মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের উন্নতির ধারা বেশ আশাব্যঞ্জক। ইউএনডিপি প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯১টি দেশের মধ্যে ১২৯তম, যা আগের বছর ছিল ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৩৩তম। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর বেড়ে পূর্ণমান ‘এক’-এর মধ্যে ০.৬৫৫ থেকে বেড়ে ০.৬৬১ হয়েছে। অর্থাৎ আগের বছরের থেকে পয়েন্ট বেড়েছে .০০৬। মানব উন্নয়ন সূচকে সর্বোচ্চ নম্বরধারী দেশগুলো হচ্ছে নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড। বাংলাদেশ এখনো মধ্যমসারির মানব উন্নয়ন দেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের এই উন্নতির মূলে রয়েছে গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া, গড় স্কুলিং বৃদ্ধি পেয়ে ১২.৪ বছরে পৌঁছানো, ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে মাথাপিছু জাতীয় আয় ৫৪৭২ ডলার হওয়া। যদিও রিপোর্টে ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলা হয়েছে।
সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার অবস্থান সবার আগে ৭৩তম, মালদ্বীপ ৯০তম এবং ভুটান ১২৭তম। আর বাংলাদেশের পরে আছে ভারত ১৩২তম, নেপাল ১৪৩তম, পাকিস্তান ১৬১তম ও আফগানিস্তান ১৮০তম। মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে বেশ কটি কারণে। এর মধ্যে একটি বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের মতো অধিক জনসংখ্যার একটি দেশে মানব উন্নয়নের কর্মসূচি পরিচালনা করা একটি দুরূহ কাজ, অন্যদিকে আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। অধিকন্তু ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারার ঐতিহাসিক ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা তো আমাদের নিত্যসঙ্গী।
ইউএনডিপির এবারের প্রতিবেদনের মূল শিরোনাম হচ্ছে : ‘অনিশ্চিত জীবন, নড়বড়ে সময় : রূপান্তরকামী পৃথিবীতে ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ শিরোনামটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েক বছরে মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা ছিল বিশ^ব্যাপী করোনা অতিমারী, এটি শেষ হতে না হতেই ইউরোপসহ নানা প্রান্তে যুদ্ধ ও যুদ্ধাবস্থা বিশে^র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন সত্যিই অনিশ্চিত। আমরাও টের পাচ্ছি হারে হারে। বিশ^ব্যাপী খাদ্যঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার খরচের সামঞ্জস্যহীন বৃদ্ধি সামগ্রিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় ভীষণ চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি এর মধ্যেও একটি গোষ্ঠী সুযোগ কাজে লাগিয়ে মুনাফা অর্জনের জোর চেষ্টায় যেটা ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মূলত তিন ধরনের সূচকের সমন্বয়ে মানব উন্নয়ন সূচক প্রস্তুত করা হয় যথা : গড় আয়ু, শিক্ষার ক্ষেত্রে দুটি সূচক একটি হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত অবস্থানকালীন এবং অন্যটি পঁচিশ বছরের নিচে জনসংখ্যার গড়ে স্কুলিং সময় এবং সর্ব শেষটি ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে মাথাপিছু জাতীয় আয়।
মানব উন্নয়ন সূচকে স্কোর .৭ বা তদূর্ধ্ব স্কোর করলে সেই দেশ উচ্চ মানব উন্নয়ন সূচকের অন্তর্ভুক্ত দেশ। বাংলাদেশের মতো যে দেশগুলো মধ্যমসারির অন্তর্ভুক্ত তাদের অনেকের গড় স্কুলিং নয়, দশ বা এগারো বছর যেখানে বাংলাদেশ এখনো ৭.৪ বছর। এই সূচকে অতি উচ্চসারির কাতারে ৬৬টি দেশ রয়েছে, এর সর্বশেষ দেশটির নাম থাইল্যান্ড। অন্যদিকে উচ্চসারির দেশের মধ্যে রয়েছে ৪৯টি দেশ এ দেশের মধ্যে সর্বশেষ ভিয়েতনাম এবং একই সারিতে রয়েছে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। প্রতিবেদনে ভারতের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ যেমন ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনের থেকে বেশ পিছিয়ে। এই দুটি দেশের অবস্থান যথাক্রমে ১১৫ ও ১১৬তম এবং দুটি দেশের সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায় দুটি দেশেই প্রত্যাশিত স্কুলিংয়ের সময় তেরো বছর এবং বাংলাদেশের থেকে ন্যূনতম এক বছর বা তার থেকে বেশি।
উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার আলোচনাও প্রাসঙ্গিক। কিছুদিন ধরে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স পঁয়ত্রিশ করার জন্য দাবি করে আসছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। আমরা সবাই জানি দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি চাকরি পাওয়া, ও না পাওয়া এবং এর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক চলে আসছে। এখনো আমাদের শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে। অবশ্য সাধারণভাবে এই প্রত্যাশার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি অন্য অনেক প্রফেশনের চেয়ে বেশি লোভনীয়! সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, সরকারি চাকরির মধ্যে সবচেয়ে লোভনীয় হচ্ছে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডার, যে কারণে এখন অনেকেই আছেন যারা ডাক্তারি ও প্রকৌশলবিদ্যা ত্যাগ করে প্রশাসন ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত হতে চান। অনেকেই আবার নতুন প্রজন্মের অতিরিক্ত বিসিএসমুখী প্রবণতায় হতাশ। এদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিসিএস নামে একটি সাবজেক্ট খোলার কথা বলেছেন! আসলে সরকারি চাকরি চাওয়ার বড় উদ্দীপক হচ্ছে চাকরির নিশ্চয়তা ও সুযোগ-সুবিধা। তবে এর মাধ্যমে সরকারি চাকরির বাইরে অন্যান্য চাকরির প্রকৃত করুণ অবস্থা কিছুটা হলেও অনুধাবন করা যায়।
ধারাবাহিকভাবে আমাদের মানব উন্নয়ন সূচকে অবস্থানের উন্নতি হলেও শিক্ষার সময়, মান ও শিক্ষাব্যবস্থার কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত নেই। সরকারি চাকরির বাইরে অন্যান্য কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে এখনো কেন তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ সৃষ্টি করা গেল না সেটাই ভাবার বিষয়। অনেক দিন ধরেই আলোচনায় আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উদ্ভাবনী দক্ষতা ও সক্ষমতা তৈরিতে সক্ষম হচ্ছে না, ফলে নতুন পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ নিতে পিছিয়ে থাকছে। পক্ষান্তরে সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ অটুট থাকছে সেই ঔপনিবেশিককাল থেকেই। মানব উন্নয়ন সূচকে আমরা যদি উচ্চ মানব উন্নয়নের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতে চাই তাহলে ধারাবাহিক শিক্ষায় স্কুলিংয়ের সময় বৃদ্ধিই যথেষ্ট না। শিক্ষার কাঠামোগত পরিবর্তন আনা দরকার যে কাঠামো উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে শুধু সরকারি চাকরিতে ঢোকার আশায় বছরের পর বছর নষ্ট করবে না, অধিকন্তু নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখবে শুরু থেকেই।
অনেক সময় বিসিএসে মেধার ভিত্তিতে নির্বাচনের প্রক্রিয়া সমানে আনা হয়। নিঃসন্দেহে সরকারি প্রশাসন চালানো একটি সমস্যাসংকুল কাজ, এখানে মেধাবীদের দরকার আছে কিন্তু সব মেধাবী যদি শুধু বিভিন্ন পদপদবির আকর্ষণে সরকারি চাকরিতে যুক্ত হতে চান, তাহলে এই একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে কে, কারণ এখনকার পৃথিবীতে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সরকারি খাতের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতের ভূমিকা কোনোভাবেই কম নয় বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশি বৈ কি। এ ধারণার স্বীকৃতি আছে জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডায়। আর প্রশাসন চালাতে প্রতিভাই তো সব না প্রতিভার পাশাপাশি জনগণকে সেবার মানসিকতা, জনকল্যাণে উদ্যোগ গ্রহণ ও অধ্যবসায় এর সবগুলোই প্রয়োজন। এর যেকোনো একটির ঘাটতিই মানব উন্নয়নের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব হবে না।
এবারের মানব উন্নয়ন সূচকে এই অনিশ্চিত সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ন্যায্যতার ভিত্তিতে সব জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, জনগোষ্ঠীর আচরণ ও আগ্রহ পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির অংশগ্রহণ দক্ষতার পাশাপাশি জনকল্যাণের সামষ্টিক উদ্যোগে আগ্রহী সৃষ্টি করাও বাঞ্ছনীয়।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
