এমন দিনে এভাবে হার মানা যায় না। এতদিন ব্যাটারদের দিকে আঙুল উঠেছিল। কাল ব্যাটাররা সব বদলে দিলেন। অথচ এদিনই চুপ মেরে গেলেন বোলাররা। ওয়াইড, নো দিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ হারালেন। সঙ্গে হারল বাংলাদেশ। এশিয়া কাপের সুপার ফোর স্বপ্ন টিকতে গিয়েও তাই ভেঙে গেল। কাল গ্রুপ ‘বি’র অলিখিত ফাইনালে শেষ ওভারে ২ উইকেটে হারলেন সাকিব আল হাসানরা। আগে ব্যাট করে সাহসী ক্রিকেটের উজ্জীবিত প্রদর্শনীতে চোখ ও মনে প্রশান্তি দিয়ে বাংলাদেশ ৭ উইকেটে ১৮৩ রান তোলে। কিন্তু শ্রীলঙ্কাকে আটকে রাখা যায়নি। প্রবল রোমাঞ্চ ছড়ানো ম্যাচটিকে শেষ ওভারে টেনে নিয়ে শেখ মাহেদীর নো বলে ৩ রান নিয়ে জিতে যায় শ্রীলঙ্কা। নিজেদের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে দ্বিতীয় সেরা রান তাড়ার নজির গড়ে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা।
দিনটিতে হাসিমুখে মাঠ ছাড়ার কথা ছিল বাংলাদেশেরই। এতদিনের চাওয়া সাহসী ক্রিকেট দিয়ে যেভাবে ম্যাচ শুরু করেন সাকিবরা তাতে স্বপ্ন বেলুন ফুলে ঢোল। ফিল্ডিংয়ে অসাধারণ সব ক্যাচ, অভিষিক্ত এবাদতের চোখধাঁধানো প্রথম দুটি ওভার কিন্তু এরপরই নিয়ন্ত্রণ হারাল বাংলাদেশ সঙ্গে ম্যাচও হাতছাড়া হলো। প্রথম দুই ওভারে মাত্র ১৩ রানে ৩ উইকেট নেওয়া এবাদত ফিরতি স্পেলে এসে দুই ওভারে দিলেন ৩৯ রান। এবাদত ১৩তম ওভারে স্পেলের তৃতীয় ওভার করতে এসে দিলেন ২২ রান। ওই ওভারেই শ্রীলঙ্কা ম্যাচে ফেরার পথ পেয়ে যায়। ওই ওভার পাশে রাখলে হতাশা বাড়াবে চারটি নো বল ও আট ওয়াইড। বাড়তি বলগুলো মানে দুই ওভারে রানও গুনতে হয়েছে বাংলাদেশকে। দুর্দান্ত খেলেও এই আক্ষেপ কুরে কুরে খাবে সাকিবদের।
দুর্দান্ত দিনটিতে ক্যাচ মিসের ব্যর্থতাও আছে। এক কুশল মেন্ডিসই তিনবার জীবন পেয়েছেন ক্যাচ পড়ার কারণে। ৩, ৩০ ও ৩২ রানে তিনটি জীবন পাওয়া মেন্ডিস পরে ৬০ রান করেন। তার সঙ্গে ম্যাচ জয়ের অন্যতম নায়ক দাসুন শানাকা করেন ৩৩ বলে ৪৫ রান। এ দুজনের ৩৫ বলে ৫৪ রানের জুটি শ্রীলঙ্কাকে ম্যাচে রাখে। তবে শেষদিকে বোলারদের নিয়ে শানাকার লড়াই দলকে জয়ের পথ করে দেয়।
অথচ দারুণ এক ব্যাটিং উপহার দিয়েছিল বাংলাদেশ। তিন বছর পর একাদশে ফিরেই স্কুপ শট এবং চার। মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলে সাব্বির রহমানের এই শট বাংলাদেশের চেষ্টার প্রমাণটা দিল। শট খেলার এ মানসিকতাটাই যে আসছিল না এতদিন। অন্যপ্রান্তে থাকা মেহেদী হাসান মিরাজের অভিপ্রায় প্রথম থেকেই বিধ্বংসী। ‘পারতেই হবে’ মানসিকতায় আরও সাহস দেখিয়ে একে একে আফিফ-মাহমুদউল্লাহ-মোসাদ্দেকরা রানের পিছু ছুটলেন। ভয়ডরহীন সেই চেষ্টায় এবার সফলই বলা যায় বাংলাদেশের ব্যাটিং। প্রথম ছয় ওভারে (পাওয়ার প্লে) এলো ৫৫ রান আর শেষ ৫ ওভারে ৬০।
একাদশে তিন বদল নিয়ে নামে বাংলাদেশ। দুই ওপেনার নাঈম শেখ, এনামুল হক বিজয় এবং মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ছিলেন না একাদশে। পেসার এবাদত হোসেনের অভিষেক হলো। দেশের ৭৭তম টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার তিনি। এছাড়া ২০১৯-এর আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়েকে নিয়ে হওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজের পর একাদশে ডাক পেলেন সাব্বির। আর মিরাজ ওপেনিংয়ে খেলার প্রয়োজনীয়তাতেই ফিরলেন দলে। এসব অবশ্য গৌণ হয়ে গেল টসের সময়। ধারাভাষ্যকারদের কথায় উঠে এলো ম্যাচের আগে দুই দলের কথার লড়াই। নিউজিল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার স্কট স্টাইরিস সাকিবকে বলেও বসলেন। অবশ্য উত্তপ্ত আগুনে পানি ঢেলে দেন সাকিব। জানালেন এসব চিন্তা না করে মাঠে মনোযোগী থাকতে চান।
কিন্তু মাঠের খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ তো ছিলই। ব্যাটারদের প্রতি শটে ছড়াচ্ছিল রোমাঞ্চ। ওদিকে প্রতি উইকেট নেওয়ার পর লঙ্কানদের শরীরী ভাষায় ছিল দেখিয়ে দেওয়ার ভঙ্গি। তবে সবকিছুই ছাপিয়ে চোখ জুড়িয়ে দিল বাংলাদেশের ব্যাটিং। অনেক দিন পর টি-টোয়েন্টি মেজাজে দেখা দিলেন ব্যাটাররা। শুরু করেন মিরাজ। শুরু থেকেই প্রতি বলে শট খেলার ইচ্ছায় ব্যাট ছুড়ছিলেন। অনেক শট ঠিকঠাক ব্যাটে না লাগায় চার-ছক্কা হয়নি। নয়তো মিরাজের নামের পাশে দুটি করে চার-ছক্কা নয় আরও বেশি থাকত। শেষ পর্যন্ত দারুণ একটি ইনিংস খেলে ২৬ বলে ৩৮ রানে থামেন মিরাজ। ওদিকে সাব্বির দলে ফেরার ম্যাচে দারুণ শুরু করেছিলেন। কিন্তু আসিথার একটি এক্সট্রা বাউন্সের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন।
ম্যাচের আগে লঙ্কান স্পিনার হাসারাঙ্গা ও থিকসানাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল বেশি। কিন্তু থিকসানা ভালো করলেও হাসারাঙ্গাকে দারুণভাবে পরাস্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাটাররা। তার চার ওভারে ২ উইকেট হারালেও ৪১ রান নিয়েছে বাংলাদেশ। সবচেয়ে বেশি রান দিয়েছেন অভিষিক্ত আসিথা, চার ওভারে ৫১। অধিনায়ক সাকিব নিজের মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই পাগুলে শট খেলেছিলেন। ভাগ্যজোরে আউট হওয়া থেকে বেঁচে যান। তবে তার ক্রিজে থাকার সময় থিকসানা বল করায় বেশি শট খেলা সহজ ছিল না। এই থিকসানাকে কাভার দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়েই ২২ বলে ২৪ রানে ফেরেন সাকিব। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যর্থ হন মুশফিকুর রহিম।
এরপরই বাংলাদেশকে ম্যাচে টেনে আনেন আফিফ-মাহমুদউল্লাহ। দুজনের ৩৭ বলে ৫৭ রানের জুটি বাংলাদেশকে ১৮০ রানের দিকে নিয়ে যায়। আফিফ ২২ বলে ৩৯ রানে থামেন। স্কুপ-পুল-স্ট্রেইট ড্রাইভের মতো দুর্দান্ত সব শট ছিল তার ব্যাটে। অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ ২২ বলে করেন ২৭। তবে আসল কাজটি করেছেন মোসাদ্দেক। লোয়ার অর্ডারে আসল পাওয়ার হিটারের কাজটা করে দেন মাত্র ৯ বলে ৪ চারে ২৪ রানে অপরাজিত থেকে। গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের মতো রিভার্স সুইপে চার আসে মোসাদ্দেকের ব্যাটে। বিশাল এক ছক্কা মেরে তাসকিনও দলের স্কোর বাড়িয়ে দেন।
টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের এমন সাহসী ক্রিকেট অনেক দিন দেখা যায়নি। তাই তো কাল জয়টাই সাকিবদের সেরা পুরস্কার হতো। এশিয়া কাপ থেকে ছিটকে পড়ার আক্ষেপ থাকলেও একটা সান্ত¡না নিয়ে ফিরতে পারবে বাংলাদেশ। ব্যাটিংয়ে মানসিকতার পরিবর্তন তো এলো। এটা ধরে রেখে বিশ্বকাপে ভালো করার ছকটা কাটা যাবে এখন।
