ভার্চুয়াল কারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন ও ক্রয়-বিক্রয়সহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ গত মাসে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সম্প্রতি বিভিন্ন বিদেশি ভার্চুয়াল অ্যাসেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ভিএএসপি) তাদের ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে বাংলাদেশে কার্যরত কোনো কোনো তফসিলি ব্যাংকের গ্রাহক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ভার্চুয়াল কারেন্সি, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেন কারেন্সি লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়, পুনঃবিক্রয়, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি বিনিময়, স্থানান্তর ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে এই পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল সম্পদ ও ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেন এবং তাদের বিনিময়, স্থানান্তর, বাণিজ্য কার্যক্রম অথবা এমন যেকোনো ধরনের কার্যে সহায়তা প্রদান অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করে পরিপালন কার্যক্রম বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে।
এ কথা কমবেশি সবাই জানি যে, বিশ্বে বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে। ধারণা করা হয়, ২০০৮ সালে সাতোশি নাকামোতো নামের জনৈক সফটওয়্যার ডেভেলপার এই বিটকয়েন আবিষ্কার করেন। এটিই বিশ্বের প্রথম ভার্চুয়াল কারেন্সি। দিন দিন ক্রিপ্টোগ্রাফিক কয়েন, ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েনের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। উন্নত বিশ্ব যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, জার্মানি ও এমনকি ভারতও বিকেন্দ্রীকরণ পদ্ধতির এই ডিজিটাল মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়েছে। অনলাইনে পণ্যমূল্য পরিশোধ করে বিটকয়েনের মতো লাইটকয়েন, পিয়ারকয়েন, রিপল, ড্রাককয়েন, ডগকয়েন, নেমকয়েন এমন অন্তত ডজনখানেক ভার্চুয়াল মুদ্রা দিয়ে কেনা যাচ্ছে প্রয়োজনীয় পণ্যও। অনলাইন থেকে পণ্য ক্রয়ে এই মুদ্রার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বাংলাদেশেও। তবে তার কোনো অনুমোদন নেই।
বিটকয়েন আসলে কোনো কয়েন নয়। এটি একটি ভার্চুয়াল মুদ্রা, যা কম্পিউটারের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হয়। বিটকয়েনের সাংকেতিক প্রতীক হলো BTC, এবং এর ক্ষুদ্র একক হলো সাতোশি। এক বিটকয়েন সমান ১০ কোটি সাতোশি। বিটকয়েন কোনো ক্যাশ বাক্স বা ব্যাংকে রাখা যায় না। এই মুদ্রার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাও নেই। এটি অনলাইনের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। এটি এক হাত থেকে অন্য হাতে যায়, তবে হাতের স্পর্শ ছাড়া। এটা অনলাইন মাধ্যম বিধায় সব ধরনের বৈধ ও অবৈধ কাজে এটি ব্যবহার করার সুযোগ আছে। নির্দিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা না থাকায় বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেন করলে কে বা কারা লেনদেন করছে তা বের করা কঠিন। সাধারণত আইনবহির্ভূত বা আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজেই এই বিটকয়েন ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মাদক কেনাবেচা, অস্ত্র ব্যবসা এমনকি খুনখারাবির কাজেও বিটকয়েন ব্যবহার করা হচ্ছে ইদানীং।
একটা অনলাইন ওয়ালেটের বিপরীতে একটি আইডি বা গ্রাহকের একটা হিসাব নম্বর দেওয়া হয়। সেখানে একজন গ্রাহক বিটকয়েন জমা বা খরচ করতে পারেন। এই কয়েন অর্জনের অনেক উপায় আছে। যেমন কিছু ওয়েবসাইটের কাজ করে, কোনো মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমে, কোনো কিছু বিক্রয়ের মাধ্যমে। তবে বিটকয়েন উপার্জনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে বিটকয়েন মাইনিং করা। মাইনিং বলতে বোঝায় বিটকয়েনের সব লেনদেন যাচাই করা এবং পাবলিক লেজারে অর্থাৎ ব্লকচেইনে যুক্ত করা। সহজ ভাষায় বিটকয়েন মাইনিং হলো নতুন ব্লকের মাধ্যমে বিটকয়েনকে খুঁজে বের করা, লেনদেন যাচাই করা এবং ব্লকচেইনে বিটকয়েনকে যুক্ত করা।
ব্লকচেইন প্রযুক্তি একটি নতুন ধরনের ইন্টারনেটের ভিত তৈরি করেছে, যা ব্যবহার করা যাবে কিন্তু কপি করা যাবে না। সহজ করে বললে বলা যায় ব্লকচেইনের সিস্টেম মোটেও ব্যাংকিং সিস্টেমের মতো না। ধরা যাক, একজন ভদ্রলোক প্রচলিত ব্যাংকিংসেবার মাধ্যমে অন্যস্থানে বাসরত একজনকে ১০ হাজার টাকা পাঠালেন। এই লেনদেন ব্যবস্থাটিকে যদি একটু বিশ্লেষণ করি তাহলে ভদ্রলোক হচ্ছেন প্রথম পক্ষ ও যিনি টাকা পাচ্ছেন তিনি হচ্ছেন দ্বিতীয় পক্ষ, অন্যদিকে ব্যাংকিং সিস্টেম হলো তৃতীয় পক্ষ। তাহলে এই দাঁড়াল যে, এই ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে লেনদেন করাসহ প্রায় সব ধরনের কার্যকলাপ সম্পূর্ণ হয়ে গেল। অর্থাৎ দুজনের কাছে অর্থ হাত বদল করতে যেসব সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন পড়ে তার সবটাই ব্যাংক তার সেবার মাধ্যমে প্রদান করে। যেটাকে আমরা ব্যাংকিং সিস্টেম বলে থাকি। ব্যাংকিং সিস্টেমকে ব্লকচেইনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে, একজন ভদ্রলোক ৫০ জন বন্ধুকে টাকা পাঠাবেন এবং এই কয়েকজন একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কোনো এক মাধ্যমে টাকা লেনদেন করতে পারে। একসঙ্গে আন্তঃসংযোগ হয়ে টাকা হস্তান্তরের এই বিষয়টিকে ব্লকচেইনের ভাষায় আমরা বলি উন্মুক্ত লেনদেনের হিসাব। উন্মুক্ত হওয়ায় পুরো ব্লকচেইন সিস্টেমটি হচ্ছে বিকেন্দ্রীকরণ। ৫০ জনের আন্তঃসংযোগের বিষয়টি খেয়াল করলে দেখা যায়, যেহেতু তারা একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত সেহেতু প্রত্যেকেই প্রত্যেকের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে ধারণা রাখে, ব্লকচেইনের মজাটা আসলে এখানেই। কারণ প্রত্যেক লেনদেনের সময় সংযুক্ত প্রতিটি অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হয়। স্বয়ংক্রিয় এই বিষয়টিই হলো Distributed Open Ledger যা Decentralized নামেও পরিচিত। তবে এখানে একটি সংশয় থাকতে পারে, যেমন : কেউ ১০০ টাকা পাঠিয়ে ১০০০ টাকা পাঠিয়েছে বলতে পারে। সেজন্যই লেনদেনের পুরো সিস্টেমটিকে যাচাই বা ভ্যারিফাই করতে হয়, আর এই ভেরিফিকশনের কাজটি হচ্ছে মাইনিং, যারা এটি করে থাকেন তাদের মাইনার (গরহবৎ) বলে।
অনেকটা শেয়ার বা মুদ্রার মতো লেনদেন হয় এই ভার্চুয়াল কারেন্সিটি। নিয়মিত এর বিনিময়মূল্য ওঠানামা করে। এটি নিজেই ডলার বা ইউরো এসব আন্তর্জাতিক মুদ্রার মতো বিনিময় মাধ্যম। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে সীমিত পরিসরে বিটকয়েনকে ব্যবহার করা হয় নিজস্ব মুদ্রার মতো। বিটকয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন ইউজারদের পিসিতেই সংরক্ষিত থাকে। পিয়ার টু পিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর ইউজার রেফারেন্স অনুযায়ী লেজার হালনাগাদ করে দেয়। অর্থাৎ কোনো ক্লিয়ারিং হাউজের খবরদারি নেই এখানে। ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রক্রিয়ায় বিটকয়েনের লেনদেন সম্পন্ন হয়। বিশ্বে এখন ৭২০ কোটি ডলারের ওপর ভার্চুয়াল মুদ্রাবাজার রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৩৭টিরও বেশি দেশে বিটকয়েন ভার্চুয়াল মুদ্রাটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এখনো তৈরি হচ্ছে বিটকয়েন মুদ্রা। প্রতিদিন মাইনিংয়ের মাধ্যমে এই মুদ্রা উৎপাদন করা হচ্ছে। নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রতি দশ মিনিটে অ্যালগরিদম সমস্যার সমাধান করায় ২৫ মাইনারকে দেওয়া হচ্ছে বিটকয়েন। বর্তমানে ১ কোটি ২৪ লাখ বিটকয়েন প্রচলিত আছে। এর বাজারদর এখন ৬২০ কোটি ডলার। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্টি হওয়া বিটকয়েনগুলো প্রতি চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। এরপর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরি হয়ে গেলে আর কোনো নতুন বিটকয়েন তৈরি করা হবে না। একটি বিটকয়েনের বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী দশ মিনিটে ৫০৮ ডলার বা ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা আয় করার সুযোগ নিতে কে না চাইবেন!
বাংলাদেশ থেকেও এই ভার্চুয়াল মুদ্রাটি উৎপাদনে অংশ নেওয়া সম্ভব। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে এমন তথ্যই পাওয়া যায়। গোয়েন্দারা জানান, কিছু ব্যক্তি দেশে অনলাইনে নিষিদ্ধ ভার্চুয়াল মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় করে আসছে। এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এদের চিহ্নিত করতে র্যাবের সাইবার মনিটরিং সেলের মাধ্যমে অনলাইন প্যাট্রলিং শুরু হয়েছে। অধিকতর নজরদারির মাধ্যমে একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বাংলাদেশে ভার্চুয়াল মুদ্রা বিষয়ে সচেতনতা কম বলে এ নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষকে ঠকানোর সম্ভাবনা বেশি। যেমন : র্যাব জানিয়েছে গ্রেপ্তার ব্যক্তি অনলাইনে ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েনের মাধ্যমে সাধারণ লোকজনের টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করে আসছিল। তার সঙ্গে একজন পাকিস্তানি নাগরিকও রয়েছে। তারা মানিলন্ডারিং ও ক্রেডিট কার্ড হ্যাকিংও করে থাকে।
যেহেতু বাংলাদেশে এই কয়েনের অনুমতি নেই তাই এটির লেনদেন করা ও এই মুদ্রা দিয়ে কেনাকাটা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পাশাপাশি বাংলাদেশে এই কয়েন সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছ ধারণা পোষণ করে না। এদিক থেকে ভার্চুয়াল কয়েনের ব্যবহারে সরকারের আপত্তি ঠিক আছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, আজ বা কাল বাংলাদেশকেও এই কয়েনের মাধ্যমে ব্যবসা করতে হতে পারে। ফলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ঠেকিয়ে রাখার চেয়ে ভার্চুয়াল মুদ্রা বিষয়ে অর্থনীতি ও ব্যাংকিং সেক্টরও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের সচেতন করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়ে ধীরে ধীরে এর ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
লেখক: ব্যাংকার ও গবেষক
