বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কমিটি বিলুপ্তির পর কুবি ছাত্রলীগের অস্ত্রের মহড়া

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৪:০৯ এএম

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শাখা ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। গত শুক্রবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ওই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

এদিকে ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। কুবি ছাত্রলীগের বিবদমান দুটি পক্ষ সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহী এবং সদ্য সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজের অনুসারীরা গতকাল শনিবার ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি সশস্ত্র মহড়া দিয়েছে। এ সময় ফাঁকা গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল বিকেল ৩টার দিকে ছাত্রলীগের একটি অংশের নেতাকর্মীরা ৪০-৫০টি মোটরসাইকেল নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকে। তারা ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত মোটরসাইকেল শোডাউন করে। তাদের মধ্যে অনেকেই বহিরাগত ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাত্রলীগের এই অংশটির নেতাকর্মীরা শহীদ মিনার থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে গিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ার পাশাপাশি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। তারা হলটিতে অবস্থান করা ছাত্রলীগের অপর অংশের নেতাকর্মীদের বের হতে বলে। একইসঙ্গে কুবি ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি (২০১৭ সালে গঠিত কমিটির) ইলিয়াস হোসেন সবুজের বিরুদ্ধে এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক (২০১৫ সালে গঠিত কমিটির) রেজা-ই-এলাহীর পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। প্রায় ২০ মিনিট সেখানে অবস্থানের পর প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকী ও অন্য শিক্ষকরা এসে অনুরোধ করলে চলে যায় রেজা-ই-এলাহীর অনুসারীরা। এরপর ইলিয়াসের অনুসারীরা তাদেরকে প্রতিহত করতে হল থেকে নামতে শুরু করে। এ সময় তাদের হাতে রামদা, হকিস্টিক ও লাঠিসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র দেখা যায়। প্রধান ফটক বন্ধ থাকার পরও কীভাবে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে শোডাউন করে এমন প্রশ্ন তুলে তারা প্রক্টরের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে।

ক্যাম্পাসে মহড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কুবি ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহী বলেন, ‘কমিটি বিলুপ্ত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও লোটাস কামালকে (অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল) ধন্যবাদ জানিয়ে আনন্দ মিছিল দিয়েছি। কিন্তু ওরা (ইলিয়াসের অনুসারীরা) ঝামেলা করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার বিষয়টিকে ঘোলাটে করার জন্য তারা (ইলিয়াসের অনুসারীরা) বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কমিটি বিলুপ্ত করার পরও তারা বিষয়টিকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। আর ক্যাম্পাসের যে কেউই আমার নামে স্লোগান দিতে পারে। সব জায়গায় আমার অনুসারী আছে।’

অন্যদিকে কুবি শাখা ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ বলেন, ‘দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭১ সালের কালরাত ছাড়া হলের ভেতরে ঢুকে গুলি করা, ককটেল মারা, পুলিশ এবং প্রক্টরের সামনে দিয়ে ক্যাম্পাস গেট অতিক্রম করে হলের (বঙ্গবন্ধু) দোতলায় উঠে যাওয়া, প্রক্টরের পাশেই ককটেল ফোটানো এটি বিরল ঘটনা হয়ে থাকবে। এখানে তিন-চারজন সাবেক ছাত্র এবং একজন রানিং ছাত্র, অটোচালক, বহিরাগত, বিভিন্ন মামলার আসামি ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কুবি প্রশাসনকে বলব ছেলেদের দুপুরে ঘুমানোর যদি নিরাপত্তা না থাকে তাহলে এ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া উচিত। প্রশাসনের নীরব ভূমিকার কারণে তাদের সামনে এ ঘটনা ঘটেছে। অস্ত্রসহ প্রশাসনের লোকের সামনে কীভাবে ক্যাম্পাসে ঢোকে। যারা এ ঘটনায় জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে এজাহারভুক্ত মামলা করতে হবে। তা না হলে সব শিক্ষার্থীকে সাথে নিয়ে আমরা কঠিন আন্দোলনে যাব, দরকার হলে আমরণ অনশন করব।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা প্রভোস্টদেরকে নিয়ে বসেছি এবং উপাচার্যের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। আমরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করব।’

কমিটি বিলুপ্ত নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য : বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ফেইসবুক পেইজে শুক্রবার রাত ১১টা ৪৯ মিনিটে কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার মাধ্যমে কুবি ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার কথা জানানো হয়। কিন্তু বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের আধাঘণ্টার মধ্যে ছাত্রলীগের ফেইসবুক পেইজ থেকে তা আবার সরিয়ে ফেলা হয়। পরে ওই দিন রাতেই কমিটি বিলুপ্তির সত্যতা নিশ্চিত হতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের একাধিক নেতার সঙ্গে  মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেন।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য ও দপ্তর সম্পাদক ইন্দ্রনীল দেব শর্মা রনি বলেন, কুবি ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে কমিটি বিলুপ্তির বিষয়টি সত্য বলে দাবি করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন।

আবার ছাত্রলীগের ফেইসবুক পেইজ থেকে পোস্টটি সরিয়ে ফেলা হলেও কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন নিজেদের ফেইসবুক ওয়ালে বিজ্ঞপ্তিটি রেখে দেন।

সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য মোবাইল ফোন থেকে পাঠানো বার্তায় বলেন, কুবি ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়নি। সম্মেলন আয়োজন করা হবে। তারিখ নির্ধারণ হলে জানানো হবে।

দপ্তর সম্পাদক ইন্দ্রনীল দেব শর্মা রনি জানান, কুবির কমিটির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এখনো। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি ভুল করে দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন তার ফেইসবুক স্ট্যাটাস দেখতে বলেন। পরে আবারও যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রেস রিলিজ হয়েছে কমিটি বিলুপ্তের। এখন পর্যন্ত আমরা এটাই জানি। পরবর্তীতে কোনো আপডেট পাইনি যে ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছে কি না।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

২০১৭ সালের ২৮ মে লোকপ্রশাসন বিভাগের ইলিয়াস হোসেন সবুজকে সভাপতি এবং গণিত বিভাগের রেজাউল ইসলাম মাজেদকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছরের জন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ১১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত