হাসান আজিজুল হকের শিল্পিত স্বাতন্ত্র্য

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২২, ১২:৪২ এএম

কথাসাহিত্যের জগতে, বলা যায়, একেবারে শুরু থেকেই হাসান আজিজুল হক পাঠক-সমালোচকদের নজর কাড়েন। সে তো অনেকেই কাড়েন। কিন্তু এসবের পাশাপাশি একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে জাগে। সেটা এই যে, প্রকৃতপক্ষে হাসানের স্বাতন্ত্র্য ঠিক কোথায়? এমনও তো নয় যে, তিনি সাহিত্যকে, জীবনযাপনের সূত্রে, খুব বড় একটা জায়গা দিয়েছিলেন। অনেকেই সেটা দেন, আর যিনি দিয়ে থাকেন, তার পক্ষে নিশ্চিতভাবেই এইভাবে বলা সম্ভব নয় যে, ‘আমি মনে করি সাহিত্য শ্রম নয়, শ্রমের ফসল। কারখানায় শ্রমিক নিজের পেশি পঁচানব্বই ভাগ এবং বুদ্ধি পাঁচ ভাগ ব্যবহার করে যে শ্রম ব্যয় করেন, সাহিত্যিক উল্টোভাবে সেই একই কাজ করে থাকেন অর্থাৎ কলম-ধরা ইত্যাদি পাঁচ ভাগ পেশিশক্তি এবং পঁচানব্বই ভাগ মানসিক শক্তি ব্যবহার করে লেখার কাজ করেন।’ আর তারপরই হাসান তার সেই বিখ্যাত শ্লেষাত্মক বাক্য ব্যবহার করে বলেছিলেন, ‘এতেও বেচারা সাহিত্যিক কিন্তু একটা সুচও তৈরি করতে পারেন না, যা দিয়ে গর-গেরস্থালির কোনো কাজ হয়। বুঝতেই পারা যায় দা-কুড়োল-কোদাল-ট্রুথব্রাশ-চাল-ডাল যেমন সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সাহিত্য তা নয়।’ তার মানে, জীবনের সীমিত পরিসরে, তিনি সাহিত্যকে খুব-একটা জায়গা দিতে কখনোই সম্মত ছিলেন না। কেন ছিলেন না, তারও একটা যৌক্তিক কারণ আমরা জানতে পারি খোদ হাসানের কাছ থেকেই। তিনি বিশ^াস করতেন, ‘উন্নত দেশগুলোর দিকে চেয়েও মনে হয় এই প্রযুক্তি-আক্রান্ত, বিজ্ঞান-গ্রাসিত পৃথিবীতে মানুষ যেভাবে মগজে চর্বি জমাচ্ছে তাতে সাহিত্য আর কিছু শোনাবে না। আমাদের দেশগুলোর চেহারা অবশ্য আলাদা, পঁচানব্বই ভাগ মানুষই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন সাহিত্য...যাকে সাহিত্য বলা যায়, তার কাজ করার ক্ষমতা প্রায় কিছুই নেই।’ নিজের কথাগুলোকে খানিকটা বিস্তারে নিয়ে হাসান যেটি বলতে চেয়েছিলেন, তা হচ্ছে ‘সাহিত্যের সামাজিক ব্যবহার আছে তাতে কোনো সন্দেহ করিনি। কিন্তু সামাজিক প্রয়োজন মেটাব বলে সাহিত্য সৃষ্টি করতে বসলাম এ রকম মনোভাব যে সব সময়ই একজন সাহিত্যিককে সাহায্য করে তা বলা যায় না। অন্তত এ রকম একটা মনোভাব থাকলেই যে তা ভালো সাহিত্যের গ্যারান্টি হয়ে যাচ্ছে তা ঠিক নয়। তাহলে সস্তা স্লোগানের সাহিত্যের এত ছড়াছড়ি দেখা যেত না।’ সেই সঙ্গে তিনি এটিও স্বীকার করেছিলেন, ‘এ কথাও একশোবার সত্যি যে সাহিত্যিক তার সময়ের সমাজের কাছে, মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। এই দায় কোনো একভাবে পালন করতে না পারলে তিনি কী লিখলেন কী লিখলেন না তাতে কিছু এসে যায় না।’ এই যে লেখকের দায়বদ্ধতার কথা হাসান বলেন, সেদিক থেকেই তিনি তার সমসাময়িক লেখকদের চেয়ে একেবারে আলাদা হয়ে যান। দূর থেকেও তাকে উজ্জ্বলভাবে চেনা যায়। চেনা যায় তার সেই সামাজিক অঙ্গীকারের জন্যই শুধু নয়, তার লেখালেখির শিল্পিত বিন্যাসের জন্যও বটে। বোর্হেস সম্পর্কে ইতালো কালভানো যেমনটি বলেছিলেন, বোর্হেসের লেখা যে তার ভালো লাগে এর কারণ হচ্ছে, বোর্হেসের প্রত্যেকটি লেখায় মহাবিশ্বের একটি বৈশিষ্ট্য যেন উপস্থিত থাকে। সেই সঙ্গে তার বক্তব্য অনুকরণীয় ও পরিমিত প্রকাশভঙ্গিতে সেই লেখাগুলোতে ধরা থাকে। হাসানের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই একই কথা আমরা বলতে পারি। সেটা যদি বলি, তবে তাতে করে সত্যের অপলাপ করা হয় না।

২. সনৎকুমার সাহা সত্যের সেই ভরকেন্দ্রের ওপর দাঁড়িয়েই বোধকরি, বলতে পেরেছিলেন, ‘সমাজের হয়ে ওঠাকে, সমাজের মুক্তিকে তিনি কী চোখে দেখেন, কোথায় দেখেন, কোন লক্ষ্যে দেখেন এগুলো নিয়ে কোনো সংশয়ের দোলাচলে তিনি [হাসান] ভোগেননি। তার স্মৃতিসত্তা ভবিষ্যৎ চলে এসেছে সমলয়ে। গল্পকে স্থাপন করেছেন তারই যোগসূত্রে। সেখানে কোনো ধোঁয়াশা ছিল না।’ এসবের নিহিতার্থ কারণ সম্পর্কে সনৎকুমার সাহা বেশ স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন যে হাসানের ‘আশৈশব অভিজ্ঞতার জগৎ তার কাছে তার করতলের রেখার মতোই স্পষ্ট। এবং তা গভীর মমতায় বুকে সব সময় সুখের মতো ব্যথা জাগিয়ে চেতনার গোপন কুঠুরিতে সঞ্চিত। আর ভবিষ্যতের রূপরেখাকে চিনিয়ে দেয় দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার মার্কসীয় বিচার। যান্ত্রিকভাবে নয়।’ পাশাপাশি প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা এটিও বলেছিলেন, ‘আমরা জানি, বাংলা কথাসাহিত্যের, বিশেষ করে ছোটগল্পের এক গৌরবোজ্জ্বল কালখ-ে হাসান আজিজুল হকের আবির্ভাব। পেছনে রবীন্দ্রনাথের বিশাল ব্যাপ্তি, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, প্রেমেন মিত্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়Ñএদের ফসলের ঘ্রাণে তখনো বাতাস মেদুর। গল্পের কাছে প্রত্যাশার জগৎ অনেক আগে থেকে তৈরি। এই উত্তরাধিকার স্বীকার করেই হাসানের লেখা শুরু।’ আর তারপরই নিজের বিস্ময়কে গোপন না-করেই তিনি বলেন, “অথচ আশ্চর্য, প্রথম গল্প ‘শকুনে’ই তিনি পতাকা ওড়ালেন তার স্বকীয়তার। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে নয়, ঐতিহ্যকে আত্মস্থ করে অশেষ শ্রদ্ধায় তার ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু একেবারে নিজের মতো করে ছাপ এঁকে দিয়ে। এখানে তিনি পুরোপুরি নিজের ওপর আস্থাশীল। সেই আস্থার অসংকোচ প্রকাশ তার রচনায়।” সনৎকুমার সাহার এই বিশ্লেষণকে অস্বীকার করার কোনো উপায়ই আমাদের থাকে না।

৩. কেন থাকে না? আমাদের জানা আছে যে, শৈশবকে পুনরাবিষ্কারের চেষ্টা বড়মাপের লেখকদের একটি অন্যতম স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। সাধারণ লেখকরা বড়জোর তার-একটা ছায়া আঁকার চেষ্টা করেন মাত্র। যে-কারণে ‘স্মৃতিচারণ’ আর ‘পুনরাবিষ্কার’ ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ঠিক একই জিনিস হয়ে ওঠে না। যদিও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়েই তাকে পুনরাবিষ্কারের চেষ্টা চলে। আর এটিই খুব সহজ কোনো কাজ নয়। বলতে পারি, সেই কঠিন কাজের ভেতর দিয়ে নিজের শৈশবের আবিষ্কারের নেশাটা হাসানকে যেন তার জীবনের অন্তিম পর্বে পেয়ে-বসেছিল। কারণ এটা তো শুধুই তার শৈশব নয়, এর মধ্য দিয়ে নিজের জীবনটাকেও এক প্রস্থ দেখে নেওয়ার একটা সুযোগ তিনি যেন পেয়ে যান। সে-সুযোগ আবার সব লেখকের ভাগ্যে জোট না। হাসান তার শৈশবের গাঁয়ের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন : ‘এক-একসময় রাগে পিত্তি জ্বলে যায়। কোথাও কিছু পাওয়ার উপায় নেই। একটা ফল নেই যে চুষি, একটা ফুল পাই না যে তার রং দেখে দেখে খানিকটা সময় কাটাই, কী একটুখানি গন্ধ শুঁকি। এমন খালি ঠনঠনে আমাদের এই দেশ।’ তাদের সেই গ্রামে একটু সবুজ খুঁজে পাওয়াটা যে একটা মুশকিলের কথা, সেটাও হাসান এই সূত্রে পাঠককে জানিয়ে দেন। আর মাঠে-মাঠে ঘুরে তেমন কিছু উপাদেয় ফলমূল খেতে না-পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই বোধকরি এভাবে বলেন ‘আমরা ভাত খাই, ডাল খাই, ধান থেকে যা যা হয়, তার সবই খাই। কারণ ধান ছাড়া আর কিছুই এখানে তেমন হয় না। আগে ধান, পরে ধান, শেষেও ধান।’ শুধুই ভাত আর পাতলা ডালের সঙ্গে আর কী-কী খাওয়া জোটে তারও একটা ছোটখাটো তালিকা দিয়েছেন হাসান। যে-তালিকার মধ্যে রয়েছে কুমড়োর ছেঁচকি, আলুকুমড়োর ঘ্যাঁট, শজনেপাতা সেদ্ধ, পুঁই, কলমি আর হেলেঞ্চা শাক। শিম, চিচিঙ্গা, ঝিঙের পাশাপাশি আফিম থেকে তৈরি পোস্ত। আর রয়েছে বেগুন-প্রীতির কথা। যা হাসানের ভাষায়, ‘বেগুন খেতে খেতে গায়ে চুলকানি দেখা দেয়, তবু ছাড়া যায় না।’ অন্য কিছু তেমন পাওয়া যায় না বলেই যে সেটা ছাড়া যায় না, সেটিই হাসান সরাসরি না-বললেও আমরা ঠিক-ঠিকই বুঝে নিতে পারি। তা ছাড়া, খাওয়া-দাওয়া নিয়ে এই নিদারুণ কষ্টের ব্যাপারগুলো শৈশবের যাবতীয় ঐশ্বর্যের তুলনায় খুবই যে সামান্যÑসেটি বোঝানোর জন্যই হাসান বিষয়টিকে এ রকম লঘু করে তার পাঠকদের সামনে বিবৃত করেছেন।

৪. সানাউল হক তো সেই কবেই তার ‘খাদ্যভুবনে’ জানিয়েছিলেন যে, মানুষের খাদ্যগ্রহণের তাগিদের পেছনে নাকি ‘দেহরক্ষাটাই মৌল, ততোধিক হয়তো সুস্বাস্থ্য।...সুস্থ দেহে বাঁচার ইচ্ছা মানুষের জীবনে প্রবল এবং সেই হেতু সবল শরীর সাধনার সঙ্গে খাদ্যের পরিকল্পনা ও আয়োজনের সম্পর্ক এত গভীর।’ এই যে নিজের স্মৃতিকথায় এতবার এতভাবে খাবারের কথা তোলেন হাসান, এর প্রধান-একটা কারণ তাদের সময়ে খাদ্য যে কতটা মহার্ঘ একটা ব্যাপার ছিল সেটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যই তো! তার মানে ঠিক-ঠিক বাস্তবকে নয়, বাস্তবের বিশেষ-বিশেষ মুহূর্তগুলোকে পাঠকের চেতনার মধ্যে এক ধরনের স্পর্শযোগ্যতায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন হাসান। এক ধরনের উপলব্ধির সঞ্চার করতে চেয়েছেন তিনি এই আত্মকথনের মধ্য দিয়ে। যে-আত্মকথনকে তিনি ভারী সুন্দর-একটা নাম দিয়ে লেখেন, ‘স্মৃতির এই ভোরবেলা’। কেমন সেই ভোরবেলা আর সেই ভোরবেলার অনুভবটুকু? হাসান তার নিজের অনুভব থেকেই জানিয়েছেন, ‘মনে হচ্ছে গুন গুন করে সে সময়টাকে থামিয়ে দিয়েছে, আর সেই শূন্যতার ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছে অলৌকিক নির্জনতা।’

৫. হাসানের সমগ্র কথাসাহিত্যে তো বটেই, এমনকি তার সর্বশেষ অসমাপ্ত উপন্যাস ‘তরলাবালা’তেও সেই ‘অলৌকিক নির্জনতা’কে বিশ^প্রবাহের সমান্তরালে যেন আমরা দেখতে পাই। সেই প্রবাহের মধ্যে জীবনের সামগ্র্য, তার উন্মীলিত এক চেহারা যেন এইভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ‘দুই সন্তানকে তরলা দুই বগলের তলায় পুরে ফেলে। তারা হাত দিয়ে, মাথা দিয়ে মায়ের বুক খুঁজে নেয়। তরলা তাদের আয়ু দিতে থাকে।’ জীবনের এই সামগ্র্যতা, এই শৈল্পিক অভিব্যক্তি একজন লেখকের জীবনের বড়-একটা সম্পদ। হাসান তার সারা জীবনের লেখালেখির ভেতর দিয়ে সেটাকেই নানাভাবে আয়ত্ত করার চেষ্টা করে গিয়েছেন। হাসানের মতো একজন বড়মাপের লেখক, তার সারা জীবনের লেখালেখির ভেতর দিয়ে, এই চেষ্টাটুকু করে-যাওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারতেন!

৬. আজ হাসান আজিজুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি আমরা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানাই!

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত