ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত উঠায় সোমবার (২৪ অক্টোবর) দুপুর থেকে উপকুলীয় এলাকা থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. জাহিদ ইকবাল।
তিনি জানান, দুর্যোগের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জেলায় ৫৭৬টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেখানে ৬ লাখ ৫ হাজার ২৭৫ জন মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে খোলা হয়েছে ৯টি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১০৪টি মেডিকেল টিম।
এছাড়াও মজুদ আছে ৩২৩ মেট্র্রিক টন চাল, ৮ লাখ ২৫ হাজার নগদ টাকা ও এক হাজার ১৯৮ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৩৫০ কার্টুন ড্রাই কেক, ৪০০ কার্টুন ডাইজেস্টিভ বিস্কুট। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ঝড়ের পূর্বেই মানুষকে নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রত্যেক ইউনিয়নে মেডিকেল টিম প্রস্তুতকরণ, পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও খাওয়ার পানি মজুদ রাখা, দুর্যোগকালীন ও ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাধ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে যেকোন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক দল, কোস্টগার্ড সদস্য, নৌপুলিশ সদস্য, ২ হাজার ২০০ জন রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং ৮ হাজার ৬০০ জন সিপিপি সদস্য প্রস্তুত রয়েছে। সাইক্লোন সেন্টারে সম্ভাব্য আশ্রয় গ্রহীতাদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারী, পুরুষ, গর্ভবতী নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে সকাল থেকে কক্সবাজারের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আমাবস্যার কারণে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি দুই থেকে তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় পর্যটকদের নিরাপদ দূরত্বে থেকে সৈকত ভ্রমণের জন্য সতর্ক করছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ, লাইফ গার্ড ও বীচ কর্মীরা। সৈকতে পর্যটকদের গোসল করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, আজ সকাল ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৯০ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৩৫ কিমি দক্ষিণপশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫২৫ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিমি দক্ষিণ দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিল ‘সিত্রাং’। এটি আরও ঘনীভূত ও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে আগামীকাল ভোর থেকে সকাল নাগাদ খেপুপাড়ার কাছ দিয়ে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
অধিদপ্তর বলছে, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর বিক্ষুদ্ধ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে নিরাপদে চলে আসতে বলা হয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের সাথে পর্যটকবাহী জাহাজসহ নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পর্যটন সেল মো আবু সুফিয়ান জানান, সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। একইভাবে পর্যটকদের বুকিং মানি ফেরত দেওয়ার জন্য হোটেল ও জাহাজ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে পাঁচ লক্ষাধিক লোকের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারি সব কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিলের পাশাপাশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ৯ উপজেলায় খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।
