্জার’ কারণেই গাড়ি নিয়ে অফিসে ঢোকেন না। আশপাশের এলাকায় গাড়ি রেখে কিছুটা হেঁটে অফিসে যান।
খেয়াল করা দরকার, মাউশিতে নানা পর্যায়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ এমনকি মামলা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। যে কর্মচারীরা এমন দুর্নীতি করেন, ঘুষ নেন তারা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখেন। ফলে দুর্নীতির দায় কেবল কর্মচারীদের নয়, কর্মকর্তাদেরও। অন্যদিকে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও কোনো শাস্তি না দিয়ে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ বদলিই করা হয়। এতে কোনোভাবেই অনিয়ম দুর্নীতি কমার সুযোগ নেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, সেবা বিকেন্দ্রীকরণ ও সহজীকরণের কথা বলে ২০১৫ সালে এমপিও ব্যবস্থা মাউশির আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর হাতে ছেড়ে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ছয় বছর পর দেখা গেছে এতে দুর্নীতি তো কমেইনি বরং জটিলতা বেড়েছে। নানা সময়ে ১৮৪টি অভিযোগ তদন্তে মাউশিকে দায়িত্ব দিয়েছিল দুদক। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন পাঠাতে মাউশিকে ৪০টি চিঠি পাঠিয়েও জবাব না পাওয়ায় মাউশির মহাপরিচালককে তলবও করেছিল দুদক। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২০ সালে মাউশিতে শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ৮৬ জনের একটি তালিকা পাঠানো হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। একই বছর শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতির আরেক অভিযোগে শিক্ষা ক্যাডারের ৩০ কর্মকর্তাকে বদলির সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। মাউশির পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে বদলি করার জন্য শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর স্বাক্ষর জালের ঘটনাও ঘটে মাউশিতে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, মাউশির এই লাগাতার দুর্নীতির খুঁটির জোর এলো কোথা থেকে? এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেশে শিক্ষার মানের ওপরও সরাসরি ফেলছে। প্রশ্ন হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাউশির এমন লাগামহীন দুর্নীতি বন্ধে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
