নামের ভেতর একটা দক্ষিণ ভারতীয় দ্যোতনা থাকলেও গায়ত্রী ভেনুগোপালন পুরোপুরি দিল্লির বাসিন্দা। সমাজকর্মী, পরিবেশবাদী আর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের তালিকাভুক্ত আম্পায়ার, নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে পরিচিতি হিসেবে এমনটাই লিখে রেখেছেন। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নারী এশিয়া কাপে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করা গায়ত্রী জানালেন, মাঠে নামলে তিনি নিজেকে শুধুই আম্পায়ার ভাবেন, খেলোয়াড়দের এবং নিজের লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে একদমই মাথা ঘামান না।
কিছুদিন আগেই লিজেন্ডস ক্রিকেট লিগের ম্যাচে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন গায়ত্রী, সেখানে ম্যাচ রেফারি ছিলেন জিএস লক্ষ্মী। ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি সেই আসরে দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচজন ম্যাচ অফিশিয়ালের সবাইকে দিয়েছিলেন ‘বেটি বাঁচাও’ ব্যাজ। লক্ষ্মী আবার পুরুষদের এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে দায়িত্ব পালন করা প্রথম নারী ম্যাচ রেফারি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আইসিসি পুরুষদের বিশ্বকাপ লিগ ২-এর সংযুক্ত আরব আমিরাত বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে ঢুকে গেছেন ইতিহাসে। সিলেটে দুজনেই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ভেন্যু ও অতিথিপরায়ণতা নিয়ে নিজেদের মুগ্ধতার কথা, সেই সঙ্গে শুনিয়েছেন ম্যাচ অফিশিয়াল পেশার সম্ভাবনার কথাও।
গায়ত্রীই জানালেন, নারী আম্পায়ার হিসেবে এখন আর তাকে ভিন্ন চোখে দেখা হয় না আর তিনিও বিভাজন করেন না ‘আমি ২০১৩ সালে আম্পায়ারিং শুরু করেছি। বিসিসিআইর অধীনে আসি ২০১৯ সালে। নিয়মের কিছুটা অদলবদল, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি বিভিন্ন সংস্করণ আছে, সব মাথায় রাখাটা সহজ নয়। তবে এটা সব পেশারই চ্যালেঞ্জের অংশ, এখানেও আছে। আম্পায়ার হতে হলে প্লেয়িং কন্ডিশনের ব্যাপারে প্রস্তুত হতেই হবে। আমি যখন শুরু করি তখন মাঠে নেমে ভেবেছি আমি একজন আম্পায়ার। পুরুষ আম্পায়ার, নারী আম্পায়ার এরকম কোনো চিন্তা আসেনি। আমি শুধুই আম্পায়ার। লিঙ্গ পরিচয় সরিয়ে রেখে ভূমিকাটাই দেখতে চেয়েছি। নিয়মকানুন, প্রস্তুতি এসবের ওপরই গুরুত্ব দিয়েছি। প্রতিনিয়ত শেখার জায়গা অবারিত রেখেছি।’
খেলোয়াড় থেকে কোচ ও পরে ম্যাচ রেফারি হওয়া জিএস লক্ষ্মীও সুর মিলিয়ে বলেছেন ‘আমার মনে হয় এখন মানসিকতার বদল হয়েছে। এখন সবাই বিভিন্ন রকমের পেশার দিকে ছুটছে। এবং প্রতিটা বোর্ডই সাহায্য করছে। আমাদের যেমন দুজন আম্পায়ার ও একজন ম্যাচ রেফারি এখানে এসেছে। সবগুলো বোর্ডই খোলামনে নারীদের পেশায় আসতে দিচ্ছে। শুধু ম্যাচ অফিশিয়াল নয়, ভিডিও অ্যানালিস্ট পেশাতেও নারীদের দেখছি, স্কোরার আছে। বিভিন্ন দিকে এখন আসছে। আমি এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলকে ধন্যবাদ দেই তারা একটা উদ্যোগ নিয়েছে যে এই আসরে শতভাগ নারীদের দিয়ে ম্যাচ পরিচালনা করছে। আমি নিশ্চিত মেয়েরা এই ধরনের টুর্নামেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকবে।’
প্রযুক্তির কল্যাণে আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে এত কাটাছেঁড়া হয় যে ভুল বাড়লে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। গায়ত্রী মনে করেন, অন্য সব পেশার মতো এই কাজেও কিছু ভুল হবে এবং সেটা মেনে নিয়েই মাঠে দাঁড়াতে হবে ‘সাইমন টওফেলের কথা বললেন। অবশ্যই সে এক সময় সেরা ছিল। মরিস ইরাসমাসের কথা বলতে পারি। আমি অবশ্যই তাদের শরীরী ভাষা খেয়াল করি। শান্ত, একাগ্র পুরোটা সময়। আলিম দার আরেকজন। আমাদের দেশে নিতিন মেনন একজন। যেকোনো পেশার মতোই এটাও প্রতিনিয়ত শেখার বিষয়।’
এশিয়া কাপে ভারতের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের আম্পায়ার ও ম্যাচ অফিশিয়ালরা থাকলেও বাংলাদেশের কেউ এখনো নেই। লক্ষ্মী মনে করেন, এই ব্যাপারেও উৎসাহ দেওয়া উচিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ‘আমার মনে হয় বিসিবি বেশি বেশি নারী অফিশিয়ালদের প্রমোট করতে পারে। তাদেরকে ট্রেনিং করাতে পারে। এভাবে তারা সামনে এগুতে পারে, আন্তর্জাতিক প্যানেলে আসতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে তাদের কিছু ম্যাচ পরিচালনার ভার দেওয়া যেতে পারে। এভাবে তারা র্যাঙ্কে আসতে পারে। বিসিবি খুঁজে দেখতে পারে কাদের আম্পায়ারিংয়ে আগ্রহ আছে। তাদের বের করে ওপরে তুলতে সাহায্য করতে পারে, ট্রেনিং করাতে পারে।’
এবারের এশিয়া কাপে সাবেক খেলোয়াড় সাথিরা জাকের জেসিকে দেখা গেছে নানান ভূমিকায়। হয়তো আগামীতে আরও অনেকেই যুক্ত হবেন ক্রিকেট খেলার প্রশাসনিক অংশে। তখন মাঠে খেলার পাশাপাশি ম্যাচ পরিচালনাতেও দেখা যেতে পারে বাংলাদেশের মেয়েদের।
