যে জন্মদিনে লেগে থাকে মৃত্যুর অনুষঙ্গ

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২২, ০৫:২৭ পিএম

যে-খেলেনা রচিলেন মূর্তিকার/ মোরে লয়ে মাটিতে আলোতে/সাদায় কালোতে/ কে না জানে সে ক্ষণভঙ্গুর/ কালের চাকার নিচে নিঃশেষে ভাঙিয়া হবে চুর

বাংলা ১৩৪৬ সালে 'জন্মদিন' কবিতাটি লেখেন রবীন্দ্রনাথ। পুরীতে। জন্মদিন তো আনন্দ-উৎসব। জন্মদিন মানেই তো উদ্‌যাপন। শুভেচ্ছার বার্তা। তা হলে কেন এমন কয়েকটি লাইন লিখলেন কবি, যেখানে লেগে রয়েছে মৃত্যুর দাগছোপ? জন্মদিনে কি তা হলে এসেছিল মৃত্যুচেতনা?

জল্পনা চলতে থাকে, কিন্তু অস্বীকার করা যায় না যে, কারো কারো জন্মদিনে অবধারিত আসে মৃত্যুর অনুষঙ্গ। মৃত্যুই যেন স্মরণ করিয়ে যায় সেই ব্যক্তির জন্মমুহূর্ত। অন্তত এবার কেকের জন্মদিনে যে তার অসময়ে চলে যাওয়ার ঘটনার কথা ফিরে ফিরে আসবে অবধারিতভাবে, তা জানা ছিল। ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, মাত্র ৫৪ বছরে প্রয়াত না হলে কেকে-কে নিয়ে এই প্রতিবেদনটি লেখার প্রয়োজন হতো না। সত্যি বলতে, নাটকীয়ভাবে মৃত্যুতেই যেন নতুন জন্ম হলো কেকে-র। যে মৃত্যুর ঘটনায় লেখা হয়ে থাকল কলকাতার নাম।

শহরের এক অনুষ্ঠানে এসেই তো অসুস্থ হয়ে পড়েন কেকে। অনুষ্ঠান করেন। রীতিমতো লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে শেষবারের মতো মাতিয়ে দিয়ে যান শহরের শ্রোতাদের। প্রয়াণের পর যে টুকরো টুকরো ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল, তা দেখে মনে হয়, শিল্পীর অস্বস্তি হচ্ছে। তিনি ঘাম মুছছেন। কখনো জল খাচ্ছেন। ওপরের দিকে তাকাচ্ছেন। আবার ফিরে গিয়ে হাজার ওয়াটের আলোর ঝলকের সামনে দাঁড়াচ্ছেন। মাইক্রোফোন তুলে নিচ্ছেন হাতে। চিরচেনা স্বর ফিরে ফিরে আসছে তার কণ্ঠে। বিনোদনের উপকরণ জোগানোই যার উদ্দেশ্য ছিল, জীবনের শেষ কিছু মুহূর্তেও সেই কাজটি করে গেলেন তিনি। এমন মৃত্যুতে তো এক ধরনের আত্মশ্লাঘা থাকতে পারে। গর্ব থাকতে পরে। তাই না?

'এলিজি' বা 'মৃত্যুচেতনা' সম্পর্কে কেকে-র ধারণা কী ছিল জানা যায় না। তবে, তা থেকে থাকলে এমন চলে যাওয়া যেকোনো শিল্পী চাইতে পারেন, তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। বলতে গেলে গান গাইতে গাইতেই চলে গেলেন তিনি।

বস্তুত, বলিউডের সঙ্গীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ ওরফে কেকে নব্বই এবং দু'হাজারের দশকে একাধিক সুপার হিট গান গেয়েছেন। তথ্য বলে, ১১টা ভাষায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিজ্ঞাপনী জিঙ্গেল রেকর্ড করেছেন কেকে। শাহরুখ খান, রণবীর সিং কিংবা সালমান খানের নেপথ্যকণ্ঠ হিসেবেও জনপ্রিয় হয়েছে তার গান। অজস্র অনুষ্ঠান করেছেন দেশ-বিদেশে। তার অনুষ্ঠানে মোহিত হয়েছে কয়েক প্রজন্ম।

অথচ, সঙ্গীতে কেকে-র প্রথাগত শিক্ষা ছিল না। মায়ের কণ্ঠের গান শুনে সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। স্বরলিপি নয়, সুর শুনে গান তুলতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। নিজের কণ্ঠস্বরের ওপর আস্থা রেখে, পুরোপুরি নিজস্ব স্টাইল বজায় রেখে সঙ্গীত পরিবেশন করে গিয়েছেন। যা হয়তো তাকে স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে তার প্রজন্মের অন্য গায়ক কুমার শানু, অভিজিৎ, সনু নিগমের থেকে। ফলে, শুরু থেকেই কেকে ছিলেন 'নিজের মতো'। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে বলিউডও হয়তো এমন এক 'ফ্রেশ' কণ্ঠেরই খোঁজে ছিল।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুরস্কার নয়, তার লক্ষ্য ছিল মানুষের হৃদয়ে জায়গা। মানুষের ভালোবাসা যে তার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল, তা প্রমাণ করেছিল তার অকালপ্রয়াণ এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। জন্মদিনে ফিরে ফিরে আসবে তার কণ্ঠ, তার গল্প। জীবনে শক্তি পাওয়া যায় এমন কিছু গান আবারও শোনা হবে। শুধু এই দিনটিতেই নয়, কেকে থাকবেন কয়েক প্রজন্মের হৃদয়ে 'আপন আসনে মাটিতে আলোতে, সাদায় কালোতে'।

কে না জানে জীবন ক্ষণভঙ্গুর। তাই বলে এতটাও কি, যেখানে মাত্র ৫৪-তেই থমকে যেতে হয় এমন এক প্রাণচঞ্চল শিল্পীকে? অস্বীকার করা যাবে না, কেকের এই জন্মদিনে লেগে থাকবে মৃত্যুর অনুষঙ্গ।

ওহ বলাই হলো না, শুভ জন্মদিন কেকে! সূত্র : আনন্দবাজার (ঋতপ্রভ বন্দ্যোপাধ্যায়)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত