প্রতিকূলতায়ও কন্যাশিশুদের এগিয়ে চলা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১১:৩০ পিএম

প্রতিবারের মতো এবারও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উদযাপিত হচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর কন্যাশিশু দিবস হলেও এ বছর আজ ৪ অক্টোবর তা কেন্দ্রীয়ভাবে উদযাপিত হচ্ছে। দিবসটি পালনে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো : ‘সময়ের অঙ্গীকার : কন্যাশিশুর অধিকার’।

বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের সমাজও প্রধানত পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত। পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনাকাক্সিক্ষত হিসেবে বিবেচিত হয় কন্যাশিশুর জন্ম। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায়। সেখানে কন্যাশিশুর জন্ম বাড়তি বোঝা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের গ্রহণও করা হয় বিরক্তির সঙ্গে। এর পেছনে গতানুগতিক যে দৃষ্টিভঙ্গিটি কাজ করে তা হলো কন্যাশিশুরা পরিবারের অর্থ উপার্জনকারী কেউ নয়। তাই তাদের শিক্ষা ও কর্মদক্ষতা বাড়ানো অপ্রয়োজনীয়। নেতিবাচক এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অধিকাংশ সময় তাদের শিক্ষাকে ব্যাহত করে অল্প বয়সেই বিয়ে দেওয়া হয়, কিংবা লাগিয়ে দেওয়া হয় গৃহস্থালির কাজে। ফলে শিক্ষিত, সচেতন, কর্মদক্ষ এবং একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত হয় কন্যাশিশুরা। বৈষম্যমূলক সমাজে এবং পরিবারে জন্ম নেওয়া কন্যাশিশুর ভাগ্যে পরিবার থেকেই শুরু হয় শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, পাচার, যৌতুকের দায়ে নির্যাতন, হত্যা ইত্যাদি প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে কন্যাশিশুদের জীবনে। কন্যাশিশু নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, আমরা ভয়াবহ এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আরেকটি বিষয় এ মুহূর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর তা হলো কন্যাশিশুর নিরাপত্তার অভাব, তাদের প্রতি যৌন নিগ্রহ।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৭৪ জন কন্যাশিশু। পাশাপাশি ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ৭৪ জনের ওপর। মাঠ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক গত ৮ মাসে ২৫টি জেলার বিভিন্ন উপজেলার আওতাধীন ১,৬৬৯ জন কন্যাশিশুর বাল্যবিয়ে সংঘটিত হয়েছে, যা গড়ে প্রতি মাসে দাঁড়ায় ২০৯ জন। এ সময় প্রশাসনের সহায়তায় তাৎক্ষণিকভাবে ৫৮৯টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে। বাল্যবিয়ের পাশাপাশি অপহরণের শিকার হয়েছে ১৩৬ জন। অপহরণ করা এসব শিশুই সাধারণত পাচার হয়ে থাকে। আই নিউজের তথ্যানুযায়ী, গত ১০ বছরে প্রায় দুই লাখ নারী ও শিশু ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের শিকার হয়েছে। পাচার হওয়া এই নারী ও কন্যাশিশুদের বেশির ভাগই যৌন-পেশায় নিয়োজিত হতে বাধ্য হয় এবং পরে এদের অনেকে এইচআইভিসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বরণ করে নির্মম পরিণতি। এসব পরিস্থিতি পরিবর্তনে সামগ্রিকভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অত্যন্ত জরুরি।

কন্যাশিশুর প্রতি বিরাজমান বঞ্চনা ও বৈষম্য দূর করে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার চেতনাবোধকে সামনে নিয়েই শুরু হয়েছিল ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস’ উদযাপন। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রয়েছে। কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ এবং তাদের প্রতি যতœবান হওয়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রত্যেকটি সার্ক সম্মেলনেই সার্কভুক্ত দেশগুলো কন্যাশিশুদের উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। ১৯৯৫ সালে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে নারী উন্নয়নের জন্য যে বারোটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়েছে এর মধ্যে কন্যাশিশু অন্যতম।

এই বাস্তবতায় ২০০০ সালের ৪ জুন তারিখে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টসহ আরও ৫৪টি বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক সংগঠন এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, সবাই মিলে বিষয়টির গুরুত্ব ও দিবস ঘোষণার অনুরোধ জানিয়ে একটি ধারণাপত্র তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যিনি বর্তমানে আমাদের সবার প্রিয় নারী ও শিশুবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর পাঠানো হয়। এরই ফলে ২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা ঘটে। অত্যন্ত গর্বের বিষয় যে, ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে সরকার এবং বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশকে এই ক্ষেত্রে অগ্রণী রাষ্ট্র (চরড়হববৎ ঈড়ঁহঃৎু) বলা যেতে পারে। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে অ্যাডভোকেসির ফলে ২০১১ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। ২০১২ সালে জাতিসংঘের রেজুলেশন ৬৬/১৭০-এর মাধ্যমে ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উধু ড়ভ ঃযব এরৎষ ঈযরষফ ঘোষণা করা হয়। 

কন্যাশিশুদের চলার পথে শত প্রতিকূলতা, কুসংস্কার, মানসিক, শারীরিক এবং বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানিমূলক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের কন্যারা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করছে। তারা ফুটবল, ক্রিকেট, ভারোত্তলন, সাঁতারসহ বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করে লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্বের বুকে স্থাপন করছে। তারা হিমালয়কে জয় করছে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন বিশ্বের কাছে একটি বিস্ময়কর প্রতিষ্ঠান। যেখানে পোশাকশ্রমিকদের শতকরা ৫০ ভাগ কন্যা (মোট ৪২ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে নারী ২৪ লাখ ৯৮ হাজার, আর পুরুষ ১৭ লাখ ২২ হাজার)।

একইভাবে বাংলার কন্যারা প্রশাসন, সাংবাদিকতা, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশবাহিনী, সেনাবাহিনীতে যোগদান করে অত্যন্ত দক্ষতা এবং যোগ্যতার সঙ্গে প্রমাণ করছে যে তারাও পারে। শুধু প্রয়োজন তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা। তাহলেই তারা বিশ্ববিজয়ী হতে পারবে।

লেখক : সম্পাদক, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত