ইআরডির বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা সেমিনার

কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ মন্ত্রিপরিষদ সচিব

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০৬ এএম

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মানুষ হারাম খেলে, চুরি করলে দেশের উন্নতি হবে না। মানুষের চরিত্র ঠিক করতে হবে সবার আগে।’

গতকাল রবিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের আয়োজনে সুশাসন নিশ্চিত করতে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা শীর্ষক সেমিনারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত বিভিন্ন কর্মকর্তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন তিনি। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শরিফা খানের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘চুক্তির শর্ত না বুঝে ইআরডির কর্মকর্তারা চুক্তিতে সই করেন। এতে পরে গলার ফাঁস হয়ে যায়। কিছু করার থাকে না। মামলা করলে দেখা যাবে যারা সই করেছেন, তাদের জেলে ঢুকতে হবে। এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা ঠিকমতো ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) না পড়েই প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন। এতে পরে ব্যয় ও সময় বাড়াতে হয়। প্রকল্পের ব্যয় বেশি ধরা হয়। এটা একধরনের ডাকাতি। এগুলো বন্ধ করতে হবে।’

এ সময় প্রকল্পের কাজের জন্য যারা অবৈধভাবে গাড়ি কিনেছেন বা যারা অতিরিক্ত গাড়ি ব্যবহার করছেন, তাদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত তার হাতে দেওয়ার নির্দেশ দেন খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্প প্রস্তাবে কখনো যাতে ডিপিএম (সরাসরি ক্রয়) বা একক ক্রয় ব্যবস্থা না থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ওটিএম বা ওপেন টেন্ডার মেথড কথাটি উল্লেখ থাকতে হবে। এ ছাড়া মধ্য মেয়াদি বাজেট কাঠামোর নির্ধারিত সিলিংয়ের বাইরে কোনো প্রকল্পের পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির) সভা করা উচিত নয়। সচিবরা যদি মিথ্যা প্রত্যয়নপত্র দেন, তাহলে সেটিও ফেরত দেওয়া উচিত। মেট্রোরেল প্রকল্পে এক কিলোমিটার করতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার মতো খরচ ধরা হয়েছে। অথচ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করতেও এ রকমই টাকা লাগবে।’ পরিকল্পনা কমিশন অনেক বড় প্রকল্পে কিছুই করেনি। যেমন মেট্রোরেল, থার্ড টার্মিনাল এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কিছুই করা হয়নি। এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প যদি দুই হাজার কোটি টাকা ধরা হয়, তাহলে এটা ডাকাতি ছাড়া কিছুই নয়। কুকুরকে কেউ অকুকুর বা গরুকে কেউ অগরু বলে না। কিন্তু মানুষের যখন মানবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়, তখন তাকে অমানুষ বলা হয়। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের প্রকল্পের গাড়ি দিতে হয়। এটা কেন দিতে হবে? আন অফিশিয়ালি কে কয়টা গাড়ি ব্যবহার করেন, তার হিসাব দিতে বলেছি। আমরা যদি উল্টা-পাল্টা বা অপচয় করি তাহলে পরকালে ১৭ কোটি মানুষের পায়ে পড়তে হবে। সরকারি ১ টাকা অপচয় করলেও তার জবাবদিহি করতে হবে।’

এ সময় পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সচিব সত্যজিৎ কর্মকার জানান, কক্সবাজারের একটি প্রকল্পের সঠিক প্রকল্প প্রস্তাবই তৈরি হয়নি, অথচ ইআরডি বৈদেশিক ঋণের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, ‘ঋণ আমাদের নিতে হবে। তবে তা কী কাজে লাগছে, সেটি দেখতে হবে। ঋণব্যবস্থা ঠিক না হলে নাইজেরিয়া, শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হতে পারে। বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে কেনাকাটায় সতর্ক থাকতে হবে। প্রকল্প নেওয়ার চাপ আসবে। অনেক সময় আর্থসামাজিক কারণে কিছু কিছু প্রকল্প দিতেও হয়। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। যেমন মাশরুম চাষ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৩৪ বছর ধরে চলা মাশরুম চাষের একটি প্রকল্পের ফল যাচাই না করেই আরেকটি প্রকল্প কেন নিতে হবে? সেখানে কৃষিমন্ত্রী প্রভাবশালী বলে হয়তো শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে।’

এ সময় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘উন্নয়ন করতে গেলে ঋণের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সক্ষমতা আছে, তাই বিদেশি ঋণ নিতে হবে। তবে তা নিতে হবে বুঝে-শুনে হিসাব করে। ঋণ নিয়ে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। তবে যাচাই-বাছাই করেই ঋণ নিতে হবে। প্রকল্প প্রস্তাবের ভেতরে আমাদের ঢুকতে হবে। ভেঙেচুরে ভেতরে ঢুকে দেখতে হবে গাড়ি-ঘোড়াসহ কী কী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।’

পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘ইকোনমিক ক্যাডার গুলিয়ে ফেলা ঠিক হয়নি। পরিকল্পনা কমিশনের জন্য আলাদা বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন। বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত