খুলনায় মির্জা ফখরুল

তত্ত্বাবধায়কের অধীনে তারা ১০ আসনও পাবে না

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২২, ০৬:২৩ এএম

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমাদের সামনে আন্দোলন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এই ফ্যাসিবাদী, কর্তৃত্ববাদী, একনায়কত্ববাদী শেখ হাসিনার সরকারকে পরাজিত করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ সংসদ বিলুপ্ত করে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ দেশে এই সরকারের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। কারণ এই সরকার জানে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাদের কোনো চিহ্ন থাকবে না, তারা ১০টা আসনও পাবে না।’ গতকাল শনিবার বিকেলে খুলনা মহানগরীর ডাকবাংলো মোড়ের সোনালী ব্যাংক চত্বরে আয়োজিত দলের খুলনা বিভাগীয় গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, চাল, ডাল, জ¦ালানি তেল, গ্যাস-বিদ্যুৎ, সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমানো, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধ, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও শিক্ষা খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম বন্ধ, দুর্নীতির রাহুগ্রাসে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতের হরিলুট বন্ধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, সাংবাদিকসহ সাধারণ নাগরিকদের মামলায় হয়রানি বন্ধ, ব্যাংকিং খাতে লুটপাট, বিদেশে টাকা পাচার, শেয়ারবাজারের লুটপাটের অর্থ উদ্ধার, কৃষক, শ্রমিক, নিম্নবিত্ত মানুষের ন্যায্য দাবি আদায় এবং স্বৈরাচারের গুলিতে শহীদ নূরে আলম, শাওন প্রধান, শহিদুল ইসলাম শাওন এবং আব্দুল আলিমের রক্তের ঋণ শোধের প্রত্যয়ে খুলনায় বিভাগীয় গণসমাবেশের ডাক দেয় বিএনপি।

গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা। বক্তব্য দেওয়ার মাঝপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি চেয়ারে বসে বক্তব্য দেন।

শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসেন নাই। সংসদ বিলুপ্ত করুন। সংসদ বিলুপ্ত করে আপনারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিন। কারণ এই দেশে আপনাদের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে না। সেই কারণে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থাই জনগণ মেনে নেবে না।’

আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল। বেগম খালেদা জিয়া দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে সংবিধিবদ্ধ করেছিলেন। আজকে নিজেদের স্বার্থে বিচার বিভাগকে দিয়ে, বিচারপতি খায়রুল হককে দিয়ে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন। পরিণতিতে কী হয়েছে, চিরস্থায়ীভাবে যে ব্যবস্থা হয়েছিল সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য; সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, নিরপেক্ষ বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করেছে, শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। প্রতিটি বিশ^বিদ্যালয়কে ছাত্রলীগের আখড়ায় পরিণত করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগকে ধ্বংস করেছে। মানুষ সেখানে কোনো সেবা পায় না। সমাজ এখন পুরোপুরিভাবে ভয়াবহ এই সব লোভী, লুটেরা এবং হরণকারীদের খপ্পরে পড়েছে।

খুলনার জনগণকে ‘বীর খুলনাবাসী’ আখ্যায়িত করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘তিন দিন ধরে জলে অন্তরিক্ষে সব পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছিল। শুধু বাসই বন্ধ করেনি, কিছুই চলতে দেয়নি। লঞ্চ বন্ধ করেছে, নৌকা বন্ধ করেছে, খেয়াঘাট বন্ধ করেছে। যানবাহন বন্ধ করে দিয়ে আপনাদের গণতন্ত্রের যে আকাক্সক্ষা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার যে লড়াই, সেই লড়াইকে আজ কি বাধা দিতে পেরেছে? পারেনি বন্ধুগণ। পারে না। ইতিহাস বলে, যেকোনো দিন জনগণের ন্যায়সংগত দাবি তাকে উপেক্ষা করে মানুষকে দমিয়ে রাখা যায় না।’

মির্জা ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, ‘গত তিন দিনে পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাজারো নেতাকর্মীকে আহত করা হয়েছে। চুকনগরে বিএনপির নেতাকর্মীদের গুলি করা হয়েছে, কেশবপুরে ১৫ জন গুলিবিদ্ধ, মোংলা থেকে আসার সময় কয়েকজন নেতাকর্মীকে আহত করা হয়েছে। রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়ার ১০০ নেতাকর্মীকে আহত করা হয়েছে। খালিশপুর, দৌলতপুর, খানজাহান আলী থানার নেতাকর্মীদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। বাগেরহাটে ৭০ জনের মতো নেতাকর্মীকে আহত করা হয়েছে, ৫০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৬ নম্বর, ৭ নম্বর ঘাটে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে, খুলনা রেলস্টেশনে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। গাজীরহাটে একজন কর্মী পানিতে ডুবে গেছে এখনো তাকে পাওয়া যায়নি। রূপসা ঘাটে হামলা হয়েছে, জেলখানা ঘাটে হামলা হয়েছে।’

এই সরকার দেশকে নরকে পরিণত করেছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। শেয়ারবাজার থেকে অর্থ লুট করেছে। মেগা প্রজেক্ট করে অর্থ লুট করেছে। বিদ্যুতের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। তারা দেশের কোনো কাজই করেনি। তারা শুধু লুটপাট করেছে। ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। তখন দেশে ছিল আওয়ামী লীগের সরকার। তখন অমর্ত্য সেন বই লিখেছিলেন। আবারও সেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এখন আবার সেই দুর্ভিক্ষের কথা শোনা যাচ্ছে।’

তরুণ-যুবকদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা ভবিষ্যতে যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাই, তরুণ, যুবকদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করব।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দুই-তিন দিন ধরে সরকার ভীত হয়ে খুলনা বিভাগকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। সব পথ বন্ধ করেছে। নেতাকর্মীদের মেরেছে। দুদিন হরতাল না করলে সমাবেশে আরও দুগুণ বেশি মানুষ হতো। খুলনা অবরুদ্ধ হয়ে যেত।

সমাবেশে বক্তৃতা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, নিতাই রায় চৌধুরী, আব্দুল আওয়াল মিন্টু, মশিউর রহমান, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কামরুজ্জামান রতন, রকিবুল ইসলাম বকুল, ড. ওবায়দুল ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, জয়ন্ত কুমার কু ন্ডু, কৃষিবিদ শামিমুর রহমান, অমলেন্দু দাস অপু, নৈওয়াজ হালিমা আরলি, আমিরুল ইসলাম খান শিমুল, সাদেক খান, এস এম জিলানী, শহীদুল ইসলাম বাবুল, অধ্যক্ষ নার্গিস বেগম, ফজলুর রহমান খোকন, ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত