সরকার রিজার্ভের টাকা নিয়ে অলস বসে থাকবে না

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২২, ০১:৩৬ এএম

রিজার্ভ নিয়ে সমালোচকদের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রিজার্ভের টাকা নিয়ে অলস বসে থাকা ঠিক হবে না, তা জনগণের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে, জনগণের ভোগান্তি কমাতে হবে। গতকাল সোমবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) নবনির্বাচিত ৫৯ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের শপথবাক্য পাঠ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের ৬২৩ জন সদস্যও শপথ নেন।

শেখ হাসিনা বলেন, হঠাৎ একটা কথা এসেছে রিজার্ভের টাকা নাকি নেই, চুরি হয়ে গেছে। এই চুরি কীভাবে সম্ভব? তিনি বিএনপি আমল এবং বর্তমানের রিজার্ভের তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, রিজার্ভের টাকা খরচ হয়েছে মানুষের কল্যাণে, তাদের প্রয়োজন মেটাতে।

গতকাল স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম জেলা পরিষদের নির্বাচিত এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মুহাম্মদ ইবরাহিম অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের তাদের এলাকাকে খাদ্য উৎপাদনে স্বাবলম্বী করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা জনকল্যাণমূলক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই এবং তার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন যেন নিশ্চিত হয় সেটাই আমাদের লক্ষ্য। এখানে আপনাদের একটা বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। এলাকায় কী ধরনের অসুবিধা আছে, মানুষের জন্য কী ধরনের কল্যাণকর কাজ করা যেতে পারে, উন্নয়নের জন্য কী কাজ করতে পারেন সেটা আপনাদের ভাবতে হবে। আমাদের এখানে বহুদলীয় গণতন্ত্র রয়েছে, অনেক দল রয়েছে। কেউ দল থেকে বা কেউ আলাদাভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, যখন আপনি ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তখন আপনার দায়িত্ব সবার জন্য।

তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি আমাদের নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভেতরে ওটাই থাকতে হবে যে মাটি মানুষ দিয়েই আমরা উন্নতি করতে পারি। কাজেই সেই আদর্শ নিয়েই আপনারা চলবেন।’

তার সরকারের সব পদক্ষেপ মানুষের কল্যাণে বলেই আজ এত উন্নয়ন করতে পেরেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়েছেন ভোগদখলের জন্য নয়, জনগণের সেবা দেওয়ার জন্য। আপনারা জনগণকে সেবা দিয়ে তাদের মন জয় করতে পারেন অথবা জনগণের অর্থ-সম্পদ লুট করে চিরদিনের জন্য বিদায় নিতে পারেন, এটা হলো বাস্তবতা। আমি চাই যেহেতু জনগণ আপনাদের ভোট দিয়েছে তাই জনগণকে সেবা দিয়ে তাদের মন জয় করে দেশের উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করুন।

তিনি বলেন, ‘আমরা ৬১টি জেলা পরিষদে ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব খাতের আওতায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা এবং এডিপি’র আওতায় ৫৪০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছি। সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি সহজ করতে ২৭টি জেলার ১৩৫টি উপজেলার ১ হাজার ৮০টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) বাস্তবায়ন করেছে। মানুষ যাতে ন্যায়বিচার পায় সেজন্য আলাদা ফান্ড দিয়ে লিগ্যাল এইড কমিটি করে দিয়েছি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন যতভাবে করা যায় তা করেছি।

সরকারপ্রধান বলেন, একুশ বছর পর ক্ষমতায় এসে তার সরকার রিজার্ভ পেয়েছিল প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের মতো, যেটাকে বাড়িয়ে তার সরকার প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে। আর ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে রিজার্ভ যেটা ৫ বিলিয়ন ডলার পেয়েছিল সেটাকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে। টিসিবি কার্ডের মাধ্যমে এক কোটি মানুষকে আমরা স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ করছি। ৫০ লাখ মানুষকে ১৫ টাকা কেজিদরে চাল সরবরাহ করছি। যারা একেবারে অপারগ তাদের বিনা পয়সায় খাবার দিচ্ছি। বিনামূল্যে ঘর তৈরি করে দিচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করছি। সেই সঙ্গে ৮ বিলিয়ন ডলার আমরা আলাদাভাবে বিনিয়োগ করেছি। আধুনিক বিমান ক্রয় করেছি। এটা আমাদের রিজার্ভের টাকা দিয়েই করেছি, অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার নিইনি। কারণ সেখানে ধার নিলেও সে টাকা সুদসহ শোধ দিতে হতো। সেই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিমান নিয়েছে এবং ২ শতাংশ সুদে সেই টাকা আবার ফেরত দিচ্ছে। ফলে দেশের টাকা দেশেই থাকছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির অনেক নেতা মানি-লন্ডারিংয়ের কথা বলেন, তারেক জিয়ার শাস্তি হয়েছে মানি-লন্ডারিং কেসে। তার বিরুদ্ধে আমেরিকা থেকে এফবিআইয়ের লোক এসে বাংলাদেশে সাক্ষী দিয়ে গেছে। মানি-লন্ডারিং কেসে সাত বছর সাজা, বিশ কোটি টাকা জরিমানা আর গ্রেনেড হামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাকারবারি তার জন্যও সে সাজাপ্রাপ্ত। যাদের নেতাই হচ্ছে খুন, মানি-লন্ডারিং ও অবৈধ অস্ত্র চোরাকারবারি মামলার আসামি। আর খালেদা জিয়া এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে সাজাপ্রাপ্ত।

উন্নয়নে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে বাংলাদেশ : বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজার বলেছেন, অসাধারণ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এটাকে তিনি উন্নয়নের একটি সফল ঘটনা হিসেবেও বর্ণনা করেন। এই উন্নয়ন প্রচেষ্টায় বিশ্বব্যাংকের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান রেইজার। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে মার্টিন রেইজার বলেন, ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি সফল ক্ষেত্র এবং একটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ তার উন্নয়নের মাধ্যমে চমক সৃষ্টিকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি হয়ে উঠছে।’

দুজনের মধ্যে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে মুক্ত ও স্বচ্ছ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।’

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম। তিনি জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংককে যুদ্ধ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের ফলে সংকটে সারা বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার দেশগুলোর নিজস্ব সম্পদ নিয়ে অভিযোজন ও প্রশমনে কাজ করছে। উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রী কানেক্টিভিটি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, তার সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে দেশের উন্নয়ন করছে এবং যাতে জনগণ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে উন্নত ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে পারে সেজন্য ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়ন করছে।

বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা রেইজার বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় তারা সমর্থন অব্যাহত রাখবেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তার সরকার সফলভাবে এমডিজি বাস্তবায়ন করেছে এবং এখন এসডিজি বাস্তবায়নে কাজ করছে।

বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যকার সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি যৌথভাবে উদযাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন মার্টিন রেইজার। তিনি ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি গণভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তোলা বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট স্ট্রেঞ্জ ম্যাকনামারার একটি ছবিও হস্তান্তর করেন।

এ সময় অন্যদের মধ্যে অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস এবং বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদৌলা সেক উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত