তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির বিক্ষোভ-সমাবেশ কর্মসূচিতে হামলা-সংঘর্ষের ঘটনায় দলটির নেতারা মনে করছেন, ক্ষমতাসীনরা আগের মতো আন্দোলন দমনে হামলা-মামলার পথেই এগোচ্ছে। তারা বলছেন, হামলা-মামলা করে আর বিএনপিকে দমন করা যাবে না। তৃণমূলের কর্মসূচি শেষে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি আসবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত একের পর এক কর্মসূচি দেওয়া হবে। সরকারের পতন না ঘটিয়ে নেতাকর্মীরা ঘরে ফিরে যাবে না।
গতকাল শনিবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন তারা রাজপথে বিএনপিকে মোকাবিলা করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পুলিশের ছত্রছায়ায় বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর এবং তাদের বাসা-বাড়িতেও হামলা করছে। আবার পুলিশকে দিয়ে মামলাও করাচ্ছে। বিএনপির কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের ঢল দেখে আতঙ্কিত হয়ে আওয়ামী লীগ হামলা চালাচ্ছে বলে দলটির নেতারা দাবি করেন।
লোডশেডিং ও জ্বালানি তেলের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে বিএনপির ডাকা কর্মসূচিতে ভোলায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নূরে আলম ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আব্দুর রহিমের মৃত্যু, ঢাকা এবং কুমিল্লায় পুলিশের হেফাজতে দুজনের মৃত্যু ও সারা দেশে জ্বালানি তেল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে থানা, উপজেলা, পৌরসভা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি।
কর্মসূচির প্রথম দিন গত ২২ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির বাসায় হামলা ও ভাঙচুর চালায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। হামলায় এ্যানির ছেলে শাহরিয়ার চৌধুরী, ভাই আরিফুল ইসলাম, কেয়ারটেকার এম কে আরিফ ও মানিকসহ ৪ জন আহত হয়েছেন। ওইদিন আরও কয়েকটি জেলায় হামলার ঘটনা ঘটে। তারপর একের পর এক হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের আসামি করে মামলা হয়েছে।
গত কয়েকদিনের হামলার ঘটনা তুলে ধরে গতকাল গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি দাবি করেন, ‘গত ২২ আগস্ট বিএনপি চলমান কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত ৫০টির অধিক জেলায় হামলা হয়েছে, আহত হয়েছে প্রায় তিন শতাধিক ও গ্রেপ্তার হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। আসামি করা হয়েছে প্রায় দুই হাজার মানুষকে এবং মামলা করা হয়েছে ১৫টার ওপরে। এ ছাড়া১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে প্রায় ২০টার মতো জায়গায়।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যশোরে প্রয়াত বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলামের বাড়িতে, জেলার সাধারণ সম্পাদক সাবেরুল ইসলাম সাবু, মিজানুর রহমান, লক্ষ্মীপুরে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির বাড়িতে, টাঙ্গাইলের সফীপুরে আহমেদ আজম খানের গাড়িতে হামলা হয়েছে।’ তার নিজের জেলা ঠাকুরগাঁওয়েও দলের কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আন্দোলন থেকে পিছু হটার প্রশ্নই ওঠে না।’
মির্জা ফখরুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপিকে মোকাবিলা করতে সরকার ক্যাসিনো, জুয়া, মাদক ব্যবসাসহ জঘন্য অপরাধে জড়িত অপরাধীদের ছেড়ে দিচ্ছে। সরকার গুন্ডা, মাস্তানদের দিয়ে জনগণকে ভয় দেখিয়ে দমন করে রাখতে চায়।’
গত বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইলের সখীপুরে কর্মসূচি পালন করে ফিরছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান। এ সময় পেছন থেকে তার গাড়িবহরে হামলা হয়। এ হামলার জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার যখন দেশে ছিলেন তখন প্রধানমন্ত্রী বললেন, বিরোধীদলীয় কর্মসূচিতে বাধা না দিতে। অথচ বাস্তবে দেখছি, শুধু পুলিশ না, সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর যৌথভাবে হামলা করছে। জনপ্রিয়তা হারিয়ে আতঙ্কে আমাদের দলের নেতাকর্মীদের ওপর দানবীয় রূপে হামলা করছে। বিএনপিকে কোনো স্পেস দিতে চাচ্ছে না।’
সিরাজগঞ্জে বিএনপির সমাবেশে হামলার বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আওয়ামী লীগসহ তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা বলে বিএনপি নাকি নেই। তৃণমূলে দলের কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের যে ঢল নেমেছে সেটাই প্রমাণ করছে দেশে বিএনপি আছে নাকি নেই। নেতাকর্মীদের ওপর অন্যায়ভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা যৌথভাবে হামলা করছে। মিথ্যা মামলা দায়ের করে নেতাকর্মীদের কারাগারে নিচ্ছে।’
গত শুক্রবার সকালে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার শ্রীনগর-দোহার বাইপাস সড়কে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা করে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। এতে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিবসহ অন্তত ৫০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করছে দলটি।
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগ হামলা করেছে। হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় থানা বিএনপি’র সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলামকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আমাদের মারল অথচ পুলিশকে নিয়ে আবার আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে।’ একইদিন নরসিংদীর রায়পুরায় বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক খায়রুল কবির খোকন এবং সদস্য রফিকুল আমিন ভুঁইয়াসহ অনেক নেতাকর্মীকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অবরুদ্ধ করে রাখে বলে দলটির অভিযোগ।
নোয়াখালীতে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় পুলিশ নোয়াখালীর তিন থানায় একাধিক মামলা করে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম দিন নোয়াখালীর সুবর্ণচরে আমরা কর্মসূচি পালন করি। সেখানে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। এটা দেখে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরা রাজপথে না নেমে পুলিশকে দিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করে নেতাকর্মীদের কারাগারে পাঠাচ্ছে। পুলিশকে দিয়ে তারা বিএনপিকে মোকাবিলা করছে।’
