নতুন দুই পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রসব জটিলতায় ভুগছেন এমন নারীদের ৬৪ শতাংশের সিজারিয়ানের পরিবর্তে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসবে সফল হয়েছেন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চিকিৎসকরা।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মুনিরা ফেরদৌসী বলেন, যাদের প্রসবের সময় পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ব্যথা উঠছে না, এমন গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে প্রসবব্যথা এবং জরায়ু মুখ খোলার জন্য এই দুই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। মিসোপ্রোস্টল জুস হলো মিসোপ্রোস্টল নামে এক ধরনের ট্যাবলেটÑযা নির্দিষ্ট পরিমাণ (১ হাজার বা ৫০০ এমএল) পানির সঙ্গে মিশিয়ে জুস তৈরি করা হয়। এই জুস ২৫০ এমএল করে নির্দিষ্ট সময় পরপর কয়েকবার খাওয়ানো হলে প্রসবব্যথা ওঠে। পাশপাশি মেকানিক্যাল ফোলিস ক্যাথেটার পদ্ধতি বলতে নরমাল ক্যাথেটার ও বেলুন গর্ভবতী নারীর জরায়ু মুখে ঢোকানোর ফলে তার প্রসব ব্যথা শুরু হয়। এই দুই পদ্ধতির প্রয়োগে তখন নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করা যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগেও কোনো কাজ হয় না। তখন তাদের সিজারিয়ান লাগতে পারে।
এ ছাড়া শুধু মিসোপ্রোস্টল জুস পদ্ধতি প্রয়োগ করে ৫৮ শতাংশ নারীর নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করা গেছে বলেও জানিয়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, এসব গর্ভবতী নারী সন্তান প্রসবের আগেই পানি ভেঙে যাওয়া, জরায়ু সংকুচিত হয়ে আসা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা সমস্যায় ভুগছিলেন।
গতকাল শনিবার এক অনুষ্ঠানে হাসপাতালের গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগের এ সংক্রান্ত একটি জরিপ তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. মুনিরা ফেরদৌসী। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত এই দুই বছরে এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া গর্ভবতী দুইশ’ নারীর সন্তান প্রসবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। তাদের মধ্যে ১৪৮ জন গৃহিণী এবং ১৮ জন কর্মজীবী নারী ছিলেন।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই দুই পদ্ধতি একসঙ্গে প্রয়োগ করেও নরমাল ডেলিভারি করা যায়নি ৩৬ শতাংশ নারীর এবং শুধু মিসোপ্রোস্টল জুস পদ্ধতি প্রয়োগ করে নরমাল ডেলিভারি করা যায়নি ৪২ শতাংশ নারীর। এসব নারীকে শেষ অবধি সিজারিয়ান ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাতে হয়েছে।
জরিপে উঠে এসেছে, যেসব নারীর সন্তান প্রসবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, তাদের মধ্যে ২৫ বছরের কম বয়সী ছিলেন ১৮ জন, যাদের ৪ জনকে শুধু মিসোপ্রোস্টল এবং ১০ জনকে মিসোপ্রোস্টল জুস ও ফোলিস ক্যাথেটার পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১১৪ জন গর্ভবতীর মধ্যে ৬৪ জন মিসোপ্রোস্টল জুস ও ফোলিস ক্যাথেটার এবং ৫০ জনকে মিসোপ্রোস্টল প্রয়োগ করা হয়েছে। ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫৪ জনের মধ্যে ২২ জনকে মিসোপ্রোস্টল জুস ও ফলিস ক্যাথেটর এবং ৩২ জনকে মিসোপ্রোস্টল প্রয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৫ বছরের ঊর্ধ্বে ১৪ জনের মধ্যে ৪ জন মিসোপ্রোস্টল জুস ও ফোলিস ক্যাথেটর এবং ১০ জনকে মিসোপ্রোস্টল প্রয়োগ করা হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, মিসোপ্রোস্টাল এবং ফলিক ক্যাথেটার পদ্ধতি প্রয়োগ করে ১২ ঘণ্টায় ডেলিভারি হয়েছে ২১ জনের, শুধু মিসোপ্রোস্টালে হয়েছে ১১ জনের। ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মিসোপ্রোস্টাল এবং ফলিক ক্যাথেটারে ডেলিভারি হয়েছে ৬৮ জনের এবং শুধু মিসোপ্রোস্টালে হয়েছে ৫৬ জনের। মিসোপ্রোস্টাল এবং ফলিক ক্যাথেটারে ২৪ ঘণ্টার বেশি লেগেছে ১১ জনের এবং মিসোপ্রোস্টালে ৩৩ জনের। মিসোপ্রোস্টাল মানে যাদের শুধু জুস খাওয়ানো হয়েছে। আর মিসোপ্রোস্টাল ও ফলিক ক্যাথেটার হলোÑতাদের জুসও খাওয়ানো হয়েছে, সেই সঙ্গে ফলিক ক্যাথেটার অর্থাৎ বেলুন ক্যাথেটার দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. মুনিরা ফেরদৌসী আরও বলেন, কোনো দক্ষ চিকিৎসক দিয়ে এই পদ্ধতিতে বাচ্চা প্রসব করালে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। তবে অদক্ষ চিকিৎসকের ক্ষেত্রে বেশ ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে সচেতনতার পাশাপাশি গর্ভবতীকে ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতকরণ এবং কাউন্সেলিং করাতে হবে। এ ছাড়া গর্ভধারণের পর থেকে কমপক্ষে চারবার চেকআপ করানো ও প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, নরমাল ডেলিভারি হলে হাসপাতালে অনেক দিন থাকতে হয় না। কারও কারও রাতে ডেলিভারি হয়েছে, সকালে চলে গেছেন। বেশিরভাগই এক দিনে ডেলিভারি করে চলে গেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দুই দিন পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। শিশু জন্মে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ফলে ইনফেকশন ও মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অঙ্গহানি, জমাট রক্ত ইত্যাদির কারণে মায়েদের সুস্থতা ফিরে পেতে প্রাকৃতিক প্রসবের তুলনায় অনেক দীর্ঘ সময় লাগে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া সিজারিয়ানের কারণে প্রাকৃতিক জন্মের লাভজনক দিকগুলোও নষ্ট হতে পারে।
অনুষ্ঠানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. খলিলুর রহমান বলেন, আমরা চাই শতভাগ নারী সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে আসুক। এতে নমরাল ডেলিভারি বাড়বে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমবে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. এ.বি.এম. মাকসুদুল আলম বলেন, সব রোগীর যে নরমাল ডেলিভারি হবে তা নয়। যাদের প্রয়োজন হবে তাদের অবশ্যই সিজারিয়ান করাতে হবে।
