বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঘিরে নারায়ণগঞ্জে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবারের ওই সংঘর্ষে নিহত যুবদল কর্মী শাওন প্রধানের বড় ভাই মিলন প্রধান বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন ঘটনার দিন রাতেই। ওই মামলায় নারায়ণগঞ্জ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অজ্ঞাতপরিচয় ৪/৫ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া পরদিন শুক্রবার পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করে। যাতে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবসহ ৭১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪/৫ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। আর এ দুটি মামলার পর জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকাংশ নেতাকর্মী বাড়ি-ঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শোভাযাত্রা বের করতে সকাল ১০টার দিক থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় আলী আহম্মদ চুনকা পৌর মিলনায়তনের সামনে জড়ো হতে থাকেন জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর আগে বিএনপি নেতারা শোভাযাত্রার জন্য অনুমতি চেয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেন। ওইদিন নেতাকর্মীরা আলী আহম্মদ চুনকা পৌর মিলনায়তনের সামনে বঙ্গবন্ধু সড়কে রাস্তায় জড়ো হতে চাইলে বাধা দেয় পুলিশ এবং রাস্তা থেকে সরে যেতে বলে। আর অনুমতি ছাড়া রাস্তায় কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তারপরও বিএনপি নেতাকর্মীরা শোভাযাত্রা বের করতে চাইলে পুলিশ বাধা দিয়ে লাঠিপেটা করে। একপর্যায়ে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে এবং পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করে। দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টা পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন যুবদলকর্মী শাওন প্রধান। সংঘর্ষে ১৫ পুলিশসহ বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। যাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনার পর পুলিশ নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর থেকে এরই মধ্যে ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে।
ওই সংঘর্ষের ঘটনায় হত্যার উদ্দেশ্যে পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধাদান ও ভাঙচুর এবং বিস্ফোরক ব্যবহারের অভিযোগ এনে ৭১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচ হাজার জনকে আসামি করে সদর থানা পুলিশের এসআই কামরুজ্জামান বাদী হয়ে মামলা করেন। এই মামলায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আজ রবিবার সেই রিমান্ড আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির শোভাযাত্রায় পুলিশ হামলার পর আমাকেসহ ৭১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আমাদের ৫ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করছে। মামলার পর প্রতিদিন পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে অভিযান চালাচ্ছে। গ্রেপ্তারের ভয়ে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী আজ ঘরছাড়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের ওপর ভর করে এই মিডনাইটের অবৈধ সরকার আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। আর এসব মিথ্যা মামলা ও গ্রেপ্তার করে বিএনপি নেতাকর্মীদের আন্দোলন সংগ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না। ইনশাল্লাহ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এই সরকারের পতন ঘটানো হবে।’
প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়ে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, ‘শাওন প্রধান যুবদলের নেতা। তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নিরস্ত্র বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের গুলি করার ভিডিও দেখেছে দেশবাসী। তারপরও আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন ঘরছাড়া। শাওনের প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।’
সাভারে রিমান্ড শেষে বিএনপি নেতাকর্মীরা কারাগারে : সাভারে ঢাকা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর খোরশেদ আলমের বাসার মিলাদ মাহফিলের অনুষ্ঠান থেকে গ্রেপ্তার ২৯ নেতাকর্মীকে এক দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার ২৯ নেতাকর্মীসহ ৩৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয়দের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় মারধর ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করেন এসআই মোখলেছুর রহমান। পরে তাদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য সহায়তা করেছেন সাভার প্রতিনিধি
