সরকারি হিসাবেই শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে ২.২৪%

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২২, ০৩:১৯ এএম

অর্থনীতির পরিভাষায় মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার বেশি হলে কারও কাছে হাত পাততে হয় না। নিজেদের ক্রয়ক্ষমতা দিয়েই বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কেনা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মজুরির হারের তুলনায় ২ দশমিক ২৪ শতাংশ কম।

তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, দেশের প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হার ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা বাস্তবে অনেক কম।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এখন শ্রমিক মজুরি পান গড়ে ১০৬ টাকা ৮৬ পয়সা, কিন্তু কোনো পণ্য কিনতে গেলে তার খরচ হচ্ছে ১০৯ টাকা ১০ পয়সা। অর্থাৎ তাকে আরও ২ টাকা ২৪ পয়সা ঋণ করে কেনাকাটা করতে হচ্ছে নতুবা কোনো পণ্য না কিনেই তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। সর্বসাকল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরেই থাকছে। অথচ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। তখন শ্রমিকের গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছর শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই ছিল নিত্যপণ্য। বিশে^ জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামার অজুহাতে গত ৫ আগস্ট দেশে হঠাৎ করেই দাম বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের। প্রভাব পড়ে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে। আগস্টেই খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁই ছুঁই করছিল, সর্বশেষ ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে থেমেছে। সাধারণত এসব তথ্য প্রতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যেই প্রকাশ করে থাকে বিবিএস। কিন্তু দুই মাস পার হয়ে গেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

অবশ্য গত মঙ্গলবার অর্থনৈতিক পরিষদের জাতীয় নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে মূল্যস্ফীতি ও গড় মজুরির তথ্য প্রকাশ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।

পরিকল্পনামন্ত্রীর প্রকাশিত ওই তথ্যে দেখা যায়, আগস্টে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গত বছর সেপ্টেম্বরের তুলনায় মজুরি বেড়েছে দশমিক ৯৭ শতাংশ। গত বছর সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে সেদিন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ‘শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি হারও বেড়েছে। কৃষি, শিল্প ও সেবা সবক্ষেত্রেই মজুরি হার বেড়েছে।’

দেশের শ্রম সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে ৬ কোটি ৩৫ লাখ শ্রমিক রয়েছে। সরকার ৪২টি খাত নির্ধারণ করে এ শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে দিয়েছে। অবশ্য সংগঠনগুলো মতে, শ্রমিকদের অধিকাংশই এখনো অদক্ষ।

জানতে চাইলে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকদের জীবনে মূল্যস্ফীতি বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ, কোনো ক্ষেত্রে ২২ শতাংশ পর্যন্ত। শ্রমিকরা ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ পায় সাড়ে ৪ টাকা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ শতাংশের বেশি। ব্যাংকে টাকা রাখাটাও তাদের জন্য লোকসান।’ তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট হওয়ার কথা সাড়ে ৫ শতাংশ। সরকারি হিসাবে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ৯ শতাংশের বেশি। বাস্তবতার সঙ্গে মেলালে তাদের প্রকৃত মজুরি ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মূলত কৃষি খাতে। এ খাতের শ্রমিকদের আলাদা কোনো মজুরি নেই। সেপ্টেম্বরে শ্রমিকের মজুরির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি গড় মজুরি বৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম। ওই মাসে ছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। এর আগের মাস অর্থাৎ আগস্টে তা ছিল ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

কৃষি শ্রমিকদের প্রসঙ্গে রাজেকুজ্জামান বলেন, ‘শ্রম আইনে কৃষি শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের ইউনিয়নের অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের ক্ষেত্রে ঋতু ও কাজভিত্তিক মজুরি হার নির্ধারণ করা জরুরি।’

কিন্তু তৈরি পোশাকের মতো খাতে কিছুটা নিয়মিতভাবে মজুরি নির্ধারণ করায় শিল্প খাতের মজুরি কৃষকদের তুলনায় কিছুটা বেশি। শিল্প খাতের শ্রমিকদের মজুরির হার সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, আগের মাসে যা ছিল ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আগস্টের তুলনায় এ খাতের মজুরি বেড়েছে দশমিক ৭৪ শতাংশ।

অবশ্য সেবা খাতের শ্রমিকরা মজুরি পান সবচেয়ে বেশি। সেপ্টেম্বরের তথ্যে দেখা যায়, এ মাসে এই খাতের গড় মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। আগস্টে তা ছিল ৭ শতাংশ। মাসের ব্যবধানে এ হার বেড়েছে দশমিক ৯০ শতাংশ।

বিবিএস প্রতি মাসে কৃষিশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, বিড়িশ্রমিক, জেলে, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিকসহ ৪৪ ধরনের পেশাজীবীর মজুরির তথ্য সংগ্রহ করে মজুরি বৃদ্ধির হারের সূচক তৈরি করে। এসব পেশাজীবী দৈনিক ভিত্তিতে মজুরি পান বা নগদ টাকার পরিবর্তে অন্য সহায়তা পান, তার ভিত্তিতে কোন মাসে মজুরি হার কত বাড়ল, তা প্রকাশ করে বিবিএস।

পরিসংখ্যান ব্যুরো যে ৪৪ ধরনের পেশাজীবীর মজুরির তথ্য নেয়, তার মধ্যে ২২টি শিল্প খাতের এবং ১১টি করে কৃষি ও সেবা খাতের। বেতনভোগী কিংবা উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের বিবিএসের মজুরি সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

সেপ্টেম্বরের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিবিএস বলছে, মজুরি হার হ্রাস-বৃদ্ধি পর্যালোচনায় কৃষি খাতের নিড়ানিশ্রমিক, শিল্প খাতে নির্মাণশ্রমিক ও চালের মিলে কর্মরত শ্রমিক, সেবা খাতের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ট্রাকে মাল ওঠানো-নামানোর কাজে নিয়োজিত সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছর সেপ্টেম্বরে সামান্য বেড়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশই হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। মোট শ্রমশক্তির ৮৫ দশমিক ১ শতাংশই এ খাতে নিয়োজিত। আর ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে।

নিম্নতম মজুরি বোর্ডের গেজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একটি খাত থেকে আরেকটি খাতের মজুরির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। কোনো কোনো খাতের মজুরি মাত্র ৩ হাজার টাকা, আবার কোনো কোনো খাতের মজুরি ১৬ হাজার টাকার বেশি। যেমন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা।

এর বাইরে রাবার শিল্প, পাটকল, বিড়ি, ম্যাচ শিল্প, জুট প্রেস, সিনেমা হল, হোসিয়ারি, কোল্ডস্টোরেজ, পেট্রলপাম্প, আয়ুর্বেদিক কারখানা, আয়রন ফাউন্ড্রি, ওয়েল মিলস অ্যান্ড ভেজিটেবল প্রোডাক্টস, লবণ শিল্প ইত্যাদি খাতের মজুরি সর্বশেষ নির্ধারণ করা হয়েছিল বহু বছর আগে। যেমন কোল্ডস্টোরেজ ও ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প খাতের শ্রমিকদের সর্বশেষ মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল ২০১২ সালে, ম্যাচ শিল্পের ২০১৩ সালে আর বিড়ি শিল্পের ২০১৬ সালে।

আবার পেট্রলপাম্পের শ্রমিকদের মজুরি বহু বছর আগে নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীকালে আর সমন্বয় করা হয়নি। তবে এ খাতে এখন শ্রমিকরা ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসে আয় করেন বলে জানা গেছে।

মাসখানেক আগে বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের আন্দোলনের পর তাদের নিম্নতম মজুরি পাওয়ার বিষয়টি সবার মনোযোগে এসেছে। অবশেষে সরকারের হস্তক্ষেপে দৈনিক মজুরি কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। অবশ্য শুধু চা-শ্রমিকরাই নন, নিম্নতম মজুরি পাচ্ছেন অন্য আরও কয়েকটি খাতের শ্রমিকরাও।

বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশা খাতের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে সরকারের একটি বিশেষ বোর্ড রয়েছে। এ বোর্ডের নিয়মিতভাবে মজুরি পর্যালোচনা করে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে পোশাক খাতসহ শিল্পের কয়েক খাতে মজুরি বাড়ানো হলেও অন্যসব খাতের শ্রমিকদের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। বিভিন্ন খাতের মজুরি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, খাতভেদে নিম্নতম মজুরিতে অনেক পার্থক্য রয়েছে। যেমন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নিম্নতম মজুরি ৩ হাজার ৭১০ টাকা হলেও নির্মাণ ও কাঠশিল্পে এটি ১৬ হাজার টাকার বেশি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত