কোরিয়া জাতীয় দলের কোচ হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করা কিম ইয়ং কিউ এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন রূপায়ণ সিটি কুমিল্লাকে। হকি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তার অধীনে অসাধারণ খেলছে রূপায়ণ সিটি। এর মধ্যেই চার ম্যাচের তিনটিতে জিতেছে তারা। অভিজ্ঞ এই কোরিয়ান কোচ দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে রূপায়ণ সিটির সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের হকি নিয়ে বলেছেন অনেক কথা
ডাগআউটে আপনার উদযাপনটা দেখার মতো হয়। প্রতি গোলেই দেখা যায় দুই আঙুল প্রসারিত করে কোমর দুলিয়ে নাচছেন...
কিম : হা হা হা। আসলে এই অঞ্চলের মানুষগুলো অনেক আমুদে। তাদের সঙ্গে যতই মিশছি ততই অভিভূত হচ্ছি। এখানকার সব কিছুই ভালো লাগছে শুধু যানজট ছাড়া। অল্প পথ যেতেই অনেক সময় লেগে যায়। এমন দীর্ঘ সফর শেষে টার্ফে পা রেখেই মনটা ভালো হয়ে যাচ্ছে। আর যখন দেখছি ছেলেরা পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলে সাফল্য পাচ্ছে তখন খুব ভালো লাগে। সেটা সেই উদযাপনের মধ্য দিয়েই প্রকাশ করি।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আসা। অথচ খেলোয়াড়ি জীবন শেষে দীর্ঘদিন কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই অঞ্চলের হকি সম্পর্কে সেভাবে তো নিশ্চয় জানার সুযোগও হয়নি।
কিম : বাংলাদেশে আগে কখনো আসিনি। তবে অনেক আগে থেকেই এ দেশের হকি সম্পর্কে ধারণা ছিল। একটা সময় কোরিয়ার হকি বাংলাদেশের মতোই ছিল। অথচ এখন কোরিয়া কতটা এগিয়ে গেছে!
কোরিয়ার সিনিয়র দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন দলকে দীর্ঘদিন করানোর অভিজ্ঞতা আছে আপনার। ওরা কেন এগিয়ে গেল?
কিম : কেবল কোরিয়া নয়, যে দেশগুলো হকি বিশ্ব শাসন করছে, তাদের প্রায় প্রত্যেকের উন্নতির পথটা একই রকম। হকিতে উন্নতির পূর্বশর্ত হলো প্রচুর খেলোয়াড় ও তাদের খেলার সুযোগ করে দেওয়া আর অর্থের জোগানটা ঠিকঠাক হওয়া। কোরিয়ার হকি এই তিনটি শর্ত পূরণ করেই এগিয়েছে।
তাহলে কী করে বাংলাদেশের উন্নতি হবে? তাদের তো এই তিন শর্তের কোনোটাই পূরণ করার অবস্থা নেই?
কিম : আমি সেভাবে মনে করছি না। এখানে আসার পর থেকে হকি নিয়ে মানুষের একটা উন্মাদনা দেখতে পাচ্ছি। সেটা হয়েছে এই আসরটি আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এই আসরের ফলে রূপায়ণের মতো বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খেলামুখী হয়েছে। তারা এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে। ফলে খেলোয়াড়রা টাকা পাচ্ছে। একই সঙ্গে পাচ্ছে খেলার অবারিত সুযোগ। আমি তাই রূপায়ণসহ সব ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ধন্যবাদ দিতে চাই। বিশেষ করে রূপায়ণের প্রতি কৃতজ্ঞতা আমাকে কোচের দায়িত্ব দেওয়ায়।
রূপায়ণ সিটি এর মধ্যেই মাঠে নিজেদের প্রমাণ করেছে। আপনার দলটা নিয়ে কিছু বলুন।
কিম : আমি সৌভাগ্যবান এমন একটা দল পাওয়ায়। প্রত্যেকের মধ্যে ভালো খেলার তাড়না দেখতে পাচ্ছি। প্রত্যেকেই চায় প্রতিটি ম্যাচ জিততে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের ম্যাচ খেলতে হচ্ছে। ফলে সবসময় প্রত্যাশা মতো খেলা সম্ভব হচ্ছে না। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমাদের সামনের ম্যাচগুলোতে ভালো করতে হবে। আর আমাদের ছেলেরা যে ভালো করবে, সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
এতটা বিশ্বাস শিষ্যদের ওপর?
কিম : এই বিশ্বাসটা আমার মধ্যে তৈরি করে দিয়েছে আমাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি রূপায়ণ গ্রুপ। তারা প্রতিটি ব্যাপারে ভীষণ আন্তরিক। দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা অনেক খুশি। তাই তারা মাঠে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
সেটা না হয় হলো, আবার আপনার দলের তো কিছু সমস্যাও চোখে লাগছে। বিশেষ করে আপনার শিষ্যরা পেনাল্টি কর্নার থেকে পাওয়া সুযোগগুলো সেভাবে কাজে লাগাতে পারছে না।
কিম : এটা আমারও মাথা ব্যথার কারণ। তবে ভুলগুলো শুধরে দেওয়ার মতো যথেষ্ট সময় আমাদের হাতে নেই। তাই আমি চেষ্টা করছি মানসিকভাবে ছেলেদের মোটিভেট করতে, যাতে ম্যাচে আরও মনোযোগী হয়। আশা করছি তারা সামনে কম ভুল করবে।
ডিরেক্ট সাইনিং হিসেবে গত রাতে স্পেন জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড় (আন্তোনিও সানজ) উড়িয়ে আনা হয়েছিল। অথচ ছাড়পত্র না মেলায় তাকে ফিরে যেতে হচ্ছে। ও থাকলে নিশ্চয় দলের শক্তি বাড়ত।
কিম : ওর খেলতে না পারাটা আমাদের জন্য বড় ধাক্কা। ও অনেক ভালো খেলোয়াড় ছিল। ও দলে থাকলে আমাদের শক্তি অনেক বাড়ত। তবে কেন জানি না ও তার দেশের ছাড়পত্র পেল না। এখন যারা আছে তাদের নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
চার ম্যাচ শেষে দেখা যাচ্ছে সেমিফাইনালের লড়াইয়ে এগিয়ে আছে একমি চট্টগ্রাম, রূপায়ণ সিটি কুমিল্লা ও মেট্রো এক্সপ্রেস বরিশাল। শিরোপার সম্ভাবণা কার বেশি?
কিম : আমি তো বিশ্বাস করি আমরাই চ্যাম্পিয়ন হব। তবে এটা হলফ করে বলার সুযোগ নেই। প্রতিটা দলেরই সে সামর্থ্য আছে। আমি চাই রূপায়ণ ম্যাচ বাই ম্যাচ এগিয়ে যাক।
রূপায়ণ সিটিতে জাতীয় দলের বেশ ক’জন খেলোয়াড় আছেন। অন্য দলগুলোর খেলাও দেখেছেন। এ দেশের হকির মান সম্পর্কে নিশ্চয় একটা ধারণা পেয়ে গেছেন এতদিনে?
কিম : আমি এখানে এসেছি রূপায়ণকে সহায়তা করতে। বাংলাদেশের হকির মান কেমন সেটা আমার কাছে এ মুহূর্তে মুখ্য নয়। তারপরও আমি মনে করি এ দেশের হকির দারুণ সম্ভাবন আছে। কারণ বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
অথচ বাংলাদেশের তো পর্যাপ্ত খেলার টার্ফ ও খেলোয়াড় নেই। প্রতিভা উঠে আসার ক্ষেত্রও অনেক কম। বিকেএসপিই অন্যতম পাইপলাইন।
কিম : আমি বিকেএসপিতে অল্প কিছুদিন থেকেই বুঝেছি সেখানে যারা ছাত্র আছে তাদের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে উন্নতি করতে হলে কেবল একটা বিকেএসপির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রচুর খেলা আয়োজন করতে হবে, ছেলেমেয়েদের খেলার অবারিত সুযোগ করে দিতে হবে। তবেই দেখবেন ধীরে খেলাটা উন্নতি হতে শুরু করেছে।
কোচ হিসেবে নিশ্চয় রূপায়ণ সিটির হাতেই শিরোপাটা দেখতে চাইবেন?
কিম : তা তো অবশ্যই। এটা তারা প্রাপ্য, কারণ রূপায়ণ গ্রুপের আন্তরিকতা ও চেষ্টা দেখে আমার মনে হয়েছে খেলোয়াড়দের উচিত তাদের প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দেওয়া।
যদি বাংলাদেশ জাতীয় দলে কাজ করার প্রস্তাব আসে, ভেবে দেখবেন?
কিম : যেকোনো জাতীয় দলে কাজ করাই অনেক সম্মানের। এই প্রস্তাব পেলে অবশ্যই সম্মানিতবোধ করব। তবে আসব কি আসব না, তা নিয়ে আমার দু’বার ভাবতে হবে। কথা বলতে হবে আমার পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে। তাছাড়া প্রস্তাবটা কেমন তার ওপরও নির্ভর করছে অনেক কিছু। তবে এ দেশের মানুষ ও হকি আমার অনেক ভালো লেগেছে।
বাংলাদেশের হকির উন্নতির জন্য কোনো পরামর্শ দেবেন?
কিম : আমি যেহেতু একটা নির্দিষ্ট দলের কোচ, সেহেতু সে রকম কিছু বলা আমার সাজে না। তারপরও বলব হকিতে এগিয়ে যেতে হলে অবকাঠামোর উন্নয়ন, খেলোয়াড় সংকট কাটানো যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন হকি খেলোয়াড়দের কোচিংয়ে আসা। বাংলাদেশেরও উচিত হবে সাবেক খেলোয়াড়দের বাইরে পাঠিয়ে সুশিক্ষিত করে কাজে লাগানো।
