থানা-পুলিশের অপরাধ ঠেকানো ও দর্শনার্থীদের হয়রানি বন্ধ করতে উদ্যোগী হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। বিভিন্ন সময়ে থানার ভেতরে নানা ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটছে। নির্যাতনের পর হাজতির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে কোনো কোনো থানায়। হাজতখানায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। জিডি বা মামলা করতে গিয়ে দর্শনার্থীরা হয়রানির শিকার হন এমন খবর প্রকাশিত হয় প্রায়ই।
এমন সব অভিযোগে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিব্রত। এসব অভিযোগ একেবারে নতুন নয়, বেশ পুরনোই বটে; কর্মকর্তরা শুনেছেন অনেক আগেই, থানায় আসা দর্শনার্থীরাও জানেন আগে থেকেই কারণ তাদের অপ্রীতিকর (আনপ্লিজেন্ট) অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিকার চাইতে এসে। সুখকর খবর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ‘থানায়’ মনোনিবেশ করেছেন। পুলিশ সিসি-ক্যামেরা দিয়ে দেখবে পুলিশকেই দর্শনার্থীদের সঙ্গে তাদের আচরণকে। দর্শনার্থীদের হয়রানি কমবে আশা করা যায়।
পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বিভিন্ন থানার কর্মকান্ড নিয়ে কঠোর মনোভাব দেখানো হয়েছে। থানার ওসি থেকে শুরু করে কনস্টেবলরা কে কী কাজ করছেন তা মনিটরিং করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। শহরাঞ্চল শুধু নয়, দুর্গম এলাকায়ও যেসব থানা আছে সেখানেও সিসি ক্যামেরা বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ঢাকার হাতিরঝিল থানার হেফাজতে থাকা অবস্থায় সুমন শেখ নামে এক যুবক মারা যান। এরপর নড়েচড়ে বসেন পুলিশ-কর্তারা। পুলিশের দাবি, সুমন আত্মহত্যা করেছেন। থানার সিসি-ক্যামেরার ফুটেজেও তার প্রমাণ রয়েছে। সুমনের স্বজনরা বলছেন, হেফাজতে থাকা অবস্থায় সে আত্মহত্যা করলেও পুলিশ কেন তাকে রুখতে পারেনি। এ ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার কারণে দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে রাজধানীসহ কিছু এলাকার থানার সিসি-ক্যামেরা নষ্ট থাকছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশির ভাগ থানায় সিসি-ক্যামেরা নেই। যেসব থানায় ক্যামেরা আছে কিন্তু সচল নেই সেসব থানায় তা নতুন করে স্থাপন করতে বলা হয়েছে। ডোনারের মাধ্যমেই ক্যামেরা বসাতে বলা হয়েছে। এলাকার শিল্পপতি বা বড় কোম্পানির কর্ণধারদের কাছ থেকে সিসি-ক্যামেরা নিতে বলা হয়েছে। তবে জোর করে বা হুমকি দিয়ে উপহার না নিতে বলা হয়েছে। আমাদেরও কিছু ফান্ড আছে। প্রয়োজনে ফান্ড থেকে সিসি-ক্যামেরা স্থাপনের টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’
পুলিশের সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, যেসব থানায় সিসি-ক্যামেরা আছে সেসবের মনিটর ওসিদের রুমে আছে। সেখান থেকে ওসি থানার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। ওসিরা যখন থানার বাইরে বা ছুটিতে থাকেন তখন মনিটর করতে সমস্যা হয়। থানার ভেতর কী ঘটছে তা নজরের বাইরে থেকে যায়।
থানার কর্মকা- নিয়ে গত আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে পুলিশের সব মেট্রো পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপারসহ ইউনিট প্রধানদের কাছে। ৬৬৪টি থানার ওসির রুম, উিউটি অফিসারের রুম, হাজতখানাসহ সব রুমে একটি করে ক্যামেরা বসাতে বলা হয়। ক্যামেরার মনিটর ওসির রুমে না রেখে উিউটি অফিসারের রুমে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, জেলার এসপিকে সিসি-ক্যামেরাগুলো মনিটরিং করতে হবে। প্রয়োজনে থানার নাম উল্লেখ করে এসপি-অফিসের যেকোনো রুমে মনিটর বসাতে বলা হয় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধীদের অপরাধের ধরন বদলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টে যাচ্ছে পুলিশের কার্যক্রমও। অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নেওয়া হয়েছে গুচ্ছপরিকল্পনা। থানায় আসা লোকজনের সঙ্গে পুলিশের আচরণ এবং পুলিশ ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না তা মনিটরিং করতে সিসি-ক্যামেরার বিকল্প নেই। নির্দেশনায় রেঞ্জ, জেলা ও মেট্রো পুলিশের সেবাকে জনবান্ধব, হয়রানিমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত করা এবং পুলিশি কার্যক্রমের মনিটরিং ও পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। থানার নষ্ট ক্যামেরা বাদ দিয়ে নতুন ক্যামেরা বসাতে বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘পুলিশকে জনবান্ধব করতে যা যা করা দরকার তাই করা হচ্ছে। বিশেষ করে থানায় আসা লোকজন যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হয় সে জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের সব থানা সিসি-ক্যামেরার আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।’
ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কে এম হাফিজ আক্তার দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘থানায় যেসব সিসি-ক্যামেরা আছে সেগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে না সত্য। ওসিরা সেগুলো মনিটরিং করে থাকে। মনিটরিংয়ের বিষয়ে আমরা এখন একটু পরিবর্তন করতে চাচ্ছি। সাম্প্রতিক সময়ে থানাগুলোর হাজতখানায় একাধিক ঘটনা ঘটায় আমরা চিন্তা করছি, থানার ক্যামেরাগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না। সরকারিভাবে যেসব থানা ভবন তৈরি করা হয়েছে সেগুলোতে সিসি-ক্যামেরার মনিটরিং সিস্টেম ভালো। আর যেসব থানা ভবন ভাড়া নেওয়া হয়েছে সেগুলোর সিস্টেম খুব একটা ভালো নয়। এজন্য উন্নতমানের ক্যামেরা বসানো হবে।’
সূত্র জানায়, মেট্রোপলিটান এলাকায় যেসব থানা আছে সেসবে সিসি-ক্যামেরা থাকলেও মনিটরিং করা হচ্ছে না। গত দুই বছরে ঢাকায় তিনটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে থানায়। গত বছরের ২ আগস্ট উত্তরা-পূর্ব থানা হেফাজতে মো. লিটন নামে এক হাজতি আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওসি থেকে শুরু করে সেন্ট্রি ডিউটিতে থাকা কনস্টেবল ও থানার ডিউটি অফিসারকে দোষী সাব্যস্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। শাস্তি হিসেবে তাদের বেতন কাটা, পদোন্নতি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। মাদক মামলার আসামি লিটনকে আদালত রিমান্ডে দিলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে থানায় নেওয়া হয়েছিল। ভেন্টিলেটরের সঙ্গে গলায় ফাঁস বেঁধে আত্মহত্যা করেন লিটন। ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার হাজতে আবু বক্কর সিদ্দিক বাবু নামে এক আসামি মারা যান। পুলিশের দাবি, ওই আসামি হাজতের গ্রিলের সঙ্গে চাদর পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিছুদিন আগে হাতিরঝিল থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় সুমন শেখ নামে এক যুবক মারা যান।’
কয়েকটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, থানার সিসি-ক্যামেরার ফুটেজ দেখার জন্য ওসির রুমে মনিটর রয়েছে। সেখান থেকে থানা কম্পাউন্ডের ভেতরের কার্যক্রম দেখা যায়। কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় ওসি ও ইন্সপেক্টররা থানার বাইরে গেলে আর মনিটরিং করা হয় না। তখন ক্যামেরা বন্ধ থাকারও অভিযোগ আছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি নির্দেশনা এসেছে। নতুন করে সিসি-ক্যামেরা বসাতে বলা হয়েছে। বাজেট না থাকায় ডোনার ছাড়া ক্যামেরা বসানো যাবে না। আমরা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে কোনো ডোনারকে বাধ্য করা হবে না। মনিটরিং করতে গেলে ৮ ঘণ্টা অন্তর দুজন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্বে রাখতে হয়। থানায় পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ডিউটি অফিসারের রুমে মনিটর থাকলে সমস্যা হবে না বলে মনে করছি।’
কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘কিছুদিন আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি নির্দেশনা এসেছেÑ থানাগুলোকে মনিটরিংয়ের আওতায় নিতে। থানার পুলিশ-সদস্যরা কী করছেন, দর্শনার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না তা মনিটরিং করতে সিসি-ক্যামেরা বসাতে বলা হয়েছে। আমরা চাচ্ছি, দ্রুত সিসি-ক্যামেরা বসাতে। কোনো শিল্পপতি বা কোম্পানির কর্ণধার স্বেচ্ছায় সিসি-ক্যামেরা উপহার দিলে নেওয়া হবে। নাহলে আমরা বিকল্প ব্যবস্থায় সিসি-ক্যামেরা বসাতে পারব বলে আশাবাদী।’
