বাবার কিনে দেওয়া ৪০ টাকার ফুটবলেই কৃষ্ণার যাত্রা শুরু

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৫৪ পিএম

বাবার কিনে দেওয়া ৪০ টাকার একটি বল নিয়েই হিমালয়জয়ী কৃষ্ণা সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ তার দল সাফ ফুটবলে জয়ী হয়ে দেশের মানুষকে আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়েছে। পরিবারের চাওয়াও পূরণ করেছে। কৃষ্ণা টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথুলিয়া গ্রামের বাসুদেব সরকার ও নমিতা রানী সরকারের মেয়ে। দর্জির কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাতেন তার বাবা। অভাবের সংসার তাদের।

গত সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে ৩-১ গোলে জিতে বাংলাদেশকে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এনে দেয় মেয়েরা। সেখানে কৃষ্ণা রানী সরকারের ছিল জোড়া গোল। তার বাবা বাসুদেব সরকার গতকাল বুধবার এ প্রতিবেদককে বলেন, কৃষ্ণার ফুটবলার হয়ে ওঠার পথ সহজ ছিল না। অনেকেই কটাক্ষ করেছে। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি লক্ষ্য থেকে তাকে টলাতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহী ছিল। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় ছেলেদের সঙ্গে কৃষ্ণাও ফুটবল খেলত। এ নিয়ে পাড়ার লোকজন বাজে মন্তব্য করত। আমি এবং ওর মাও কথা শোনাতাম। ওর মা মাঝেমধ্যেই বকাঝকা করত। কিন্তু মেয়ের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ দেখে এক দিন আমি ৪০ টাকা দিয়ে একটি বল কিনে দিই। সেই বল দিয়ে কৃষ্ণার যাত্রা শুরু।

কৃষ্ণার বাবা আরও বলেন, অন্যের কটুকথা সহ্য করতে না পেরে তার মা এক দিন বঁটি দিয়ে তার ফুটবল কেটে ফেলে। তবু থামেনি কৃষ্ণা। বাড়ির পাশে প্রাইমারি স্কুলে পড়ত। বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলে সবার নজর কাড়ে। এরপর সে সূতি ভিএম পাইলট স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে শরীরচর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপন একটি নারী ফুটবল দল গঠন করেন। ওই দলে রাখেন কৃষ্ণাকে। বাড়ি থেকে সূতি ভিএম স্কুলের দূরত্ব সাত কিলোমিটার। এত দূরে গিয়ে কীভাবে অনুশীলন করবে? তখন কেউ রাজি হয়নি। আমরাও বাধা দিয়েছিলাম। তখন ওর চাচা নিতাই চন্দ্র সরকার সাহস জোগাতে থাকেন। ভাতিজিকে কোনো দিন সাইকেলে, কোনোদিন ভ্যানে, কোনোদিন হেঁটে অনুশীলন করতে নিয়ে যান। কৃষ্ণা স্কুল দলের হয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিতে থাকে।

২০১৩ সালে বাফুফে তৃণমূল পর্যায় থেকে মহিলা ফুটবলার তুলে আনার কর্মসূচি হাতে নেয়। দেশের ৪০টি ভেন্যুতে একসঙ্গে এ প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি পালন করে। টাঙ্গাইল জেলা থেকে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয় কৃষ্ণা। তার পরের গল্পটা শুধু সামনের দিকে এগোনোর।

কৃষ্ণার বাবা বলেন, ‘ফুটবল খেলার প্রতি আগ্রহ দেখে ৪০ টাকা দিয়ে একটি বল কিনে দিয়েছিলাম। কে জানত সেই বলই তাকে আজকের এ অবস্থায় এনে দেবে। মেয়ের সাফল্যে খুব খুশি হয়েছি। এলাকার মানুষও শুভেচ্ছা জানাতে আসছে।’ কৃষ্ণার মা নমিতা রানী সরকার বলেন, ‘আমি আমার মেয়েসহ ওদের দলের সবার জন্য দেশবাসীর কাছে আশীর্বাদ কামনা করি।’

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. আতাউল গনি বলেন, ‘নারী ফুটবলে কৃষ্ণার এ সাফল্যে টাঙ্গাইল তথা বাংলাদেশ গর্বিত। আমরা এ কৃতী ফুটবলারকে টাঙ্গাইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত