ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি বাবার ক্ষমতায় ছেলের দাপট!

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২২, ০৮:১৯ পিএম

পাবনার ‘ইজাহার বাহিনীর’ অত্যাচারে অতিষ্ঠ মালঞ্চি ইউনিয়নের কামারগাঁও গ্রামবাসী। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি বাবা মোহন প্রামাণিকের ছেলে ইজাহার প্রামাণিক ক্ষমতার দাপটে জমি দখল, চাঁদাবাজি, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাসহ নানা অপকর্মে যুক্ত বলে অভিযোগ। ভয়ে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও সাহস পান না এলাকাবাসী।

স্থানীয়রা জানান, কামারগাঁও দাখিল মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচন নিয়ে ইজাহারের কথামতো কাজ না করায় গত ২৬ অক্টোবর শিক্ষক আবু সাইদকে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে এনে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় পরদিন সদর থানায় ইজাহার, সোহেল, আকমল, মোতালেবের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত তিন-চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আবু সাইদ। মাদ্রাসার সব শিক্ষক সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার রেইনার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বিচার দাবি করেন। এ সময় তারা ইজাহার বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন।

জানা যায়, এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওই মাদ্রাসার শিক্ষক লুৎফর রহমানকেও মারধর করে ইজাহার ও তার  অনুসারীরা। এরপর থেকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ওই মাদ্রাসার শিক্ষকরা।

বুধবার সরেজমিনে কামারগাঁও গ্রামে গিয়ে অনেক অভিযোগ জানা গেলেও নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি অধিকাংশ মানুষ।

তারা জানান, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে ইজাহার বাহিনীর অবর্ণনীয় অত্যাচার। তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাননি আওয়ামী লীগ নেতারাও।

মালঞ্চি ইউনিয়ন ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল হামিদ মাস্টার জানান, দীর্ঘ দিন তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত। দুঃসময়েও বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিছুদিন আগে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তার দুই ছেলেও চাকরির জন্য বাড়ির বাইরে থাকে। এ সুযোগে ইজাহার বাহিনী জোরপূর্বক কামারগাঁও বাজারে তার ২০ শতক জমি দখল করে নেয়। প্রায় ৩৫ বছর আগে কেনা জমির জাল কাগজ তৈরি করে সেখানে ঘর তুলে নৌকা ঝুলিয়ে দিয়েছে। কোনোভাবেই তিনি জমি উদ্ধার করতে পারছেন না। নিরুপায় হয়ে তার স্ত্রী আদালতে মামলা করেছেন। এরপর থেকে মামলা তুলে নিতে প্রতিনিয়ত তাকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে ইজাহার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা।

আক্ষেপ করে আব্দুল হামিদ মাস্টার বলেন, যে দলের জন্য সারা জীবন কষ্ট করে সংগঠন গোছালাম, সে দলের নামেই এখন অত্যাচারিত হতে হচ্ছে। আমি এর বিচার কার কাছে চাইব?

স্থানীয় আলতাফ খাঁ বলেন, আমরা দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে দেখছি এ জমি ক্রয়সূত্রে হামিদ মাস্টার ভোগ-দখল করে আসছেন। জমির পুকুর হামিদ মাস্টারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে ইজাহারের পরিবারও মাছ চাষ করেছে। হঠাৎ করে তারা দাবি করছে এ জমি তাদের। ক্ষমতার দাপটে মাটি ভরাট করে দোকান ঘর তৈরি করেছে। সেখানে নৌকা ঝুলিয়ে অপকর্ম জায়েজের চেষ্টাও চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কামারগাঁও গ্রামের একাধিক গ্রামবাসী জানান, মোহন প্রামাণিক ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেও তার ছেলে ইজাহারই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে ইজাহার এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ইজাহার ও তার প্রধান সহযোগী সোহেলের ভয়ে এলাকার মানুষ আতঙ্কিত থাকে। নানা অজুহাতে তারা চাঁদাবাজি করে। মাদ্রাসা থেকেও নানাভাবে টাকা আদায় করে। নিয়োগ বাণিজ্য করতে তারা ম্যানেজিং কমিটিরই নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করছে। তাদের নামে মামলা হওয়ার পরও প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়ায়।

মালঞ্চি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল আলিম বলেন, ইজাহারের বাবা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। ইজাহারের কোনো দলীয় পদ নেই। ফলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই। তার বাবাকে অভিযোগ সম্পর্কে জানানো হয়েছে। মাদ্রাসায় হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

তবে এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ অস্বীকার করেন মো. ইজাহার প্রামাণিক।

তিনি বলেন, এলাকায় আমি কারো জমি দখল করিনি। আমার চাচাতো ভাই জমি কিনে দখল নিয়েছে। সে দোকানঘর তৈরি করেছে। আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য নয়। মাদ্রাসা শিক্ষককেও মারধরের অভিযোগ মিথ্যা।

যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহন প্রামাণিকের মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জুয়েল বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষক মারধরের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কামারগাঁও গ্রামে আব্দুল হামিদের জমি জোরপূর্বক দখল চেষ্টার অভিযোগ পেয়ে পুলিশ মাটি ভরাট কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত