বিএনপির গণসমাবেশ

সিলেটে বাস ধর্মঘটের ডাক হামলা হবিগঞ্জে

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২২, ০১:০২ এএম

বিএনপির সিলেট বিভাগীয় গণসমাবেশ ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। এই উত্তাপ সহিংসতায় রূপ নেয় কিনা এমন আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। এরই মধ্যে আগামী শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সমাবেশকে সামনে রেখে এর আগে হওয়া গণসমাবেশগুলোর মতো সিলেটেও পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সিলেটের গণসমাবেশ উপলক্ষে গতকাল বুধবার হবিগঞ্জে বিএনপির প্রস্তুতি সভায় পুলিশের লাঠিপেটায় ৩০ নেতাকর্মী আহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সন্ধ্যায় লাখাই উপজেলার বামই বাজারে এ ঘটনা ঘটে।   

বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, সিলেটের সমাবেশ ব্যর্থ করতে আওয়ামী লীগ ও কিছু অতি-উৎসাহী পুলিশ সদস্য বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে। একাধিক স্থানে বিএনপির প্রচার কাজে বাধা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলছেন, বিএনপির এসব আন্দোলনে জনসমর্থন নেই। তাই তাদের কথিত গণসমাবেশ নিয়ে আওয়ামী লীগের খুব একটা মাথাব্যথাও নেই। তাদের বাধা দেওয়ার কোনো প্রয়োজনও নেই।

গত মঙ্গলবার সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের চার শীর্ষ নেতাকে (উভয় শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) গণভবনে ডেকে কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিলেটের নেতাদের এই সাক্ষাৎ স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, বিএনপির সমাবেশ সামনে রেখে নিজেদের করণীয় সম্পর্কে দলীয় প্রধানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পেয়েছেন সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতারা।

তবে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিলেটে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে এবং আসন্ন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এজন্যই তাদের ডেকে নিয়েছিলেন।’

সমাবেশের প্রচার কাজ চালাতে গিয়ে গত মঙ্গলবার রাতে সিলেটের ওসমানীনগরে বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা হামলার মুখে পড়েন। তার গাড়িতে হামলা চালায় যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লুনার গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ছাত্রদলের দুজনকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। এ ঘটনায় গতকাল স্থানীয় যুবলীগ নেতা রিপন মিয়া বাদী হয়ে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩০০ জনের বিরুদ্ধে ওসমানীনগর থানায় মামলা করেছেন।

ওসমানীনগর থানার ওসি এসএম মাঈন উদ্দিন মামলা দায়েরের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে আটক ফয়ছল আহমদ লিমন ও নুরুল ইসলামকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’

গাড়িতে হামলার পর উল্টো বিএনপির ৩০০ জনের বিরুদ্ধে যুবলীগের মামলা দায়েরের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করে তাহসিনা রুশদী লুনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মঙ্গলবার শান্তিপূর্ণভাবেই আমরা সমাবেশের লিফলেট বিতরণ করছিলাম। একপর্যায়ে পুলিশের সামনেই আওয়ামী লীগের লোকজন আমার গাড়িতে হামলা করে। গাড়ি ভেঙে এখন আবার তারা মামলাও দিয়েছে।’

লুনা বলেন, ‘এভাবে হামলা করে, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে সরকার গণআন্দোলন ঠেকাতে পারবে না। সব বাধা ডিঙিয়ে সমাবেশ সফল করে সিলেটবাসী সরকারের প্রতি তাদের অনাস্থা জানাবেন।’

গতকাল বিকেলে সিলেট নগরীতে মোটরসাইকেলযোগে বড় ধরনের মহড়া দিয়েছে জেলা ও মহানগর যুবদল। তারা গণসমাবেশ সফলের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি যেকোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি এলে রাজপথেই তা মোকাবিলার ঘোষণা দিয়েছেন।

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে ও বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯ নভেম্বরের গণসমাবেশ সফলে নানা কৌশল গ্রহণ করেছে বিএনপি। সেই সঙ্গে প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখছেন না তারা। সমাবেশস্থল সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ ইতিমধ্যে তাদের দখলে। সেখানে বিশাল সভামঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। বিভাগের দূরবর্তী জেলা-উপজেলা থেকে আগেভাগেই সিলেটে আসা নেতাকর্মীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য নগরীর অন্তত ২৫টি কমিউনিটি সেন্টার তারা ভাড়া করেছেন। পাশাপাশি মাঠেই যাতে নেতাকর্মীরা রাতযাপন করতে পারেন সেজন্য তাঁবু তৈরি করা হচ্ছে।

গতকাল বিকেলে সরেজমিনে মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ত্রিপল টানিয়ে তাঁবু (ক্যাম্প) তৈরির কাজ চলছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬টি ক্যাম্প প্রস্তুত করা হয়েছে। কোন ক্যাম্পে কোন জেলার নেতাকর্মী থাকবেন সেটাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। মাঠে এসব কাজ তদারক করছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুল আহাদ খান জামাল ও মাহবুবুল হক।

সমাবেশের দিন পরিবহন ধর্মঘট : সিলেটে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে বিভাগের চার জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী-সমর্থক যোগ দেবেন বলে আশা করছেন দলটির নেতারা। কিন্তু সমাবেশের দিন পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করেছে সিলেট জেলা বাস মালিক সমিতি। গতকাল সন্ধ্যার পরে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।     

জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল কবির পলাশ ধর্মঘট আহ্বানের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘সিএনজিচালিত অবৈধ (নিবন্ধনহীন) অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা, বৈধ অটোরিকশায় গ্রিল স্থাপন ও নতুন করে অটোরিকশা নিবন্ধন দেওয়ার দাবিতে এই ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এই কর্মসূচি পূর্বনির্ধারিত। এর আগে এসব দাবিতে আমরা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। আন্দোলন করেছি। কিন্তু দাবি পূরণ না হওয়ায় আবারও ধর্মঘটের ডাক দিয়েছি। ১৯ নভেম্বর শনিবার সকাল ৬টা থেকে পরদিন রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ধর্মঘট পালিত হবে।’

বিএনপির সমাবেশে যাতায়াতকারীদের সমস্যায় ফেলতে কারও চাপে এই ধর্মঘট ডাকা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।

হবিগঞ্জে পুলিশের লাঠিপেটায় বিএনপির ৩০ নেতাকর্মী আহত : সিলেটের গণসমাবেশ উপলক্ষে গতকাল হবিগঞ্জে বিএনপির প্রস্তুতি সভায় পুলিশের লাঠিপেটায় ৩০ নেতাকর্মী আহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।  জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায় সম্পাদক জি কে গউছ বলেন, সিলেটের সমাবেশ সফল করতে লাখাই উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে গতকাল সন্ধ্যায় প্রস্তুতি সভার আয়োজন করা হয় স্থানীয় দারগ আলী মার্কেটের সামনে।  মাগরিবের নামাজ শেষে নেতাকর্মীরা সেখানে পৌঁছলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে লাঠিপেটা শুরু করে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশের লাঠিপেটার পর বিএনপি নেতাকর্মীরা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকলে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে।

ওসি চম্পক দাস জানান, বিএনপি কর্মীদের ইটপাটকেলে আট পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

আর বিএনপি নেতা জি কে গউছের দাবি, পুলিশের হামলায় তাদের ৩০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত