শ্রমিক লীগ নেতার মামলায় নিহত শাওনও আসামি

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:২২ এএম

মুন্সীগঞ্জ পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত যুবদলকর্মী শহীদুল ইসলাম শাওনসহ ৫২ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে সদর থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন শ্রমিক লীগকর্মী আবদুল মালেক। মামলায় নিহত শাওনকে তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে মামলা দায়ের করা হয়।

এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নিহতের প্রথম নামাজে জানাজা হয়। পরে তার লাশ মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার মুররা গ্রামে নেওয়া হয়। সেখানে আরেকটি জানাজা শেষে রাত পৌনে ১০টার দিকে তার দাফন হয়। 

গত বুধবার বিকেলে মুন্সীগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠ মুক্তারপুর পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশ, সাংবাদিক ও বিএনপি নেতাকর্মীসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় যুবদল নেতা শহীদুল ইসলাম শাওন, জাহাঙ্গীরসহ তিনজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে শাওন গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৯টার দিকে মারা যান।

মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব কামরুজ্জামান রতন গতকাল শুক্রবার বিকেলে দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘কয়েক মাস আগে মারা গেছেন মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাচ্চু। মুক্তিযোদ্ধা এ নেতাকে গার্ড অব অনার প্রদান করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এরপরও মৃত এই নেতাকে আসামি করেছে পুলিশ। এছাড়া আসামিদের মধ্যে টঙ্গীবাড়ি থানা বিএনপির নেতা মনির উদ্দিন পল্টুন জাপানে রয়েছেন এবং জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মুন্না চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে রয়েছেন। পুরো মুন্সীগঞ্জের প্রতিটি ইউনিটের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আসামি করেছে পুলিশ। তিনি বলেন, ‘মামলা দায়েরের আগে থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীদের যাদের পেয়েছে তাদেরকে গ্রেপ্তার করেছে। বাসাবাড়িতে পুলিশ হানা দিয়েছে। গ্রেপ্তারের ভয়ে নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ¦ালিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।’

শহীদুলের লাশ হস্তান্তরে গড়িমসির অভিযোগ : বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলেন, ‘লাশ না পাওয়ায় পূর্বনির্ধারিত বাদ জুমা নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শাওনের নামাজে জানাজা করা যায়নি। ময়নাতদন্তের নামে লাশ প্রদানে গড়িমসি শুরু করে পুলিশ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।’ পরে বিকেলে শাওনের মরদেহ গ্রহণে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যুবদলের নেতারা ঢামেকে ভিড় করেন। সন্ধ্যার আগে তারা শাওনের লাশ বুঝে পান। এরপর তার লাশ নেওয়া হয় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। সেখানে তার প্রথম জানাজা হয়। পরে তার লাশ মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। জানাজা শেষে অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে নাইটেঙ্গেল মোড় ঘুরে নয়াপল্টনে গিয়ে শেষ হয়। রাতে আবার রিজভীর নেতৃত্বে একটি মশাল মিছিলও হয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। 

জানাজায় অংশ নেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন, যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোনায়েম মুন্না, ছাত্রদল সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ প্রমুখ।

জানাজার আগে বিএনপি ও যুবদলের পক্ষ থেকে শাওনের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নেতাকর্মীরা। জানাজা শেষে তার লাশ মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজধানী ঢাকার বাইরে সারা দেশের জেলা শহরে জেলা বিএনপি বাদ জুমা শাওনের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া আজ শনিবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে বিএনপি।

সরকার পতনের মধ্য দিয়ে এ হত্যার বিচার করা হবে : জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে শাওন হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘শাওনের রক্ত বৃথা যেতে দিব না। সরকার পতনের মধ্য দিয়ে শাওন হত্যার বিচার নিব। সরকারের পতন ঘটিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

নিহত শাওনকে আসামি করে শ্রমিক লীগের মামলা : গত বুধবার মুন্সীগঞ্জে পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতে মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় শ্রমিক লীগ কর্মী আবদুল মালেক এবং সদর থানার এসআই মাঈন উদ্দিন বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেছেন। দুই মামলায় বিএনপির দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিক লীগের নেতাদের দায়ের করা মামলায় নিহত যুবদল কর্মী শাওনকে ৩নং আসামি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানার এসআই আবুল বাশার বলেন, ‘শাওন মামলার আসামি এটা সত্য। তবে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’

স্বজনদের হাহাকার : শাওনের স্ত্রী সাদিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ৮ মাস আগে সন্তান জন্মের পর আমি বাবার বাড়িতে বসবাস করে আসছিলাম। গত বুধবার বিএনপির সমাবেশে যাওয়ার দুই দিন আগে আমাদের বাড়িতে এসেছিল শাওন। কথা ছিল কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে ও সন্তানকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসবে শাওন।’

সাদিয়া বলেন, ‘দুই দিন পরই আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসবে বলেছিল। এজন্য বাজার-সদাই করবে। তাই কাজে খুব মনোযোগী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমাকে আর নিয়ে এলো না। এখন আমি সন্তান নিয়ে নিজেই চলে আসলাম। শাওন তো আর এলো না।’

এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে যুবদলকর্মীর মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর থেকে গোটা মুরমা এলাকা শোকে স্তব্ধ। গতকাল শুক্রবার সকালে যুবদলকর্মীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে কান্নার রোল। শোকের মাতম চলছে পরিবারের সদস্যদের মাঝে। তাদের সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা নেই কারও। বসতঘরের এক কোণে বসে অঝোরে কেঁদে চলেছেন স্ত্রী সাদিয়া আক্তার। কোলে ৮ মাসের সন্তান আবরার ভূইয়া সাহাদ। অবুঝ এ শিশুসন্তান জানে না তার বাবা আর নেই। আর কখনই বাবা তাকে কোলে নিয়ে আদর করবে না, চুমু খাবে না।

শহীদুলের মা লিপি আক্তার বলেন, আমার ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবার বড় ছিল শাওন। অল্প বয়সে বিয়ে করে সংসারের হাল ধরে। বুধবার বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে বলেছিল ঘুরতে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে আসবে। কই আমার ছেলে জীবিত ফিরে এলো না। আমার ছেলেডারে গুলি করে মেরে ফেলল। বাড়িতে এলো লাশ হয়ে। আমার ৮ মাসের নাতি সাহাদ বাবাকে চেনার আগেই হারায়ে ফেলল।

মুরমা গ্রামের ছোয়াব আলী ভুইয়ার বড় ছেলে শাওন অটোরিকশা চালাতেন। অভাব অনটনের সংসারে হাসি ফোটাতে বাবার সঙ্গে অল্প বয়সেই চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় শাওন অটোরিকশা চালাতে শুরু করে।

২০২১ সালে পার্শ্ববর্তী টঙ্গীবাড়ি উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের সাদিয়া আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর শ্বশুরালয় ও নিজ বাড়ি মিলিয়ে জীবনযাপন করে আসছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত