ছোট পোশাকের বড় গল্প

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:২৩ পিএম

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে বাংলাদেশের সংবিধানপ্রদত্ত সব নাগরিকের সমান অধিকার কায়েমের জন্য আশির দশকের শেষের সময় থেকে যখন আমরা নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করে নারীর সমানাধিকার, সমান মর্যাদা এবং ‘রাষ্ট্রধর্ম’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি, তখন আমাদের নারীবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে অভিযোগ করা হতো যে, আমরা এ দেশের কালচার নষ্ট করছি। তার সঙ্গে আরেকটি অভিধা দেওয়া হতো যে, আমরা ‘পশ্চিমা শিক্ষা’য় শিক্ষিত। আমাকে মাঝে মাঝে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে জিজ্ঞেস করত আমি নারীবাদী কি না। আমি উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বললে তারা বলত, ‘আপনি তাহলে ব্রা পরেন কেন? নারীবাদীরা তো ব্রা পরেন না।’ এর উত্তরে আমি তাদের বলতাম, ‘আমাদের দেশে অনেক নারী, বিশেষ করে গ্রামে বসবাসকারী আমার নানি-দাদিসহ আগের প্রজন্মের নারীরা কখনো ব্রা পরতেন না। আপনার কথা অনুযায়ী তারা তো তাহলে আরও বেশি নারীবাদী।’

সরকারি অফিস-আদালতে গেলে, সচিব-উপসচিব পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও শোনা যায় যে ‘পশ্চিমা শিক্ষা’য় শিক্ষিত হয়ে আমরা নারীবাদীরা এ দেশের সংস্কৃতি-কালচার নষ্ট করে দিচ্ছি। তাদের যদি প্রশ্ন করা হয় যে তারা কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া করেছেন তাহলে তারা ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলেন। তা ছাড়াও, অনেকে পশ্চিমা দেশের অনেক বিশ^বিদ্যালয়ের নাম সগর্বে বলেন। আমি তাদের বলি আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েছি, তাহলে তারা ‘পশ্চিমা শিক্ষা’য় শিক্ষিত না হলে আমরা হব কেন? আমলারা যে প্যান্টশার্ট পরে অফিসে আসেন, সেটা কি আমাদের কালচার? প্যান্টশার্ট পরা তো ব্রিটিশদের থেকে শিখেছি। ওদিকে হিজাব-বোরকা বাংলাদেশের পোশাক কীভাবে হলো? আমি তো শাড়ি পরছি, বাংলাদেশের সংস্কৃতি তো আমরাই রক্ষা করছি। এসব প্রশ্নের উত্তর না দিতে পেরে তারা অন্যভাবে দাপট দেখান তথা অভদ্র আচরণ করেন।

সম্প্রতি নরসিংদী রেলস্টেশনে এক তরুণীকে পোশাকের কারণে হেনস্তা হতে হয়েছে, অশ্লীল আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে, এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলন, পত্রিকায় লেখালেখি, এমনকি এক নারীকে গ্রেপ্তারও করা হলো। কোর্টে জামিন শুনানিতে বিচারক বললেন, ‘সভ্য দেশে এমন পোশাক পরে রেলস্টেশনে যাওয়া যায় কি না?’ এ নিয়েও আলোচনার শেষ নেই। নারীদের পোশাক প্রশ্নে এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করা জরুরি। পোশাক নিয়ে কথা বলবার সময় শাড়ি বা হিজাবের খরচ এবং টিশার্ট ও জিন্সের খরচের বিষয়টিও আমাদের চিন্তার মধ্যে রাখতে হবে। এখন বিভিন্ন খাতে খরচ কমানোর প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু খরচটা কোন জায়গা থেকে কমানো হবে, খাবারের খরচ থেকে নাকি পোশাকের? মনে পড়ে, পাকিস্তান আমলে আদমজীতে শাড়ি পরে কাজ করার সময় মেশিনে শাড়ি আটকে একজন নারী শ্রমিকের হাত কাটা পড়েছিল। তখন আমরা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ি। সে সময় আমরা আন্দোলন করে দাবি তুলেছিলাম যে, কারখানায় কাজ করার জন্য নারী-পুরুষ সব শ্রমিককে কারখানার উপযোগী পোশাক দিতে হবে। শ্রমিকের নিরাপত্তার স্বার্থেই এটা হওয়া প্রয়োজন। কারণ সব কাজের জন্য সব পোশাক উপযুক্ত না। যেমন পুলিশে, আর্মিতে নির্দিষ্ট পোশাক পরতে হয়। খেলাধুলার সময় নির্দিষ্ট পোশাক পরতে হয়। তেমনি বাসে, রিকশায়, মোটরসাইকেলে ভ্রমণের সময়ও নিরাপত্তা ও শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বিবেচনা করে নারীদের জিন্স-টিশার্টের নির্বাচন খুবই যৌক্তিক হতে পারে।

অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব কিছুতেই পরিবর্তন আসছে। সাধারণের পোশাকের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। পোশাককে হতে হবে একইসঙ্গে নিরাপদ, সহজলভ্য ও চলাফেরার সুবিধাযুক্ত। পুরুষরা ঠিকই এই পরিবর্তনের সুবিধা ভোগ করছে। কিন্তু যত আপত্তি সব মেয়েদের পোশাক নিয়ে। এ ধরনের রক্ষণশীল মানসিকতার সঙ্গে ধর্ম বা কালচারের কোনো সম্পর্ক নেই।  এই দেশে প্রকাশ্যে রাস্তাঘাট, যানবাহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও পরিবারে প্রতিনিয়ত নারীদের যে যৌন নির্যাতন এবং হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে, তাদের পোশাক, চলাফেরা, রাতের বেলা হোটেল-রেস্টুরেন্টে যাওয়া এসব বিষয়ে অশালীন বক্তব্যের মাধ্যমে নারীরা যে হেনস্তা হচ্ছে, সেই সম্পর্কে তো আমরা কখনো বিচারকদের কাছ থেকে শুনি না যে কোনো সভ্য দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটে কি না! কয়েকদিন আগে পত্রিকায় একজন তরুণী চিত্রনায়িকার বক্তব্য আমার চোখে পড়ে। সম্প্রতি তার বিয়েবিচ্ছেদ হওয়ায় তার পুনরায় বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান জল্পনা-কল্পনা চলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চিত্রনায়িকা বললেন যে, তিনি মাত্রই একটা নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে মুক্ত হয়েছেন, তাই তিনি কিছুদিন একা থাকার স্বাধীনতা উপভোগ করতে চান। পরবর্তী সময়ে তিনি ভেবেচিন্তে আবার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেবেন। এ কথা বলে তিনি দর্শকদের অনুরোধ করেন যেন তারা তাকে ভুল না বোঝে, কারণ স্বাধীনতা বলতে তিনি উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করবেন সেটা বোঝাননি। অর্থাৎ তাকে তার ‘স্বাধীনতা’ সম্পর্কেও ব্যাখ্যা দিতে হলো। আমাদের সমাজে একজন পুরুষকে সেই ব্যাখ্যাটা দিতে হয় না।

আইনের ব্যাপারগুলোতেও, বিশেষ করে উত্তরাধিকার আইনে নারীর সমানাধিকার নেই। নারীরা রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যাপারে একেবারে কোণঠাসা। পায়ের নিচে মাটি না থাকায় বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া, ব্যবসা করার জন্য ব্যাংক লোন না পাওয়া ইত্যাদি কারণে তারা পরিবারের ভেতরে নির্যাতনের শিকার হয়। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের ছেলেরা এসব অগণতান্ত্রিক, বর্বর আচরণ দেখে বড় হয়। তারা এটাকেই স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে। বড় হয়ে তারাও রাস্তাঘাট, যানবাহন, অফিস-আদালত ও রাজনীতিসহ সব জায়গায় এ ধরনের আচরণ করে। উত্তরাধিকার আইনে সমানাধিকার থাকলে নারীর পায়ের নিচে মাটি থাকবে, তাদের একটা আর্থিক অবস্থান সৃষ্টি হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই হবে না, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে, আইন, সমাজ, রাজনীতি সব জায়গায় নারীকে সমানাধিকার দিতে হবে।

দুটো ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। সময়টা ১৯৯৩-৯৪ সাল, ভাদ্র মাস। সিপাহীবাগ এলাকায় এক সভায় আমি হাতাকাটা ব্লাউজ পরে গিয়েছিলাম। সভায় এক মৌলবি আমাকে বললেন, ‘আপনি হাতাকাটা ব্লাউজ পরেন কেন? এটা একটা ইসলামিক সমাজ।’ উত্তরে আমি তাকে বলি, ‘আপনি আমার হাত দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু আপনার এলাকার দরিদ্র নারীদের গোসল করার আলাদা জায়গা ছিল না। সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি, যাতে গোসল করার সময় পুরুষরা তাদের নগ্ন শরীর না দেখতে পায়। স্কুলে যাওয়ার সময় মেয়েরা যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য আমরা সচেতনতা বৃদ্ধি করেছি। আমি গোসল করার সময় অন্তত কেউ তো আমার শরীর দেখে না। এখানে অনেক নারীর ব্লাউজ-পেটিকোট পরার সামর্থ্য নেই। তারা গরিব বলে কি তারা মানুষ না, মুসলিম না? আমরা তাদের বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করছি, তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে, এসব তো আপনারা করেননি।’ আমার কথা শুনে তার মুখ বন্ধ হয়ে গেল, কারণ এলাকার লোকজন আমাদের কাজ সম্পর্কে অনেক ভালো করেই জানে।

