অবৈধ বালু উত্তোলন

সমস্যাটি সারা দেশের, গুরুত্ব দিন

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৪ এএম

মানুষ যখন নদীকে অতিরিক্ত শোষণ কিংবা নদীর ওপর লোভের থাবা বিস্তার করে এর ফল ভালো হয় না। তাতে নদীর নিজস্ব প্রবাহ ও ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং এর ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জনজীবন ও প্রকৃতিতে। সম্প্রতি তেমনই ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জে। ২১ জুলাই দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি অতিবর্ষণে হবিগঞ্জের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর তীররক্ষা বাঁধের ২শ ফুট অংশ ভেঙে যায়। এর ফলে প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্ফীত করে তুলেছে। তলিয়ে গেছে কয়েকশ হেক্টর আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজির ক্ষেত। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়েন ৩০ গ্রামের ৩১ হাজার মানুষ। আমরা জানি, দেশে এই সমস্যাগ্রস্ত জেলা-উপজেলার সংখ্যা কম নয়।

দেশের অনেক নদ-নদীর বুকে পড়েছে ড্রেজারের কোপ। অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে দেশের বহু জনপদকেই ঠেলে দেওয়া হয়েছে বিপর্যয়ের মুখে, একই সঙ্গে নদীর বাঁধ নিপতিত অস্তিত্ব হুমকিতে। অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু নদীভাঙন সৃষ্টি করে জনপদই তলিয়ে নিচ্ছে না, মানুষের প্রাণও কেড়ে নিচ্ছে। গত বছর কক্সবাজার জেলার মাতামুহুরী নদীতীরের এমন মর্মান্তিক ঘটনাটি হয়তো অনেকেই বিস্মৃত হননি। নদীর বাস্তুতন্ত্র ও প্রবহমানতা নষ্ট হলে আরও যে গভীর ক্ষতিসাধিত হয়, এর নজির কম নেই। অভিঘাত লাগে পরিবেশেও এবং পরিবেশ মানুষের জন্য বৈরী হয়ে ওঠে। আমার জানি বৈধভাবে এবং নিয়মনীতি মেনে বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা সরকার দিয়ে থাকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মনীতির লঙ্ঘন করেন ইজারাদাররা। বৈধতার আড়ালেও চরম ক্ষতিকর কা-কীর্তি চলছে। বলবানরা আত্মঘাতী কর্মকা- অনেক ক্ষেত্রেই চালাচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায় এবং হবিগঞ্জের ঘটনাটি এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল কয়েকজন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, আইনের তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণেই বাঁধটি ভেঙেছে। দায়িত্বশীলরা যেহেতু জানেনই আইন-নিয়মনীতি অমান্য করে কতিপয় বলবান নিজেদের আখের গুছাচ্ছে তাহলে তারা নীরব কেন? কেন আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, এর জবাবদিহি তো তাদেরই করতে হবে।

ড্রেজার বা পাম্প দিয়ে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোন খুঁটির জোরে চলছে অপরিণামদর্শী কর্মকা- এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারেন না। আমরা দেখেছি, নদীর বাঁধ ভাঙার পর প্রশাসনের ঘুম ভাঙে, কিন্তু তাদের তরফে প্রতিকার-প্রতিবিধানের দৃষ্টান্ত দৃশ্যমান হয় না! দেশের বিশাল এলাকায় কৃষিব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এ নদীকে ঘিরেই। পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ তো আছেই। ফলে এ নদীর সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনকে তৎপর থাকতেই হবে। অবৈধভাবে ও অবাধে বালু তোলার কোনো সুযোগ বা অবকাশ নেই। বালুখেকো চক্রের মূলোৎপাটন করতেই হবে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, দেশের সব জলধারাই সমান গুরুত্বের। তারপরও কোনো কোনো জলধারা, বিশেষ কারণে অগ্রাধিকারের দাবি রাখে। ২০১০ সালের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে যেসব ক্ষেত্রে বালু বা মাটি তোলা নিষিদ্ধ করা হয় আমরা মনে করি, এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জলধারাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

যাদের দায়িত্ব আইনের প্রয়োগ ও প্রতিপালনের, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। শর্তানুযায়ী ইজারাকৃত নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া অন্য স্থান থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এই কর্মকা- বন্ধে অনতিবিলম্বে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদীর গঠন আর ভারসাম্যের জন্য বালু দরকার। বালুর ভা-ার অফুরন্ত নয়। বালুমহালের দখল নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনাও এর মধ্যে কম ঘটেনি। সব মিলিয়ে বালু নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক নৈরাজ্য। এই নৈরাজ্যর নিরসন করতেই হবে এবং সর্বত্র সমগুরুত্বে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা নদী হত্যা করে, নিপীড়ন-নির্যাতন করে তারা জনশত্রু। এদের কোনো ছাড় নয়।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত