রাজধানীর ধানমন্ডি লেকপাড়ে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদত হোসেন মজুমদারকে (৫১) খুনের পর ছিনিয়ে নেওয়া মোবাইল ফোনটি ইয়াবার বিনিময়ে বিক্রি করে ছিনতাইকারীরা। ঘটনার রাতেই সেই ইয়াবা সেবন করে তারা। শাহাদতের হাতে দামি ফোন দেখেই মূলত তাকে টার্গট করে পাঁচ সদস্যের ছিনতাইকারী দল। দলের সদস্যরা হলো রাব্বি, রাসেল, হৃদয়, সজীব ও সোহেল। তারা গভীর রাতে লেক এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে রবীন্দ্র সরোবরের পাশে সুযোগমতো ঘিরে ধরে শাহাদতকে, ফোন মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় শাহাদতের।
ছিনতাই দলে থাকা রাব্বিকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে শাহাদতের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোনটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
ধানমন্ডি থানার ওসি মো. ইকরাম আলী মিয়া গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে জানান, গত সোমবার রাতে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর জাওলাহাটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাব্বিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। গতকাল তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে সে ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেয়। এ চক্রের অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।
তদন্ত সূত্র বলছে, রাব্বিসহ ছিনতাইকারী পুরো দলটির সবাই অল্প বয়স্ক। এর আগেও বিভিন্ন অপরাধ করলেও কিশোর হিসেবে মাফ পেয়ে গেছে। রাব্বি এর আগে সাতবার পুলিশের হাতে বিভিন্ন অভিযোগে আটক হয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা মামলা না করায় সে থানা থেকেই ছাড়া পেয়েছে।
গত ২২ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর কলাবাগানের ১৯/নর্থ সার্কুলার রোড (চতুর্থ তলা) বাসা থেকে জগিংয়ের উদ্দেশ্যে বের হন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদত হোসেন। পরে রাত আড়াইটার দিকে ধানম-ি লেকের রবীন্দ্র সরোবর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে চাকুর তিনটি জখম ছিল। এ ঘটনার পরদিন শাহাদতের স্ত্রীর বড় ভাই শফিউল আজম চৌধুরী বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয়ের ছিনতাইকারীদের আসামি করা হয়।
নাম প্রকাশ না করে ধানমন্ডি লেক এলাকার এক দোকান মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীরা ধানমন্ডি লেক এলাকায় সবার সঙ্গে বেপরোয়া আচরণ করে। সন্ধ্যার পর তারা জোট বেঁধে নেশা করে। লেকের তিনটি স্থানে মাদক বেচাবিক্রি হয়। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। মাঝেমধ্যে তারা জোটবদ্ধ হয়ে দোকান কর্মচারীদের মারধর করে ফাও খেয়ে যায় আর রাতে দোকানের বিভিন্ন মালামাল নিয়ে চলে যায়। তিনি মনে করেন, পুলিশ আগে থেকে এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে হত্যার মতো ঘটনা ঘটত না।
পুলিশ বলছে, এরা কামরাঙ্গীরচর এলাকার চিহ্নিত ছিনতাইকারী। ঘটনার পর লেকপাড় থেকে প্রথমে সোজা চলে যায় নিজ এলাকায়, পরে যার যার মতো আত্মগোপনে চলে যায়। গ্রেপ্তার রাব্বিকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঘটনার পর ছিনিয়ে নেওয়া ফোনটি সাড়ে ৫ হাজার টাকা দাম ধরিয়ে দুলাল নামে এক মাদক কারবারির কাছে বিক্রি করে ছিনতাইকারী চক্রটি। ২ হাজার টাকা মূল্যে ১০টি ইয়াবা নিয়ে সেবন করে তারা। আর বাকি সাড়ে ৩ হাজার টাকা নিয়ে ভাগ করে নেয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার রাব্বিসহ পলাতক রাসেল, হৃদয়, সজীব ও সোহেলসহ আরও কয়েকজন মিলে গড়ে তোলা ছিনতাইকারী গ্রুপটির একমাত্র পেশা ছিনতাই। তারা সবাই মাদকাসক্ত। নেশার টাকা জোগাড়ে তারা নিয়মিত ছিনতাই ও চুরি করে থাকে।
মামলার বাদী শাহাদতের স্ত্রীর বড় ভাই শফিউল আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাহাদত যে ছয় মাস দেশে থাকতেন সে সময় নিয়মিত ধানম-ি লেকে শরীরচর্চা করতে যেতেন। তবে কখনোই এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকেননি। ঘটনার দিন শাহাদত শরীরের সুগার পরীক্ষা করে দেখেন ৯-এর বেশি। ফলে বাসায় বলে যান বেশি করে হাঁটবেন। ফিরতে একটু দেরি হবে।’
