জন্ম ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯১০ ঢাকাতেই। পড়াশোনা স্কুল পর্ব ঢাকায়, কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ^বিদ্যালয় এবং লন্ডন বিশ^বিদ্যালয়ে। সেখানে অর্থনীতির অনার্সে ১৯৩০ সালে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলেন এবং পিএইচডি শুরু করলেন। ওদিকে বিলেতবাসী তার বন্ধুরা আইসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে লেগেছেন। তারা পরীক্ষায় বসতে নবগোপাল দাসকেও প্ররোচিত করেছেন। বাকিটুকু নবগোপাল দাসের লেখা ‘মাই লাইফ ইন দ্য আইসিএস’ থেকে অনুসৃত হলো :
আইসিএসে আমার জীবন
‘দুর্ঘটনাক্রমে’ আমি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিই। ১৯৩০-এর অক্টোবরে আমি জামসেদজি টাটা বৃত্তি নিয়ে বিলেতে রওনা হই এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সস-এ প্রোব্লেমস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে গবেষণা কর্মে যোগ দিই। বিলেতে আমার কিছু বন্ধু উন্মুক্ত আইসিএস পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছে। তারা আমাকেও প্ররোচনা দিল। তাদের কারণে ১৯৩১-এর জুলাই পরীক্ষায় বসলাম এবং ফলাফলে আমি নিজেই বিস্মিত হলামপরীক্ষায় শুধু সফল হয়েছি তা-ই নয়, ভারতীয় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছি। ভয়ংকর ঝড় ঘনিয়ে এলো যখন লন্ডন স্কুলের কর্তৃপক্ষের কানে গেল যে আমি আইসিএস দিয়েছি এবং টিকেই গেছি। প্রফেসর লায়োনেল (পরে লর্ড) রবিনস স্পষ্টই বিরক্ত হয়েছেন এবং রেগে গিয়ে অনেকটা স্থূলভাবে আমাকে নির্দেশ দিলেন কোন কাজটা করবে ঠিক করোআইসিএস না ডক্টরাল রিসার্চ। (প্রফেসর রবিনস ১৯৯৮-১৯৮৪ নিউ-ক্ল্যাসিক্যাল ঘরানার অর্থনীতিবিদ এবং খ্যাতিমান প্রফেসর)। তাকে সম্মত করাতে আমাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হলো যে চাকরি আর পড়াশোনার মধ্যে বড় কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমি পাঁচ বছরের মধ্যে ফিরে এসে আমার ডক্টরাল থিসিস দাখিল করব কারণ আমি রিসার্চ সম্পন্ন করতে খুবই আগ্রহী কিন্তু সরকার বিলেতে আমার অবস্থানকাল বাড়াতে এখনই সম্মত হবে না। ফলে আমি আবার এসে নিয়মিত ছাত্র হয়ে কাজটা শেষ করব। আমি আমার কথা রেখেছি, পাঁচ বছর পেরোনোর আগেই আমি যুক্তরাজ্যে এসে স্কুলে যোগ দিই। থিসিস সম্পন্ন করে লন্ডন বিশ^বিদ্যালয়ের কাক্সিক্ষত অর্থনীতির পিএইচডি লাভ করি।
পাঁচ বছর আইসিএসে কাটিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরে গিয়ে থিসিসের কাজটা শেষ করি। এ সময় অল্প কিছুদিন বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে বাদ দিয়ে বাকিটা বাংলার এমনসব জায়গায় কাটাতে হয়েছে যেখানে সভ্যতা প্রবেশ করেনি বলা যায়। জীবন কঠিন ছিল, মজারও। পূর্ব সুন্দরবন বদ্বীপ অঞ্চলে (এখন তা অবশ্যই পূর্ব পাকিস্তানে) চার চাকার গাড়ি ব্যবহার করার কোনো সুযোগই ছিল না এমনকি ঘোড়ার গাড়িও না। এসডিও হিসেবে আমি নৌকা বা লঞ্চই ব্যবহার করেছি। ঘুমোনোর কেবিনসহ চমৎকার একটি ছোট লঞ্চ ছিল। লঞ্চ নিয়ে একবার বেরোলে বেশ কদিন সদর দপ্তর থেকে দূরে কেটে যেত। এসডিওর বোট কিংবা লঞ্চ আসছে মাত্রই সে অঞ্চলের কাজকর্মের ক্ষিপ্রতা ও তীব্রতা বেড়ে যেতসারা দিন কখনো রাতেও আমাকে স্থানীয় অভিযোগ শুনতে হতো। স্থানীয় রাজনীতি এবং দলাদলিও এখনকার মতোই (নবগোপাল দাসের লেখাটি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত)। তবে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমার মনে আছে দুজন স্থানীয় খান সাহেব আমার দৃষ্টিতে আসার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেনএই আশায় যে আমার সুপারিশ গেলে খান বাহাদুর খেতাব পাবেন। এই প্রতিযোগিতায় একজন অন্যজন যে ব্রিটিশ রাজের অনুগত ননএটা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগতেন। আনুগত্যের প্রশ্নে আমার চাওয়া কী সে কথা আমার অজান্তে আমার আগেই সেখানে গিয়ে পৌঁছেছে। দুজনের মধ্যে যিনি জ্ঞানী তিনি বাজে বিশেষণ ব্যবহার না করে কেবল কটাক্ষ করে গেছেন। সেই দিনগুলোতে (তিরিশ ও চল্লিশের দশকের প্রথম ভাগ) অবিভক্ত বাংলার জেলা কর্মকর্তার প্রধান সমস্যা ছিল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে সহিংস ও তিক্ত গণ-উত্থান ঠেকানো। লন্ডনের হোয়াইট হল এবং দিল্লির কর্মকর্তারা সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি হাতে তুলে নিলেন। তারা আদাজল খেয়ে লেগেছেন মুসলমানদের হিন্দুদের কাছ থেকে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
১৯৩৮ সালে আমাকে জেলা থেকে কলকাতায় সচিবালয়ে বদলি করা হলো। আমার দায়িত্ব বাংলার মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের বেকারত্ব নিয়ে কাজ করা (সে আমলে এই বয়সী নারীর বেকারত্বের সমস্যা কোনো দুর্ভাবনার বিষয় হয়ে ওঠেনি কারণ তাদের প্রায় সবাই বিয়ে করে সংসারী হওয়াতে সন্তুষ্ট থাকত।) এ কাজে চ্যালেঞ্জ ছিল। আমাকে বেকারত্বের প্রকৃতি ও বিস্তার নিয়ে সমীক্ষা চালাতে হতো এবং যত বেশি সম্ভব তরুণকে চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করার মতো পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হতো। দুবছর এই দায়িত্বে থাকাকালে আমি দুটো পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং বেশ কটি প্রকল্প দাখিল করি। কিন্তু এসব বাস্তবায়নের আগেই আমি বদলি হয়ে যাই। ১৯৪০-এ আমাকে ভারত সরকারের কৃষি বিপণন উপদেষ্টা করে দিল্লিতে পাঠানো হয়। যদিও আমার আগ্রহ তখন বেকার সমস্যা সমাধান। সে আগ্রহটি অব্যাহত থাকার কারণে ১৯৪৪ সালে আমি এ বিষয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করি। বইটি ভারতীয় পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি বস্তুনিষ্ঠ কাজ বলে প্রশংসিত হয়। বেঙ্গল ক্যাডারের আরও অনেক অফিসারের সঙ্গে দিল্লিতে আমার তিন বছরের কিছু বেশি সময় কাটে। ১৯৪৩-এ মানবসৃষ্ট মন্বন্তরের মোকাবিলায় আমাকে আবার বাংলায় ডাকা হয়। দিল্লিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমিতে কাজ করার সময় প্রায় দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করা কর্মকর্তারা আমার মতামত উড়িয়ে দিতে চাইতেন; আমি যখন মনে করতাম আমার প্রস্তাবই সঠিক, আমি আমার অবস্থান থেকে সরতাম না। মহীশুরের উন্নয়নমন্ত্রী আমাকে দেখে বিশ^াস করতে পারেননি যে আমি প্রদত্ত দায়িত্ব পালনের যোগ্য। অনেকটা নির্দয়ভাবেই তিনি এমন ‘অপরিপক্ব’ একজন অফিসারকে মহাযুদ্ধকালে পদায়ন করার সমালোচনা করলেন। আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম, অল ইন্ডিয়া প্যানেল থেকে আমাকে বেছে নেওয়া হয়েছে, তাদের চাহিদা পূরণ করতে পেরেছি বলেই আমাকে নিয়োগ দিয়েছে।
বাংলায় পদায়ন হলো সিভিল সাপ্লাই বিভাগে। আমার দায়িত্ব অনুমোদিত এজেন্টের মাধ্যমে অন্যান্য প্রদেশ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা। কিন্তু আমার জন্য আসা আঘাতের একটি অভিজ্ঞতা হচ্ছে, অনুমোদিত ডিলাররা মিথ্যাচার করে নিরন্ন মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে সবচেয়ে কম সময়ে সর্বাধিক মুনাফা আদায় করে নিয়েছে। একাধিক ঘটনায় আমি এই সত্যটি ব্রিটিশ সিভিল সাপ্লাই কমিশনারকে জানালে তিনি তা শুধু উপেক্ষাই করেননি তাদের অসদুপায়ে প্রশ্রয় দিয়েছেন। বিশেষ করে মুশকিল লীগের সমর্থনপুষ্ট মুসলমান ডিলারদের ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই তার চোখ বন্ধ রাখতেন। মুসলিম লীগকে সন্তুষ্ট করা ছিল তার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শিগগিরই যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন বিভাগে উচ্চতর পদে বদলি হলে অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে রেহাই পাই।
নবসৃষ্ট এই বিভাগে আমার অবস্থান স্বল্পকালীন, যুদ্ধ শেষ হয়ে আসে (জার্মানি ও ইতালি আত্মসমর্পণ করে আর হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ জাপানকে হাঁটুগেড়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে)। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়লে বেসামরিক জীবনে তাদের পুনর্বাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয়। আমাকে পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ বাংলা, আসাম, মণিপুর ও ত্রিপুরার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ও দেশভাগ এসে যায়। তুলনামূলকভাবে অনেক কম বয়সে (তখন আমার ৩৭ চলছে) আমাকে সর্বভারতীয় পুনর্সংস্থান ও কর্মনিয়োগের মহাপরিচালক করা হয় হেডকোয়ার্টার দিল্লিতে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ এই পাঁচ বছর আমর আইসিএস জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। আমি অত্যন্ত সদয় মন্ত্রী ও সচিবদের পেয়েছি। আমি স্বাধীনভাবে পুনর্বাসন ও পুনঃবসতি স্থাপনের প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। এ সময়ই সারা ভারতে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ ও টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৪৮-এ সানফ্রান্সিসকোতে এবং ১৯৪৯-এ জেনেভায় আমি ইন্টারন্যাশনাল লেবার কনফারেন্সে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি।
১৯৫১ ছিল আমার কর্মজীবনের জন্য একটি মোড় ঘোরানো বছর। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় আমাকে শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য ডাকলেন। ভারতের অন্যতম শিল্পায়িত এই রাজ্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। আমার সময়ই ভারতের প্রথম তিনটি স্টিলমিলের একটি পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে স্থাপন করতে সক্ষম হই। (তারপরের পর্বটা সুখকর ছল না। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি ও প্রশাসন তার মধ্যে অনিচ্ছাকেই করে তুলেছে। নিরপেক্ষ পরামর্শ নেতৃত্বের হাতে পড়ে তুচ্ছ প্রতিপন্ন হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য শাকদের এক ধরনের দৃঢ়তার প্রয়োজন ছিল সত্য কিন্তু তারা অধিকাংশ সময় নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। আশ্চর্যের কিছু নেই। ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গেই তার পরামর্শ ও মতামতের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং তা চলতে থাকে।) আমি যখন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের স্পেশাল সেক্রেটারি, আমার দায়িত্ব অনুযায়ী দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে রিপোর্ট করে যাচ্ছি এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রতিকারের নির্দেশনা চেয়েছি। আমাকে একটি কোমল সতর্ক বার্তা দিয়ে বলা হয় গো সেøাআস্তে চলো। একটু রয়ে সয়ে চললে আমাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। কিন্তু আমার ভেতরের গোঁয়ার্তুমি এতটাই যে আমি তাদের এসব পরামর্শ পাত্তা দিলাম না। ফলে বিভিন্ন জায়গায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো এবং আমার জন্য তা মানসিক যন্ত্রণা ও বিরক্তির কারণ হলো।
এ সময় একটি অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব আমাকে এই যাতনা থেকে রক্ষা করে। এমপ্লায়ার্স ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার মহাপরিচালক হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়, হেড অফিস বোম্বে (এখন মুম্বাই)। এই সংস্থা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই কিংবা এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট বা পরিষদের কেউ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেনও না। তবে তারা আমার কথা জানেন এবং তাদের প্রস্তাব লোভনীয় আইসিএস জীবন ছেড়ে তাদের সংস্থার প্রধান নির্বাহী হওয়া। আইসিএস ছাড়া কিংবা না ছাড়ার বিষয়ে আমার জন্য একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। যদি সময়ের কারণে পুরো পেনশন দাবি করতে পারি কিংবা এটাও সত্য যে আরও দশ বছর আইসিএস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে পারি। অন্যদিকে আমি এখনকার মতো যাতনা ভোগ করা অব্যাহত রাখতে পারি। আমার যেকোনো উদ্যোগে চিফ মিনিস্টার যা বলবেন সেটাই চূড়ান্ত, আবার এটাও সত্য তিনি চাইলে আমাকে অন্য কোথাও সরিয়ে দিয়ে তার ও আমার মাথাব্যথা অপসারণ করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট স্যার হোমি মোদির বশীকরণ ক্ষমতা আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করল। ৩১ ডিসেম্বর ১৯৫৮ থেকে আমি আইসিএস থেকে পদত্যাগ ও অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম এবং ব্যক্তিমালিকানা খাতে প্রথম চাকরিতে যোগ দিলাম। ১৯৫৯-এর ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৬৩-এর শেষ পর্যন্ত ৫ বছর আমি ওই ফেডারেশনের মহাপরিচালকের পদে ছিলাম।
আইসিএস ছেড়ে আসার পর থেকেই বন্ধু ও স্বজনদের অনেকেরই প্রশ্ন চাকরি জীবনের শীর্ষ অবস্থানে উঠে আইসিএস ছেড়ে দেওয়ার কোনো দুঃখ আমার আছে কি না? বরাবরই আমার একই জবাব ‘না’। কোন ‘না’, তার দুটি প্রধান কারণ। প্রথমত, আমি ভাগ্যবানদের একজন। চাকরি জীবনের প্রথম পর্যায়েই কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের সর্বোচ্চ সচিব পদে অধিষ্ঠিত হয়েছি। এসব পদ সিভিল সার্ভিসে যে কারোরই পরম প্রত্যাশিত। আমি জানি আমি যদি আইসিএস হিসেবে চাকরি চালিয়ে যেতাম তাহলে আরও বড় পদ পেতাম, বেশি বেতন, বেশি ক্ষমতা ও দায়িত্ব পেতাম। কিন্তু এজন্য এক ধরনের উদ্যোগ থাকতে হয় ও নাছোড়বান্দা টাইপের হতে হয়। এখানে আমি একেবারেই অক্ষম। দ্বিতীয়ত, আমার স্বাধীনতা লাভের বাসনা ছিল। শুধু স্বাধীন চিন্তা নয়, স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে মনোভাব প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল। সরকারি চাকরি না ছাড়লে এই স্বাধীনতা উপভোগ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যদিও আইসিএস হিসেবে আমি যতটা স্বাধীনভাবে চলেছি, আমার চাকুরে বন্ধুরা তা কল্পনাও করতে পারেনি। এটা ঠিক সরকারি আইনকানুন সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। চাকরিতে নাম লেখানোর সঙ্গে সঙ্গে যে শৃঙ্খলার প্রতি আনুগত্য ঘোষিত হয়েছে সেখান থেকে আমাদের বের হওয়া সম্ভব ছিল না। আমি যুক্তি দেখাই আমি যদি চাকরি ছেড়ে দিই তাহলে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে আমি অবাধে আমার চিন্তাধারা প্রকাশ করতে পারব।
২৬ বছর আইসিএস থাকার স্মৃতি আমি লালন করি। আমার অভিজ্ঞতা তুলনাহীন। আমি খুব কাছে থেকে কেন্দ্রীয় সরকার কেমন করে কাজ করে দিল্লিতে তার অংশ হয়ে অবলোকন করেছি। কলকাতায় থেকে দেখেছি রাজ্য সরকার। আমি ব্রিটিশ রাজের অধীনে পনেরো বছর এবং স্বাধীন ভারতে এগারো বছর চাকরি করেছি। প্রথম ভারতীয় আইসিস (১৮৬৩ সালে যোগদানকারী)। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা স্মরণ না করে পারি না। স্বাধীনতা ক্ষুণœ হয়ে যাচ্ছেএজন্য তিনিও আইসিএস ছেড়ে এসেছেন।
অনুসৃতি লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট