সময়ের সদ্ব্যবহার

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২২, ১২:৪৬ এএম

প্রবাদে আছে, ‘সময় সে তো জীবন, সুতরাং তাকে হত্যা করো না।’ জ্ঞানীরা বলেন, সময় হলো তলোয়ার, যদি তুমি একে কেটে ফেলতে না পারো, তবে সে তোমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ধ্বংস করে দেবে।’ হ্যাঁ, সময় নামক অমূল্য সম্পদকে যদি মূল্যায়ন না করতে পারি, তবে সে আমাদের চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। আর যদি সময়ের মূল্যায়ন করতে পারি, তবে সময় আমাদের কয়েক জনমের সার্থকতা দান করবে।

সময়ের গুরুত্ব : মহান আল্লাহ কোরআনে কারিমে যা বলেছেন, সবগুলো কথাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পরও বিশেষ কিছু জায়গায় কসম খেয়ে কথা বলেছেন, বিষয়ের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। সময় এর অন্যতম। সময়ের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য সুরা আসর তেলাওয়াতই যথেষ্ট। সুরা আসরে বলা হয়েছে, ‘শপথ মহাকালের (আসর অর্থ কাল, সময়। যে কাল বা সময়ে মানুষ পাপ-পুণ্যের কাজ করে)। কসমের পর আল্লাহ বলছেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যারা ইমান আনে ও ভালো কাজ করে এবং একে অন্যকে সত্যের উপদেশ দেয় (নিজে সৎকাজ করে ও অন্যকে সৎকাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে) আর বিপদে-আপদে নিজে ধৈর্যধারণ করে ও অন্যকেও ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়, জনগণ কষ্ট দিলে ক্ষমার মাধ্যমে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং ভালো কাজের আদেশ ও মন্দকাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে গিয়ে যে বাধাবিঘ্ন ও বিপদের সম্মুখীন হয় তাতেও ধৈর্যধারণ করে, তারা এই সুস্পষ্ট ক্ষতি থেকে মুক্তি পাওয়ার সৌভাগ্যের অধিকারী।’ সুরা আসর : ১-৩

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, মানুষ যদি এই একটি মাত্র সুরা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এবং মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করে, তবে এই একটি সুরাই তার জীবনের জন্য যথেষ্ট। ইবনে কাসির মানুষে যেভাবে সময়কে হত্যা করে : অযথা সময় নষ্ট করার অর্থ নিজেকে ধীরগতিতে ক্ষতির পথে নিয়ে যাওয়া। একুশ শতকের এ সময় সময়কে হত্যা করার হাজারো মাধ্যম আমাদের সামনে বিদ্যমান। এর অন্যতম হলো

অনলাইনে সময় দেওয়া : ভার্চুয়াল এই জগতে একটা মানুষ যখন ঢোকে, তখন যদি সে তার নফসের সঙ্গে বোঝাপড়া না করে নেয় (মানে সে কোন কাজে অনলাইনে যাচ্ছে বা কতটুকু সময় সেখানে ব্যয় করবে) তবে সে মুহূর্তেই কয়েক ঘণ্টা সময়কে হত্যা করতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন মুভি, নাটক, কার্টুন, গান, গেমস, টিকটক, এমনকি পর্নোগ্রাফির মতো ভয়াবহ ক্ষতিকর জিনিসগুলো দেখেও অনেকে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে।

অতিরিক্ত ঘুমানো : এটাও খুবই মারাত্মক একটা কারণ। অতিরিক্ত ঘুমানোর ফলে শরীরে যে পরিমাণ অলসতা ভর করে, তাতে আপনার মূল্যবান সময় অনায়াসেই হারিয়ে ফেলবেন। একজন মুমিন হিসেবে আপনার রবের কাছে প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব কিন্তু আপনাকে দিতে হবে।

অবসর সময় : মানুষ তার অবসর সময়কে বিভিন্নভাবে নষ্ট করে। যেমন : গিবত, পরচর্চা, অপবাদ, আজেবাজে চিন্তা ছাড়াও অযথা ফেইসবুকিং, ইমো, টুইটার ও ইন্সট্রাগ্রামসহ বিভিন্ন সোশ্যাল সাইটে অন্য মানুষকে নিয়ে তাদের নামে গিবত ও অপপ্রচার চালিয়ে সময় নষ্ট করা।

গিবত ও অপবাদ সম্পর্কে কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনরা! তোমরা অনেক (মন্দ) ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। (এবং মানুষের) গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পেছনে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ সুরা হুজরাত : ১২

অন্যমনস্কতা : এটা এমন একটা রোগ, যা মানুষের বোধশক্তিকে নষ্ট করে দেয়। যার ফলে সে কোনো কাজের বিষয়ে সতর্ক থাকে না এবং সেই কাজের পরিণাম কী হবে তা নিয়ে ভাবে না। এ ব্যাপারে কোরআন বলছে, ‘তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে দেখে না। তাদের কান আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে শোনে না। এরা হলো পশুর মতো। বরং তারা আরও অধিক বিভ্রান্ত ও অচেতন।’ সুরা আল আরাফ : ১৭৯

ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা : আরেক দল মানুষ আছে, যারা কাজ না করে কাজের ফল পেতে চায়। আর অলসভাবে বসে বসে ভাবে তাদের ভবিষ্যতে কী হবে? অথচ মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের পরিবর্তন না করে।’ সুরা রাদ : ১১

গড়িমসি : কিছু মানুষের অভ্যাস হলো আজকের কাজ আগামীকালের জন্য রেখে দেওয়া, যা তাদের জীবনে ভয়াবহ ব্যর্থতা ডেকে আনে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের পূর্বে গনিমত হিসেবে গ্রহণ করো। ১. মৃত্যুর আগে জীবনকে, ২. ব্যস্ততার আগে অবসরকে, ৩. অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে, ৪. অভাবের আগে সচ্ছলতাকে ও ৫. বার্ধক্যের আগে যৌবনকে। মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ৭

সময়কে গালি দেওয়া : আরেক শ্রেণির লোক আছে, যারা সময়কে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, বিভিন্নভাবে সময়কে গালি দেয়। তারা ভাবে, সময় এখন তাদের অনুকূলে নয়। তারা সময়ের কাজ সময়ে না করে ভাবতে থাকে, সময় তাদের অনুকূলে এলে সফল হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়কে গালি দিতে নিষেধ করে বলেন, ‘তোমরা সময়কে গালি দিয়ো না। কেননা আল্লাহ নিজেই সময়ের পরিচালক।’ সহিহ মুসলিম : ৫৭০১

সময়ের মূল্যায়ন : সময়ের মূল্য দিতে হলে প্রথমে সময় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য, সময়ের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন। এজন্য বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন

প্রতিদিনের কাজের রুটিন : দিন-রাত প্রতিটি কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণের নাম রুটিন। ক্ষণিকের জীবনে মানুষকে অনেক কাজ করতে হয়। তাই সব কাজে সফলতা পেতে অবশ্যই রুটিন করে নিতে হবে। তবে রুটিন করতে গিয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। যে কাজ যে সময় করা উপযোগী, ওই কাজ তখনই করতে হবে।

যেসব কাজে উদ্যমতা ও সুস্থ-মস্তিষ্ক প্রয়োজন, সেসব কাজের সূচি এমন সময় রাখতে হবে, যখন মস্তিষ্ক সুস্থ, সবল ও ঠান্ডা থাকে। ওই সময়টি হলো সকাল। প্রভাতে মানুষের স্মৃতিশক্তি ও যোগ্যতা সজীবতায় আচ্ছন্ন থাকে। এ কারণে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার উম্মতের জন্য প্রভাতে বরকতদান করো।’ সুনানে তিরমিজি : ৩১৫৬

শরীরের হক আদায় : সুস্থতা মানব জীবনের বড় নেয়ামত। মন-মস্তিষ্কের সুস্থতা দেহের সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল। দেহ ও মন আমাদের কাছে খোদাপ্রদত্ত আমানত। এ আমানতের হক আদায় করতে হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যেমনি তোমার ওপর তোমার প্রভুর হক রয়েছে, তেমনি তোমার দেহ ও পরিবার-পরিজনের হকও তোমার ওপর রয়েছে। অতএব, প্রত্যেককে তাদের প্রাপ্য আদায় করে দাও।’ সহিহ বোখারি

কাজে ব্যস্ত থাকা : বর্তমানে যুবকদের সব থেকে বড় সমস্যা অলসতা ও অবসর। বলা হয় যৌবন, অবসর ও প্রাচুর্য এই তিনটি যখন একসঙ্গে হয়, তখন তা হয় খুবই ভয়ংকর। তাই কোনোভাবেই নিজেকে অলস করে বা অবসর করে রাখা যাবে না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কাজের রুটিনে চোখ বুলিয়ে কাজে লেগে যেতে হবে। আল্লাহতায়ালা সবাইকে সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত