‘রাজনৈতিক’ জনভোগান্তি

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ০২:১৭ এএম

রংপুর নগরীর কামারপাড়া ঢাকা বাসস্ট্যান্ডে সকাল থেকে অপেক্ষা করছিলেন মনিরুল ইসলাম, উদ্দেশ্য ঢাকা যাবেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাস মিলল না। মনির বলেন, ‘আমি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। পারিবারিক কাজ থাকায় বাড়িতে এসেছিলাম। আজকে ছুটি শেষ। সকালে অটোরিকশায় করে বাসস্ট্যান্ডে এসেছি, দেখি বাস বন্ধ। বাসের কেউ নেই। এর আগে রেলস্টেশন গিয়েছিলাম সেখানে যাত্রীর চাপে পা ফেলার জায়গা নেই। তাই আবার স্ট্যান্ডে এসেছি যদি বাস পাওয়া যায়। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও বাসের দেখা পাইনি।’

এ ঘটনা গতকাল শনিবারের। এদিন রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ কর্মসূচি ছিল। বাস বন্ধের ঘোষণা এসেছে তারও আগে। মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধসহ কয়েকটি দাবিতে রংপুর জেলা বাস মালিক সমিতি গত শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ ধর্মঘট ডাকে। শুক্রবার রাজশাহী থেকে বিআরটিসি বাস চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই ধর্মঘটের কারণে মনিরের মতো ভোগান্তিতে পড়েন নগরীর বাসিন্দা জুবায়ের সজল। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য ঢাকা যেতে হবে। একটি বেসরকারি মেডিকেলে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ছিল শনিবার সন্ধ্যায়। কিন্তু স্ট্যান্ডে এসে দেখি বাস বন্ধ। খুব বিপদে পড়ে গেছি। ঢাকা তো আর কাছে নয় যে হেঁটে বা রিকশায় করে যাব।’

শুধু রংপুর বিভাগীয় শহরের মনির বা সজল নন, বিভাগের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও জেলার সাধারণ যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়েন। বাস ধর্মঘটের কারণে ছোট যানবাহনের ওপর চাপ যেমন বেড়েছে, সঙ্গে ভাড়া বেড়ে হয়েছে দুই থেকে তিন গুণ।

ধর্মঘট থাকায় নীলফামারী ও লালমনিরহাট থেকেও বাস চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে পথে পথে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

লালমনিরহাট শহরের পুরানবাজার এলাকার ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তাকে শুক্রবার ট্রেনে রংপুরে যেতে হয়েছে। ট্রেনের বগির মধ্যে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা ছিল না। ট্রেনে এত যাত্রী চলাচল করেছে যে, বলে শেষ করা যাবে না। আর রংপুর থেকে ফেরার পথে যথাসময়ে স্টেশনে আসতে না পারায় ট্রেন মিস করেছেন। পরে অনেক কষ্টে ভেঙে ভেঙে বাড়তি খরচে অটোরিকশায় করে এসেছেন।

একই অবস্থায় পড়তে হয়েছে হিলি-দিনাজপুর রোডের যাত্রীদের। এই রুটের বাসচালক জুয়েল ইসলাম বলেন, ‘মালিক সমিতির নির্দেশের কারণে আজকে (শনিবার) দ্বিতীয় দিনের মতো আমাদের বাস বন্ধ রয়েছে। এতে করে আমাদের আর্থিকভাবে সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। দুদিন যে বাস বন্ধ খোরাকি নেই, আমাদের তো আর কেউ খরচ দিচ্ছে না। মালিক দিচ্ছে না, সরকারি দল বা বিরোধী দল খরচ দিচ্ছে না। যে কারণে সমস্যার মধ্যে আমাদেরই পড়তে হচ্ছে।’

এদিকে বগুড়া থেকে রংপুর বিভাগের ১০টি রুটে বাস চলাচল গতকাল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। রাজশাহী থেকে রংপুরগামী বাস চলাচল দুই দিন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ময়মনসিংহে বিএনপির সমাবেশের আগে বাস ধর্মঘট ডাকা হয়। একই অবস্থা ছিল খুলনায়ও। কর্মসূচির দুই দিন আগে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়েছিল। এসময় সড়ক ও নৌপথে একসঙ্গে ধর্মঘট পালন হয়। ওই সময় চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাও ছিল। চট্টগ্রাম সমাবেশের সময় বাস চলাচল করলেও পথে পথে বাধা দেওয়া হয় বলে দলটির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছিলেন।

আগে থেকেই বরিশালে বিএনপির সমাবেশের দিন ৫ নভেম্বর ও আগের দিন ৪ নভেম্বর অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বাস মালিকদের সংগঠন বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপ। তারাও কারণ হিসেবে মহাসড়কে তিন চাকার অবৈধ যান ও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল বন্ধের দাবির কথা বলেছেন।

যা বললেন পরিবহন নেতারা : ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি মন্তব্য করছেন পরিবহন নেতারা। ধর্মঘট ডাকা পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে এ ধর্মঘট ডাকা হয়নি। মহাসড়কে নসিমন, করিমন ও থ্রি-হুইলারসহ অবৈধ যান চলাচলের প্রতিবাদে এ ধর্মঘট। এর সঙ্গে বিএনপির গণসমাবেশের কোনো সম্পর্ক নেই।

অন্যদিকে বিএনপিপন্থি পরিবহন নেতারা বলছেন, মালিক ও শ্রমিকের নাম দিয়ে ধর্মঘটের কথা বলা হলেও এর সঙ্গে সরকারই সম্পৃক্ত। মূলত বিএনপির সমাবেশ বানচাল করতে এই আয়োজন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস গত শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনার মতো রংপুরে জোরপূর্বক পরিবহন ধর্মঘট মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে নয়। আওয়ামী লীগ সরকার ও প্রশাসন চাপ দিয়ে মালিকদের নামে এটা করাচ্ছে। গণবিরোধী সরকার চক্রান্তমূলকভাবে গণপরিবহনের মালিকদের জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে।’

নিজেদের নিরাপত্তা ও দাবিদাওয়া আদায়ে মূলত বাস ধর্মঘট চলছে বলে জানান ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বাসমালিকরা খুব আতঙ্কে রয়েছেন। এর আগে বিএনপি হরতালের নামে জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি পালন করেছে। সেসময় সারা দেশে ৫ হাজারের মতো পরিবহন নষ্ট করেছে। প্রায় ৭২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছে। এর দায় তো কেউ নেয়নি। এখন বিএনপি আবার দেশজুড়ে সভাসমাবেশ করছে। এখন মালিকরা আতঙ্কে রয়েছেন। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, তাই তারা বাস বন্ধ রেখেছেন। তবে এর সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য : গতকাল আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করবে আমরা সেটাই চাই। তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ বাধাও দিচ্ছে না। পরিবহন বন্ধ করার পক্ষেও আমরা নই। পরিবহন বন্ধ কারা করছে, কেন করছে সেটা বিএনপিই জানে।’

এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচি চলার সময় জ্বালাও-পোড়াওয়ের কারণে এখন বাসমালিকরা আতঙ্কে থাকেন। তাই তারা বাস চালাতে চান না। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদও।

যাত্রী ভোগান্তি নিয়ে বিশ্লেষকদের বক্তব্য : বিরোধী দলের সমাবেশ সামনে রেখে এ রকম পরিবহন ধর্মঘট-অবরোধ নতুন নয় বলে মন্তব্য করেছেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও যাত্রী কল্যাণে কাজ করা ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, বিএনপির আমলেও এ ধরনের কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে। কিন্তু এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ। সাধারণ জনগণের কথা মাথায় রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর আরও বেশি সহনশীল হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিহিংসার রাজনীতির জন্য এভাবে বাস বন্ধ করে ধর্মঘট দেওয়ায় যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয়। দেশের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে বাস বন্ধ করে। তাই যারা ধর্মঘট দেয় তাদের বলব, এগুলো পরিহার করতে। সেই সঙ্গে সরকারেরও উচিত কেউ যেন যোগাযোগব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেদিকে নজর দেওয়া।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সভা-সমাবেশকে কেন্দ্র করে এ ধরনের বিষয় নতুন নয়। এটা বহু দিনের পুরনো সংস্কৃতি। কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ‘দিন বদলের সনদ’ নামে একটা ইশতেহার দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনা হবে। কিন্তু ২০২২ সালে এসে তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমরা আশা করেছিলাম, এই সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। এখন যেটা করা হচ্ছে, সেটা আমাদের সংবিধানের ৩৭ ধারা অনুযায়ী সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই অধিকার কেউ লঙ্ঘন করতে পারে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত