আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে ৫৫০ কোটি ডলার ঋণ পাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলন শেষে গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এ তথ্য জানান। তিনি দাবি করেন, এই ঋণ পেতে কঠিন শর্ত পূরণ করতে হবে বলে অনেকেই যে সমালোচনা করছেন, তা ঠিক নয়।
গভর্নর বলেন, উন্নয়ন সহযোগীরা যেসব সংস্কারের কথা বলে তা সরকারের এজেন্ডাতেই আছে। নতুন করে আর কোনো সংকট না হলে নভেম্বর-ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ডলারের সংকট থাকবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন গভর্নর।
গত ১০ অক্টোবর থেকে শুরু হয় বিশ্বব্যাংক-আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছিল এবারের এ সভায়।
মূল অনুষ্ঠানের বাইরে সাইড লাইনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন গভর্নর।
পাঁচ দিনের কার্যক্রম নিয়ে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের কার্যালয়ে বিকল্প নির্বাহী পরিচালকের বাংলাদেশ অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ডেভেলপমেন্ট ক্রেডিট পলিসি থেকে চলমান বাজেট সহায়তার দ্বিতীয় কিস্তির ২৫ কোটি ডলার নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গ্রিন রেজিলেন্ট অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট (গ্রিড) ফান্ডের ৭৫ কোটি ডলারসহ মোট ১০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে বিশ^ব্যাংক-আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ) ট্রাস্ট থেকেও আমরা ঋণ চেয়েছি। আইএমএফের ঋণের নিয়ম হলো তাদের কাছ থেকে ঋণ নিলে এক্সটেনডেট ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ) এবং এক্সটেনডেট ফান্ড ফ্যাসিলিটিজ (ইএফএফ) থেকেও ঋণ নিতে হয়। ইসিএফ ও ইএফএফের একটা যোগসূত্র আছে। সেই কোটা থেকে ৭৫০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে আমরা এই তহবিল থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করে আলোচনা করছি।’
বিশ্বজুড়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আশার কথা জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। তিনি বলেন, ‘প্রকল্প সহায়তার অর্থ ধীরে ধীরে আসে আর টাকা পাওয়া যায় একসঙ্গে। আমরা মনে করি এসব অর্থ পেলে ডলারের যে সংকট আছে, সেটা কেটে যাবে এবং একটা বাফার তৈরি হবে।’
গভর্নর বলেন, ‘আমাদের দেশের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন আমরা কিন্তু কারেন্ট অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্সে চলে এসেছি। গত তিন মাসে আমাদের রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কিন্তু আমদানির সমান হয়ে গেছে। আমাদের এখন পেমেন্ট বেশি হওয়ার কারণ আগে অনেক ঋণপত্র খোলা হয়েছে। এলসিগুলো ম্যাচিউরড হয়ে গেলে নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ আমাদের আর কোনো সংকট থাকবে না আশা করছি।’
তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ না হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।
এদিকে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে সফরকারী বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল ও আইএমএফের কর্মকর্তাদের মধ্যে আয়োজিত বেশ কয়েকটি বৈঠকে বাংলাদেশের ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
আব্দুর রউফ তালুকদারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আন্তোয়েনেট এম সায়েহ ও আইএমএফ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের সঙ্গে বৈঠক করে।
বৈঠক সূত্র জানায়, এসব ঋণ পেতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার করার অনুরোধ জানিয়েছে আইএমএফ। রাজস্ব বাড়াতে আইএমএফ ভ্যাট অবকাঠামোর সরলীকরণ, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও বড় করদাতাদের কাছ থেকে ঠিকমতো কর আদায় করতে না পারার ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থাপনার মতো লক্ষ্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। ব্যাংকিং খাতে উচ্চমাত্রার ‘নন-পারফর্মিং ঋণ’ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এ সমস্যা অনেকটাই প্রকট। আইএমএফ এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু উদ্যোগের সুপারিশ করেছে।
আইএমএফ যেসব সংস্কার কার্যক্রমকে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করেছে সেগুলো হলো করপোরেট সুশাসন জোরদার করা, বর্তমান অবকাঠামোর ওপর তদারকি আরও কঠোর ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা, ঋণদাতাদের অধিকার প্রয়োগের জন্য আরও বলিষ্ঠ সহযোগিতা ও ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের জন্য প্রণোদনা নিশ্চিতের জন্য আইনি ব্যবস্থার যথোপযুক্ত সংস্কার।
গত জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম আলোচনা।
এই ঋণ পেতে হলে বাংলাদেশকে আগামী তিন বছরে কী কী উদ্যোগ নিতে হবে, সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এ মাসে আইএমএফের একটি দল ঢাকা সফরে এলে বিস্তারিত আলোচনার পর ঋণের শর্তগুলো চূড়ান্ত হবে বলে বৈঠকে অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি কর্মকর্তা জানান।
