শৈশব কেটেছে রাস্তায়, সড়কগুলো মিস করেন মেসি

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২২, ০৮:২০ পিএম

কাতারে আর ৪ দিন পর শুরু হচ্ছে ফুটবল যজ্ঞ। ৩২ দলের অংশগ্রহণে গোটা বিশ্ব মেতে উঠবে ফুটবল উৎসবে। তার আগে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে সেক্রেড গেম। যেখানে তিনি কথা বলেছেন শৈশব, বার্সেলোন কাটানো সময়গুলো নিয়ে। এমনকি প্রিয় ক্লাব ছাড়ার কারণ নিয়েও কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন শৈশবে বেশিরভাগ সময় ফুটবল খেলতেন রাস্তায়। খেলার জন্য আর্জেন্টিনার সড়কগুলো তিনি খুব মিস করেন।  স্পেনিশ ভাষায় প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি দুই পর্বে দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।  

প্রশ্ন: শৈশব সম্পর্কে যদি বলতেন?

লিওনেল মেসি: আমার বাবা-মা একটি মেয়ে আশা করেছিলেন। আমার বাবা নিশ্চিত ছিলেন যে তার একটি মেয়ে হবে। তারা সেই মেয়ের জন্য একটি নামও বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি ছেলে হয়ে জন্ম নিলাম। আমি সবসময় বলতাম যে যখন আমি চার বা পাঁচ বছর বয়সের ছিলাম তখন আমি প্রিমিয়ার ডিভিশনে আসার সময় আমার একই স্টাইল ছিল। আমি সেটা শক্তিশালী ও উন্নত করেছি। আমি প্রতিদিন ভালো হওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি যা পেয়েছি তা ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

আমি যখন আর্জেন্টিনায় ছিলাম, সেখানে প্রশিক্ষণের সময় বল গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু যখন বার্সেলোনায় একাডেমিতে যোগ দিলাম, তখন ঠিকই প্রশিক্ষণে বলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ব্যক্তিগত ও ফুটবলের জন্য বার্সেলোনায় আসাটা আমার জন্য বিশাল একটা পরিবর্তন।

বোঝার বয়স যেদিন থেকে হয়েছে সেদিন থেকেই বল নিয়ে বড় হয়েছি। আমি পরিবারের সবার সঙ্গে খেলতাম। কারণ এটা আমি খেলতে ভালোবাসতাম। ভাইদের সঙ্গে খেলতে চাইতাম, কিন্তু তারা আমায় খেলায় নিত না। এতে রাগ করে তাদের সঙ্গে যে কতবার ঝগড়া করেছি, তার ইয়ত্তা নেই। তবে রাস্তা-ঘাটে যেখানে সুযোগ পেতাম, সেখানেই খেলতাম। বলা যায় আমার শৈশবটা রাস্তাতেই কেটেছে। বর্তমান জীবনে যা আমার জন্য খুব কঠিন।

আমরা স্থানীয় দলের হয় খেলতাম। আমরা কাজিনরা সবাই প্রায় সমবয়সী ছিলাম। আমার ঠাকুরমা আমাদের প্রশিক্ষণে নিয়ে যেতেন। একদিন তিনি এক কোচকে বলেছিলেন যে আমায় দলের সঙ্গে নেবেন কি না, সেই কোচ না বললে তিনি সেখান থেকে চলে যান।

পড়াশোনায় কেমন ছিলেন?

পড়াশোনায় আমি খুব আগ্রহী ছিলাম না। তবে আমি খুব শান্ত স্বভাবের ছিলাম। আর অলস থাকায় স্কুল আমায় বলেছিল পড়ায় ভালো না করলে তারা আমায় ফুটবল খেলতে দেবে না। এই ভয়ে আমি স্কুলে ভালো করতে বাধ্য হয়েছিলাম।

প্রথম ক্লাবের সঙ্গে স্মৃতি...

আমার বয়স যখন সাত কিংবা আট, তখন আমি প্রথমবার নিউয়েলস স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম খেলা দেখতে। সেখানে আমি যখন খেলা শুরু করি তখন আমার বয়স ছিল ৮। ১২ বছর বয়স অবধি আমি সাইড বেঞ্চে বসে থাকতাম। তার আগে ১১ বছর বয়স থেকে আমার আমার চিকিৎসা শুরু হয়। যা ছিল অনেক ব্যয়বহুল। যা আমার বাবার পক্ষে বহন করা কঠিন ছিল। সেজন্য আমি রিভার প্লেটে একটি ট্রায়াল দিয়েছিলাম, তারা আমায় বেছেও নিয়েছিল। তারা বলেছিল আমার চিকিৎসার খরচ বহন করবে। কিন্তু সেখানে যোগ দিতে হলে আমাকে নিউয়েলসের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হতো। তবে আমি সেই চেষ্টাও করিনি। কারণ আমি জানতাম, এটা অসম্ভব।

কোন মোহে বার্সেলোনায়?

