উত্তরাঞ্চলে শীত শুরু মধ্যাঞ্চলে নভেম্বরে

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ০২:০১ এএম

‘ঢাকা শহরে ভোরের দিকে কুয়াশার মতো যা দেখি তা কুয়াশা নয়, এগুলো ধোঁয়াশা। কুয়াশা দেখা দিতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।’ শীতের আগমন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক এমনই কথা বলেন। তবে দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের আগমনী বার্তা শুরু হয়েছে, ঢাকাসহ দেশের মধ্যাঞ্চলে আগামী মাসের মাঝামাঝিতে এবং দক্ষিণাঞ্চলে আগামী মাসের শেষ কিংবা ডিসেম্বরের প্রথমে শুরু হতে পারে বলে আবহাওয়াবিদদের ধারণা।

আবহাওয়াবিদদের ধারণার সঙ্গে রেকর্ডকৃত উপাত্ত মিলিয়ে দেখা যায়, গতকাল শনিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (১৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রেকর্ড হয়েছে রংপুরে। এর আগে বৃহস্পতিবারও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (১৭ দশমিক ৪) রেকর্ড হয়েছিল তেঁতুলিয়ায়। রংপুর কিংবা তেঁতুলিয়া নয়, উত্তরাঞ্চলে সবকটি আবহাওয়া স্টেশনে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রেকর্ড হচ্ছে। অপরদিকে দেশের মধ্যাঞ্চল কিংবা দক্ষিণাঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি রেকর্ড হচ্ছে। গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে কুমিল্লায় ৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বৃহস্পতিবার খুলনায় ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। অর্থাৎ উত্তরাঞ্চলের তুলনায় মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি রয়েছে। এদিকে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীতের আবহ শুরু হয়ে গেছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখন ঢাকা শহরের বাইরে শরীয়তপুরে অবস্থান করছি। সেখানে শীতের কিছুটা আমেজ থাকলেও ঢাকা শহরে পাইনি। ঢাকায় এই আবহ পেতে আগামী মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত লাগতে পারে।’

উত্তরবঙ্গে শুরু ও ঢাকায় দেরিতে কেন? : ভৌগোলিক কারণে উত্তরবঙ্গে শীত আগে পড়ে জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিমালয় থেকে সবার আগে বাতাস প্রবেশ করে উত্তরবঙ্গ দিয়ে। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে মধ্যবঙ্গ হয়ে দেশের দক্ষিণ প্রান্তে প্রবাহিত হয়। আর তাই উত্তরবঙ্গে সবার আগে ও দেশের অন্যান্য এলাকায় ধীরে ধীরে শীত ছড়িয়ে পড়ে।’

একই মন্তব্য করেন অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ^বিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সের অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিমালয় থেকে আসা বায়ু শীতল হয়ে থাকে। আর এই বাতাসের কারণে দেশে শীতের আগমন ঘটে। মৌসুমি বায়ু বিদায় নিলে শীতের এই বাতাস প্রবেশ করে থাকে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং প্রভাব শেষ হয়ে যাওয়ার পর শীতের আগমন শুরু হয়েছে।’

ড. আশরাফ আরও বলেন, সবার শেষে শীত অনুভব হবে দেশের দক্ষিণবঙ্গে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায়। সাগরের কারণে ওই এলাকায় তাপমাত্রা বেশি থাকে। তাই শীতল বাতাস ওই এলাকায় যেতে একটু সময় নেয়।

এদিকে মৌসুমি বায়ু কবে বিদায় নিয়েছে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ১৫ অক্টোবর দেশের উত্তরবঙ্গ থেকে, ঢাকা থেকে ১৭ অক্টোবর ও টেকনাফ থেকে ২০ অক্টোবর বিদায় নিয়েছে। এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদরা জানান, দেশের টেকনাফ অঞ্চল দিয়ে সাগর থেকে জলীয় বাষ্প নিয়ে মৌসুমি বায়ু প্রবেশের পর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৃষ্টি শুরু হয়। একইভাবে অক্টোবরে এই বাতাস ফেরত চলে যাওয়ার পর হিমালয় থেকে শীতল বাতাস উত্তরবঙ্গ দিয়ে দেশে প্রবেশ করে এবং শীত শুরু হয়।

কুয়াশা ও ধোঁয়াশা কী? : বর্তমান সময়ে ঢাকার আকাশে দেখা যাওয়া কুয়াশার মতো যা দেখা যায় সেগুলো কুয়াশা নয় বলে মন্তব্য করেন আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধূলিকণাগুলোই হলো ধোঁয়াশা। এগুলো বেশি ভারী হওয়ায় উপরে উঠতে না পেরে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ভাসছে।’ অপরদিকে কুয়াশা হলো ভাসমান জলীয় বাষ্প। এই জলীয় বাষ্প তুলনামূলকভাবে কম ভারী হওয়ায় তা ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুম-লের মধ্যে ভাসমান থাকে। যা দেখতে ঝাপসা লাগে। ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গসহ শহরের বাইরে গ্রামীণ এলাকায় তা দেখা যাচ্ছে।

ঢাকা শহরকে হিট চেম্বার উল্লেখ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘এখানকার ভবনগুলো তাপমাত্রা ধরে রাখে। তাই এখানকার বাতাস এমনিতেই গরম থাকে। ইট-পাথরের কারণে ঢাকা শহর এখন হিট চেম্বার। এখানে অন্য এলাকা থেকে গড়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেশি থাকবে। তাই শহরে শীত অনুভূত না হলেও গ্রামে ঠিকই শীত অনুভব হচ্ছে।’

উল্লেখ্য, মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার পর শীত শুরু হয়ে থাকে। এবার মৌসুমি বায়ু বিদায়ের সময় ঘূর্ণিঝড় হওয়ায় দ্রুত শীত মৌসুম সক্রিয় হচ্ছে। তবে পুরোপুরি শীত শুরু হতে আগামী মাসের শেষ নাগাদ পর্যন্ত সময় লাগবে। শীতের সময়ে কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত