প্রবৃদ্ধির কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:১৮ এএম

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রগতি করেছে। এই প্রবৃদ্ধির গতিপথ ধরে রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধির হারকে আরও ত্বরান্বিত করতে দেশটির একটি শক্তিশালী সংস্কার এজেন্ডা প্রয়োজন। এজন্য প্রবৃদ্ধির কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করছে বিশ^ব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের একটি নতুন প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

‘লঞ্চ অব দ্য বাংলাদেশ কান্ট্রি ইকোনমিক মেমোরেন্ডাম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রতিবেদনটি প্রকাশে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের অ্যাক্টিং ডিরেক্টর ড্যান্ড্যান চেনের শুভেচ্ছা বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয়। এতে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন সিনিয়র ইকোনমিস্ট নোরা দিহেল, বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট কনসালট্যান্ট ড. জাহিদ হোসেন। উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সানেমের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর প্রফেসর সেলিম রায়হান, এসবিকে টিচ ভেঞ্চার্স অ্যান্ড এসবিএকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সোনিয়া বশির। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের লিড ইকোনমিস্ট ইউতাকা উশিনোর সঞ্চালনায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন মাইক্রোইকোনমিকস, ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক সেক্টরের দক্ষিণ এশিয়ার প্র্যাকটিস ম্যানেজার হোন এস সোহ।

বৃহত্তর ঢাকা দেশের জিডিপির এক-পঞ্চমাংশ এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেক উৎপন্ন করে। জলবায়ু অভিবাসীদের সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যেই ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী প্রস্তুত করা দরকার বলে প্রস্তাব করেছে বিশ্বব্যাংক।

গত এক দশকে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০টি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ড্যান্ড্যান চেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। নতুন এবং উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলোসহ প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির পরিবর্তনশীল মনোযোগের জন্য নতুন নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবনের দাবি রাখে। ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের রূপকল্প অর্জনের জন্য বাংলাদেশের শক্তিশালী এবং রূপান্তরমূলক নীতি পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বিশ^ব্যাংকের কিছু প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করতে পারি। তার মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো, ব্যাংকিং সেক্টরকে গতিশীল করতেও কিছু কাজ করা প্রয়োজন। যদিও এখানে কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন আছে।

মন্ত্রী বলেন, কারেন্সি সোয়াপের সঠিক প্রয়োজন আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রচুর। অর্থাৎ ১ টাকা রপ্তানি করলে আমদানি করতে হয় ১০ টাকা। এখানে ৯ টাকা ঘাটতি থাকছে। এসব ঘাটতি কমাতে আমাদের পণ্য সেসব দেশকে নেওয়ার প্রস্তাব দিলে তারা অনেক সময় না করে দেয়। এক্ষেত্রে বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঘাটতি কমাতে রাজনৈতিকভাবে বসে কথা বলা প্রয়োজন।

ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে এম এ মান্নান বলেন, ব্যাংকি খাতের সমস্যা আছে। এগুলো মোকাবিলা করব, সমাধান করব। আমাদের সংস্কার করতেই হবে, আমাদের ভোটাররা এটা চায়। পলিটিক্যাল কিছু বিষয় আছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

নোরা দিহেল বলেন, উন্নত নগরায়ণ এবং সংযোগ জলবায়ু অভিবাসীদের সুরক্ষা দিতে এবং দ্রুত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। সফল নগরায়ণের অর্থ হবে ছোট এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আকৃষ্ট করা। মাঝারি আকারের শহরগুলোকে দক্ষ কর্মীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনসহ অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং পরিষেবার বিধানের জন্য শহরগুলোকে তাদের নিজস্ব রাজস্ব বাড়াতে হবে। দ্রুত ব্রডব্যান্ড গতি, মৌলিক পরিষেবাগুলো আরও সহজলভ্য করতে হবে।

ড. জাহিদ হাসান বলেন, দেশের আর্থিক খাত একটি সংকটময় অবস্থানে আছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে হুমকি হিসেবে আছে জলবায়ু পরিবর্তন। বিপরীতে আশা দেখাচ্ছে ডিজিটাল বা প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। কিন্তু এ দেশে অশুল্ক বাধা ২০০ শতাংশের বেশি। এসব বাধাকে আলোচনার বাইরে রাখা ঠিক নয়। আমরা এখনো বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক বাধার সম্মুখীন হচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনসের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের রপ্তানির হার কমে যাবে ২০ শতাংশ। এগুলো নিয়ে এখনই কাজ শুরু করতে হবে। কিছু জায়গায় অবশ্যই আমাদের পরিবর্তন আনতে হবে। রাজনৈতিক অর্থনীতিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় আনতে হবে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটি সরাসরি পার ক্যাপিটা জিডিপির সঙ্গে জড়িত। তাই ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়াতে হবে।

সেলিম রায়হান তার আলোচনায় বলেন, বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কয়েক যুগ ধরে দেশের ব্যষ্টিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় আছে।  কিন্তু কয়েকটি খাতে নীতিনির্ধারকরা নজর দিতেই ভুলে গেছেন। যেমন স্বাস্থ্য খাতে খুব কমই ব্যয় করে বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, শুধু ব্যাংক খাতই নয়, সংস্কার করার মতো বহু খাত এখনো বাকি আছে। দেশের বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এখনই। চামড়া খাত পোশাকের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারত। এটি শক্তিশালী করার এখনো সুযোগ রয়েছে। আমি বুঝি না, এটি কেন এখনো সংস্কারের মধ্যে আনতে পারছে না। তাই বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এখনই।

দেশের চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত অর্থনীতির চালকের ভূমিকায়, সেটিকে সুস্থ রাখা জরুরি। আর্থিক খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারেও একই কথা। ট্যাক্সেশনও বড় চ্যালেঞ্জ, এর সংস্কার জরুরি। দেশের উচ্চ সুদহার কমাতেই হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য বেসরকারি খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। সম্পদের গুণমান উন্নত করা, ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান নন-পারফর্মিং লোন মোকাবিলা করা, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ঋণ বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য জরুরিভাবে প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত