মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরে পুলিশ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত এক যুবক ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে শহিদুল ইসলাম শাওন (২৬) নামের ওই যুবকের মৃত্যু হয়। যুবদল কেন্দ্রীয় সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু শহিদুলের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানান, তিনি মীরকাদিম পৌর যুবদলের কর্মী ছিলেন।
এদিকে গত বুধবারের ওই ঘটনায় গতকাল রাতে সদর থানায় ওই দুটি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোতে বিএনপির দেড় সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ২৪ জনকে। এদিন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলার প্রতিবাদে শহরে পৃথক পৃথক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। গত বুধবার মুন্সীগঞ্জের মাওনাঘাটে বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন শহিদুল। সে সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান দলটির নেতাকর্মীরা। এক পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হন শহিদুল। গুরুতর আহত অবস্থায় সেদিন বিকেলেই তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছিল।
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) মো. বাচ্চু মিয়া জানান, গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় আহত অবস্থায় শাওনকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তার মাথায় আঘাত ছিল। মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে।
গতকাল বিএনপির মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত শাওন ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।’
শহিদুলের ছোট ভাই সোহানুর রহমান সোহান জানান, তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ সদরের মীরকাদিম পৌরসভার মুরমা গ্রামে। বাবার নাম ছোয়া আলী ভূইয়া। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে শহিদুল সবার বড়। শহিদুল পেশায় অটোরিকশা চালক ছিলেন। স্ত্রী সাদিয়া আক্তার ও এক বছরের ছেলে আবরারকে নিয়ে তিনি গ্রামে থাকতেন। শহিদুলের বন্ধু নাহিদ খান বলেন, যাত্রী নিয়ে সমাবেশে গিয়েছিলেন তিনি। তখন আহত হন। আমরা জানতে পেরেছি পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন তিনি।
দুই মামলা, আসামি দেড় হাজার : মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অর্থ) সুমন দেব জানান, পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র লুটের চেষ্টা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় সদর থানায় এসআই মাঈনউদ্দিন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এ মামলায় জেলা বিএনপির সদস্য সচিব কামরুজ্জামান রতনকে প্রধান আসামি করে দলের ৩১৩ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত পরিচয় আরও ১ হাজার ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় আটক ২৪ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আদালত গতকাল তাদের জেলহাজতে পাঠিয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও জানান, মুক্তারপুর এলাকার বাসিন্দা শ্রমিক লীগ কর্মী আবদুল মালেক বাদী হয়ে অপর মামলাটি করেন। মুক্তারপুর এলাকার দোকানপাট ভাঙচুর ও মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এ মামলা করেন তিনি। এতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক উপমন্ত্রী আবদুল হাইয়ের ছোট ভাই ও সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলায় ৫২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও ২০০ জনকে।
যুবদল নেতার কারখানায় আগুন : পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর গত বুধবার রাত দেড়টার দিকে শহরের উপকণ্ঠ মীরেশ্বরাই গ্রামে বিএনপিদলীয় সাবেক উপমন্ত্রী আবদুল হাইয়ের ভাগ্নে ও জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নিজামউদ্দিনের সুতার কারখানায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় কারখানাটির পাশের অন্তত পাঁচটি বসতঘর আগুনে পুড়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, মুক্তারপুর এলাকার পুরাতন ফেরিঘাটে গত বুধবার বিকেলে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে মুক্তারপুরসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। মানুষজন যে যার ঘরে ঘুমিয়ে ছিল। গভীর রাতে আগুনের পোড়া গন্ধে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। দেখতে পান সুতার কারখানায় দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ওই আগুন পার্শ্ববর্তী ঘরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সাবেক উপমন্ত্রী আবদুল হাইয়ের ভাগ্নে নিজাম উদ্দিনের অভিযোগ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের জের ধরেই তার সুতার কারখানায় আগুন দেওয়া হয়েছে। সদরের পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোস্তফার লোকজন সুতার কারখানায় আগুন দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার দাবি আগুনে ৭০-৮০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল : পুলিশের ওপর বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার প্রতিবাদে গতকাল আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যানারে পৃথক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়েছে। বিকেল ৫টার দিকে শহরের পুরাতন কাচারী এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে জেলা আওয়ামী লীগ। এতে বক্তৃতা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আলহাজ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র হাজী মো. ফয়সাল বিপ্লবের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন ও উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসুজ্জামান আনিস, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চরকেওয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফসারউদ্দিন ভুইয়া আফসু, সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান সোহেল, শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন প্রমুখ। এছাড়া এদিন সকালে শহরের হাটলক্ষ্মীগঞ্জ এলাকা থেকে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যানারে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে থানারপুল এলাকায় এসে সমাবেশে মিলিত হয়।