আমি বার্সেলোনায় ১৫ দিন ট্রায়াল দিয়েছিলাম। শেষ দিনে আমাদের একটি খেলা ছিল। বার্সায় থাকাটা আমার জন্য অসাধারণ ছিল। তারা আমাকে কিট, বুট, পিচ দিয়েছে। প্রশিক্ষণ শুরুর সময় আমাকে একটি বল দেয়, যাতে আমি নিজে নিজে খেলতে পারি। যা আমি আগে কখনো দেখিনি। বিষয়টা আমাকে তাই দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। তবে আর্জেন্টিনার মতো খেলার জন্য রাস্তায় বের হওয়াটা খুব মিস করেছি।

দশ বা এগারো বছর বয়সী বাচ্চার জন্য বাইরে গিয়ে রাস্তায় খেলা আজ কঠিন। এখন যে অনিশ্চয়তা আসে এবং প্লেস্টেশন, আইপ্যাড ইত্যাদির মতো অন্যান্য জিনিস রয়েছে। যা শৈশবের আসল আনন্দগুলো কেড়ে নিয়েছে।

ফুটবলে আজকাল পরিবর্তন চোখে পড়ে?

আমি মনে করি বার্সেলোনায় আসার পর আমার ফুটবল দর্শনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অন্য একজন খেলোয়াড়কে অনুকরণ করে তার খেলা রপ্ত করা খুব কঠিন কাজ। একজন শিশুকে একটি নির্দিষ্ট উপায়ে খেলতে বলা হয়। আমার শৈশবে এসব আমি পেয়েছি। তবে আমি মনে করি ফুটবল প্রশিক্ষণে এসব অনুকরণীয় বিষয়গুলো হ্রাস পেয়েছে। ফলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দিন দিন আরও কৌশলী হচ্ছে খেলাটা। যে কোনো দল এখন দুর্দান্ত খেলোয়াড় ছাড়াই প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিস্থিতিকে কঠিন করে তোলে। কেবল কৌশলে ভাল খেলে শক্তিশালি একটা দল হওয়া যায়।

ফুটবল ছাড়া কি কখনও থেকেছেন?

ক্যারিয়ারের একটা স্তম্ভে কঠিন একটা সময় পার করেছি। চোট পেয়েছিলাম, তখন আমি ৬ মাস খেলা ছাড়াই চলেছি। ঐ সময় আবার আমার ভাই আর্জেন্টিনা ফিরে যায়। আমার ছোট বোনের বয়স তখন ছয় বা সাত। তাই এখানে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারিনি। পরিবার থেকে দূরে থাকা খুব কঠিন ছিল তখন। তবে একটা সময় বাবা বলেছিলেন, আর্জেন্টিনায় ফিরে যেতে। কিন্তু ততদিনে আমি বার্সেলোনায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি অনুভব করেছিলাম, পরিবার থেকে আলাদা হয়েছি ঠিকই কিন্তু ফুটবল ছাড়া আর আমি কিছু কল্পনা করতে পারতাম না।

প্রথম দলে প্রবেশের সময়...

তখন আমার বয়স ১৪ বছর। প্রথম বছরটি দুর্দান্ত ছিল। পরের বছরে আমি বয়স ভিত্তিক দলে জায়গা পাই। দুই বছরের মধ্যে আমি প্রথম দলের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগটাও পেয়ে যাই। বি দলের হয়ে খেলার সুযোগটাও চলে আসে দ্রুতই। আমি খুব সংগঠিত। তাই পরিকল্পনা ছাড়াই কিছু করা হলে আমি বিরক্ত হই।

এর আগে আমি চীন ও জাপানে রিজকার্ডের সঙ্গে প্রি-সিজন খেলেছি। দলে বেশি বিদেশি খেলোয়াড়ের জায়গা ছিল না। সেই সময় মার্কেজ, রোনালদিনহো এবং ইতো ছিলেন। আমি মনে করি, জুভেন্টাসের সঙ্গে সেই গ্যাম্পার সবকিছু বদলে দিয়েছিলেন। যেখানে আমি নিজের সেরাটা দিয়ে ক্লাবের নজর কেড়েছিলাম।

রোনালদিনহো, ডেকো, সিলভিনহো, জাভি, পুয়েল... সবাই আমাকে এতটাই যত্ন নিয়েছেন যে, প্রথম  থেকেই ঘরের মাঠে খেলার অনুভূতি কাজ করেছে। তারা আমার সঙ্গে যেভাবে মিশেছিল তা আশ্চর্যজনক ছিল। এরকম ড্রেসিংরুমে যাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু তারা এটাকে আমার জন্য স্বাভাবিক করে তুলেছিল।

আমি আমার বাবাকে বলেছিলাম যে আর্জেন্টিনার লোকেরা জানে যে আমি এখানে আছি তা নিশ্চিত করার জন্য আমাকে কিছু করতে হবে। জাতীয় যুব দলের সঙ্গে আমার দুটি বন্ধু ছিল। আমি প্রায় ১৭ বা ১৮ বছর বয়সে শুরু করেছি। আমি অনূর্ধ্ব-২০ দলের সঙ্গে ছিলাম। ২০০৫ সালের সেই টুর্নামেন্টে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত