ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো জ্বালানি সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানিতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশকে জরুরি সহায়তা দিতে চীন প্রস্তুত থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। এ ছাড়া বাংলাদেশে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আগ্রহী বলে স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চায় তার দেশ। গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এসব কথা বলেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত। রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক ভালো এবং বাংলাদেশে চীনের কোনো ঋণের ফাঁদ নেই। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের কোথাও চীনা ঋণের কোনো ফাঁদ নেই। শ্রীলঙ্কার মোট বৈদেশিক ঋণের ১০ ভাগেরও কম চীনা ঋণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা, বিদেশি ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ চীনের ঋণ। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক ভালো। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের মাত্রাও অনেক কম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৩৬ শতাংশ, যা অন্য অনেক দেশের থেকে কম। এমনকি উন্নত দেশগুলোর চেয়েও। যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ ৩১ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ তাদের জিডিপি মাত্র ২৪ ট্রিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের মতো জাপান এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের ক্ষেত্রেও চিত্র এরকম।
বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট চরমে পৌঁছলে চীন বসে থাকবে না : ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো জ্বালানি সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানিতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশকে জরুরি সহায়তা দিতে চীন প্রস্তুত থাকবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। তিনি বলেন, চীন সাধারণত জ্বালানি আমদানি করে। ফলে চীনের পক্ষে রপ্তানি করার মতো পরিস্থিতি নেই। তবে বাংলাদেশ যদি খুব সমস্যায় পড়ে তাহলে চীন চুপ করে বসে থাকবে না। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।
লি জিমিং বলেন, বাংলাদেশকে ক্লিন এনার্জি খাতে সহযোগিতা করতে আগ্রহী আমাদের দেশ। কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লিন এনার্জির লক্ষ্যে সোলার প্যানেল প্রতিষ্ঠায় চীনের কোম্পানি বিনিয়োগ করতে চায়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জ্বালানিতে সহযোগিতার বিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছে। আমি বিষয়টি পেইচিংয়ের সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি। চীন এলএনজি ও ক্রুড ওয়েল আমদানিনির্ভর দেশ। কোনো ধরনের এলএনজি বা জ্বালানি রপ্তানি করে না। তবে বাংলাদেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকটে আমরা জরুরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোলার প্যানেল উৎপাদন করে চীন। কারখানা, পোস্ট অফিস, বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লিন এনার্জির লক্ষ্যে সোলার প্যানেল স্থাপনে সহায়তা করবে চীন।
চীন বাংলাদেশকে স্থিতিশীল দেখতে চায় : বাংলাদেশে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আগ্রহী চীন। ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, এ কারণে স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চায় চীন। বাংলাদেশের যেকোনো অভ্যন্তরীণ ইস্যু শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান হবে, সেটাই আমরা দেখতে চাই। চীন ও বাংলাদেশ একে অন্যের ভালো প্রতিবেশী। দুই দেশই একে অন্যের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার। বাংলাদেশ ও চীন সবসময় নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাসংক্রান্ত মৌলিক স্বার্থের বিষয়ে একে অন্যকে বুঝেছে এবং সমর্থন করেছে।
তিনি বলেন, চীনের বাজারে ৯৮ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্য শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে। আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতা আরও বাড়বে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাশ্রয়ে বাংলাদেশ ও চীন নিজ নিজ মুদ্রায় বাণিজ্যের দিকে যেতে পারে। দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নিয়ে কাজ করতে পারে।
রোহিঙ্গাদের ফেরাতে কাজ করছে চীন : রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান লি জিমিং। তিনি বলেন, আমরা নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চাই। মিয়ানমার ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তারা এখন সীমান্তের সংঘাত নিয়ে টেনশনে আছে। তারা বলেছে, সেটা নিরসন হলেই প্রত্যাবাসন শুরু সম্ভব হবে।
ডলার সাশ্রয়ে বাণিজ্যে চীনা মুদ্রা ব্যবহারের পরামর্শ : বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে। এ সমস্যা সমাধানে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনা মুদ্রা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন চীনের রাষ্ট্রদূত। লি জিমিং বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাশ্রয়ে বাংলাদেশ চাইলে ডলারের পরিবর্তে চীনের মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন করতে পারে।
মুসলিমদের নিয়ে চীনের কোনো নেতিবাচক ধারণা নেই : তাইওয়ান প্রশ্নে লি জিমিং বলেন, আশা করি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ অব্যাহতভাবে ‘এক চীন মতাদর্শ’ মেনে চলবে। চীনের আইনসম্মত ও ন্যায্য অবস্থান বাংলাদেশ বুঝবে ও সমর্থন করবে। এক চীন নীতির প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার ও তাইওয়ানের স্বাধীনতার প্রতি বাংলাদেশের বিরোধিতায় আমরা বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ। আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি রক্ষায় চীন ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করবে।
মুসলিমদের নিয়ে চীনের কোনো ধরনের নেতিবাচক অবস্থান নেই উল্লেখ করে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে পশ্চিমা ও তাদের মিডিয়াগুলো অপপ্রচার চালাচ্ছে। চীনের উইঘুরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক কারণে চীনে কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
বে অব বেঙ্গল অঞ্চলে আমরা কোনো সংঘাত চাই না বলেও মন্তব্যে করেন লি জিমিং। তিনি বলেন, চীন ভারতের কৌশলগত প্রতিযোগী নয়। আমরা একযোগে উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিকভাবে একে অন্যকে সহযোগিতা করতে চাই। আমি নিজেও ভারতের বিগ ফ্যান। ভারতে আমার অনেক বন্ধু রয়েছে।
সিত্রাংয়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
অনুষ্ঠানে ডিক্যাব সভাপতি রেজাউল করিম লোটাস, সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মঈন উদ্দিন বক্তব্য রাখেন।
