শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে বিধি বহির্ভূতভাবে ২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের আরো এক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা গুলশান বিভাগ (ডিবি)। তার নাম মো. মাইনুল ইসলাম।
তিনি গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সহ-সভাপতি।
বুধবার কুমিল্লা সদর থানার মগবাড়ি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এ সময় তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, দুইটি মোবাই ফোন এবং ঢাকা ব্যাংকের ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার একটি চেক উদ্ধার করা হয়।
রবিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টোরোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
তদন্তে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক চেয়্যারমেন ড. মুহম্মদ ইউনূসের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গিয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে ডিবি প্রধান বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করি এখানে এমডি সাহেব (নাজমুল ইসলাম) তার দায় এড়াতে পারেন না। আমরা তদন্ত করছি, আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গত ৪ জুলাই গ্রামীণ টেলিকম কর্মচারী এবং টেলিকম ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান মিরপুর মডেল থানায় প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মামলা করেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ডিবি-গুলশান বিভাগকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে ডিবি পুলিশ দেখতে পায়, গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে নিয়োজিত শ্রমিক কর্মচারীদের স্থায়ীকরণ না করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ক্রমাগত নবায়ন করে। শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী বাৎসরিক লভ্যাংশের ৫% অর্থ ৮০:১০:১০ অনুপাতে ওয়ার্কারর্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড, শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড এবং শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বরাবর প্রদান করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির “কর্মচারীরা স্থায়ী নয়” এবং “কোম্পানি অলাভজনক” ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার কথা বলে শ্রমিকদের আইনানুগ লভ্যাংশ দেওয়া থেকে বিরত থাকে। বিভিন্ন আইনানুগ দাবি-দাওয়ার কারণে ২০২০ সালের ২৫ অক্টোবর গ্রামীণ টেলিকম কর্তৃপক্ষ একযোগে বেআইনিভাবে ৯৯ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করে। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ ও লভ্যাংশ পাওনা, বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরে কোম্পানিতে পুনর্বহাল না করা, কোর্টের আদেশ অনুযায়ী পুনর্বহালের পরেও দায়িত্ব না দিলে-কনটেমপ্ট অব কোর্ট, কোম্পানির অবসায়নসহ অন্যান্য দাবিতে শ্রমিকরা এবং শ্রমিক ইউনিয়ন গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় শ্রম আদালত এবং হাইকোর্টে প্রায় ১৯০টি মামলা ও রিট পিটিশন দায়ের করেন। তড়িঘড়ি করে অনেকটা গোপনে এ সব মামলা উত্তোলন, শ্রমিকদের অর্থ প্রদান এবং প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা লক্ষ্য করা যায়।
মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, গ্রামীণ টেলিকম এবং গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত ১০ মে ঢাকা ব্যাংক গুলশান শাখায় একটি সেটেলমেন্ট একাউন্ট খোলা হয়। ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর কোম্পানির মোট লভ্যাংশের ৫% টাকা হারে কোম্পানি থেকে এই সেটেলমেন্ট একাউন্টে প্রায় ৪৩৭ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। একাউন্টটি থেকে অর্থ উত্তোলনের জন্য গ্রামীণ টেলিকমের এমডিকে বাধ্যতামূলক সিগনেটরি এবং ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অন্য দুই সিগনেটরি হিসেবে রাখা হয়। নিয়মানুযায়ী শ্রমিকদের সব পাওনা ওই একাউন্ট থেকেই পরিচালিত হওয়ার কথা। চুক্তি অনুযায়ী সেটেলমেন্ট একাউন্ট হতে শ্রমিকদের পাওনা এবং ৫% অগ্রিম কর ব্যতীত অন্য কোনো অর্থ ছাড়ের সুযোগ না থাকলেও বিধিবর্হিভূতভাবে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং ইতিপূর্বে অত্র মামলায় গ্রেপ্তার শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও গ্রেপ্তার শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মো. মাইনুল ইসলামসহ ইউনিয়নের কতিপয় নেতার যোগসাজশে উক্ত একাউন্টের অনুমান ৪৩৭ কোটি টাকা থেকে চেকের মাধ্যমে গত ১৭ মে এবং ২৫ মে ২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক ইউনিয়নের ডাচ বাংলা ব্যাংকের একাউন্টে নিয়ে আসা হয়।
তিনি বলেন, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক ইউনিয়নের উক্ত একাউন্টের মোট তিনজন সিগনেটরি ছিলেন ইতিপূর্বে অত্র মামলায় গ্রেপ্তার সভাপতি, সা. সম্পাদক এবং মামলার বাদী অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান। অন্যান্য শ্রমিকদের ন্যয় টাকা পাওয়ার পরেও যোগসাজশে সিবিএ সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সেক্রেটারি ফিরোজ মাহমুদ হাসান এবং সহ-সভাপতি মাইনুল হাসান ইউনিয়নের একাউন্ট থেকে মিরপুরে তাদের ডাচ বাংলা ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকের একাউন্টে তিন কোটি করে মোট ৯ কোটি টাকা স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেন। ইউনিয়নের নিয়োজিত আইনজীবী অযৌক্তিক ও অতিরঞ্জিতভাবে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ফি/পারিতোষিক হিসেবে হাতিয়ে নেয়।
তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত মো. মাইনুল ইসলাম মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং জানায় যে, গ্রামীন টেলিকম কর্তৃপক্ষ তাকেসহ উক্ত প্রতিষ্ঠানের আরো সহকর্মীদের অর্থের প্রলোভনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ভয়-ভীতি দেখিয়ে গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে দায়ের সব মামলা প্রত্যাহারের জন্য এবং কর্মচারী ইউনিয়নের নিয়োজিত আইনজীবীকে অযৌক্তিক ও অতিরঞ্জিতভাবে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ফি/পারিতোষিক প্রদান করতে উৎসাহী করে। অন্যান্য শ্রমিকদের ন্যায় মাইনুল ইসলাম আইনানুগভাবে প্রাপ্য ৪ কোটি টাকা নেয়ার পরও তার ডাচ বাংলা ব্যাংকের একাউন্ট নম্বরে ২ কোটি এবং ব্রাক ব্যাংকের একাউন্ট নম্বরে ১ কোটিসহ অতিরিক্ত মোট ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এবং তার অন্য দুই সহকর্মী অর্থাৎ টেলিকম ইউনিয়নের সভাপতি এবং সেক্রেটারিসহ সর্বমোট ৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা টাকা আত্মসাৎ করে প্রতারণা করেছে। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে গ্রেপ্তার আসামি সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে ডিবি হেফাজতে রয়েছে।