আরেকটি ঘটনার কথা বলা যায়, ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে বিআইডিএস-এর একটি প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহের তিনটি গ্রামে তথ্য সংগ্রহের কাজ সুপারভাইজ করছিলাম। সেই প্রোগ্রামের ডিরেক্টর ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ড. মিড কেইন। ভাদ্র মাসে একদিন ফিল্ড ভিজিটে বের হওয়ার সময় তিনি শর্টস পরা ছিলেন। আমি তখন অবিবাহিত। গ্রামে এসব নিয়ে নানান ধরনের কথাবার্তা হয় এটা আমি জানতাম। তাই আমি তাকে বললাম শর্টস না পরে ফুলপ্যান্ট পরে বের হতে, কারণ আমাদের সমাজে শর্টস পরা গ্রহণযোগ্য নয়। মিড কেইন আমাকে বললেন, ‘কেন? আমার তো হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা। কিন্তু আমি তো দেখি গ্রামে কৃষকরা মাঠে কাজের সময় লুঙ্গির কাছা বেঁধে নেয়। সেটা তো গ্রহণযোগ্য।’ তার কথাগুলো সেদিন আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। তাহলে কি দরিদ্র বলে আমরা গ্রামের লোকজন, কৃষকদের মানুষ বলে মনে করি না? সরকারের অনেক নীতিমালা জনবান্ধব এবং নারীর অধিকারের পক্ষে হলেও বাস্তবায়ন হয় না, কারণ আমাদের কর্মকর্তাদের মানসিকতা পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনায় আচ্ছন্ন। উদাহরণ হিসেবে আরেকটা ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। ৩-৪ বছর আগে একটা রাউন্ডটেবিল বৈঠকে আমি সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছিলাম, যেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি অন্যান্য দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা, ইউনিসেফ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা, এনজিও এবং নারী সংগঠনের উপস্থিতি ছিল। সেই বৈঠকে সরকারের জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং প্রকল্পের ডিরেক্টর এনজিওদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অনেক কাজ করছেন সেসব নিয়ে আমরা খুশি। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি নষ্ট করা যাবে না। শাশুড়িকে দেখে বৌমার হাত কাঁপতে কাঁপতে হাতের পানির গ্লাস পড়ে ভেঙে যাবে, এটাই আমাদের কালচারের সৌন্দর্য।’

এই ধরনের মানসিকতার মানুষ দায়িত্বে থাকলে কীভাবে আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং, ইত্যাদি হবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে। টাকার অপচয় বলাও অমূলক হবে না। একই বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি বেফাঁস মন্তব্য করেছিলেন এবং সেটা পত্রিকায় এসেছিল। কিন্তু তার কালচার সম্পর্কিত ওই বক্তব্যটা আসেনি। সুতরাং এই মানসিকতার কর্মকর্তাদের দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়া, নারীর ক্ষমতায়ন ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা হবে কি না এটা ভেবে দেখা দরকার। উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের প্রশাসন ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া। ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থা, আইন, সবই ছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের প্রজা হিসেবে শাসন করার জন্য। সেই মন-মানসিকতা, প্রশাসনিকব্যবস্থা থেকে আমরা এখনো বের হতে পারছি না। মানুষের স্বাধীন চিন্তাভাবনা, যুক্তির ব্যবহার, এসব শেখানো হয় না। সেই প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা এসেছেন তারা পিতৃতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক ও শোষণমূলক চিন্তাভাবনার বিস্তার থেকে বের হতে পারছেন না।

আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ধর্মরক্ষা এবং সংস্কৃতিচর্চার নামে যে নারীদের হয়রানি, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে এটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এটা মানবাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। একটা সুস্থ, ‘সভ্য’ সমাজে এ ধরনের ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের দেশে গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কায়েম করতে হলে নারীর সমানাধিকার, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং বৈষম্যমূলক আচার-আচরণ, ব্যবস্থাপনা, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর মধ্যে বৈষম্য করার মতো চিন্তাভাবনা থেকে মুক্তিলাভ করতে হবে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত