তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ১০ হাজার মানসিক রোগীর দেহ থেকে মস্তিষ্ক হাতিয়ে নিয়েছেন ডেনমার্কের একটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। এমনকি, এ বিষয়ে ওই রোগীদের পরিবারের অনুমতি পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। এমনই দাবি করল আমেরিকার সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
বেশ কয়েক বছর ধরে ডেনমার্কের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মানুষের মগজ চুরির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। বেশির ভাগ মানুষ এটিকে গুজব বলে বিশ্বাস করতেন। তবে সম্প্রতি বিষয়টি উদ্ঘাটিত হয়। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন এক তথ্যচিত্রে এ বিষয়টি তুলে ধরেছে।
সিএনএন জানায়, সম্প্রতি ডেনমার্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয় (নাম প্রকাশ করা হয়নি) ক্যাম্পাসের ভূগর্ভস্থ একটি ঘর থেকে বেশ কিছু মস্তিষ্ক উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে একটি গোপন সংরক্ষণাগারে মস্তিষ্কগুলো বাক্সবন্দি করে রাখা ছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর অভিযোগ উঠেছে, ডেনমার্কের একদল চিকিৎসক অন্তত ১০ হাজার মানসিক রোগীর মাথা থেকে মস্তিষ্ক সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু তাদের পরিবারের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনুমতি নেননি তারা।
তথ্যচিত্রটি গত ১২ থেকে ১৩ নভেম্বর সিএনএনে প্রচারিত হয়। তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রায় ৩৭ বছর ধরে ডেনমার্কের চিকিৎসকরা মস্তিষ্ক সংগ্রহের কাজ করতেন। মূলত সিজোফ্রেনিয়া ও নানা ধরনের মানসিক রোগে ভোগা ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের মস্তিষ্ক সরিয়ে নিতেন তারা। কিন্তু তারা এ বিষয়টি পরিবারের লোকজনকে জানাতেন না।
তথ্যচিত্রে দেখা যায়, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল কারস্টেন আবিলট্রাপ নামের এক শিশু। তাকে ভর্তি করা হয়েছিল নেদারল্যান্ডসের একটি মানসিক হাসপাতালে। শিশুটির মৃত্যুর পর চিকিৎসকরা তার মস্তিষ্ক সরিয়ে নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। সম্প্রতি ডেনমার্কের ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিশুটির মস্তিষ্ক উদ্ধার করা হয়েছে।
সিএনএন বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে চিকিৎসকদের সিজোফ্রেনিয়া রোগটি সম্পর্কে ধারণা ছিল না। তাই এরিক স্টর্মগ্রেন ও লারুস আইনারসন নামের দুই চিকিৎসক গোপনে মস্তিষ্ক সরানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। মরদেহের ময়নাতদন্তের সময় তারা মস্তিষ্ক সরিয়ে ফেলতেন। এরপর সেগুলো বাক্সবন্দি করে ফেলতেন। সিএনএনের তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, তারা গবেষণার উদ্দেশ্যে এই মস্তিষ্ক সংরক্ষণ করতেন কি-না, জানা যায়নি।
১৯৪৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ডেনমার্কের বিভিন্ন মানসিক হাসপাতালে যেসব রোগী মারা গেছেন, তাদের অর্ধেকেরই মস্তিষ্ক সরিয়ে নেয়া হয়েছিল বলে তথ্যচিত্রে অভিযোগ করেন ডেনমার্কের আর্থাস ইউনিভার্সিটির মেডিকেল সায়েন্সের ইতিহাসবিদ টমাস আর্স্লেভ।
সিএনএনের তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, ডেনমার্কের রিসকভ সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালের ইনস্টিটিউট অব ব্রেন প্যাথলজিতে এসব মস্তিস্ক নিয়ে গবেষণা চলত। প্রথম পাঁচ বছর এসব কাজ করতেন স্টর্মগ্রেন ও লারুস আইনারসন নামে দুই চিকিৎসক। পরে নাড এ লোরেনৎজেন নামে আরেক চিকিৎসক ওই ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তী তিন দশক তিনি মস্তিষ্ক সংগ্রহের কাজ করেন।
অর্থ সংকটে পড়ে ২০১৮ সালে সংরক্ষণাগারটি অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরিয়ে নেয়া হয়। তবে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, সিএনএনের তথ্যচিত্রে তা বলা হয়নি। সে সময় ইনস্টিটিউট অব ব্রেন প্যাথলজির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন মার্টিন ডব্লিউ নিয়েলসন। তিনি ‘ব্রেন কালেক্টর’ নামে পরিচিত।
তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, মস্তিষ্কগুলো অক্ষত রাখার জন্য ফর্মালডিহাইড নামক দ্রবণে ডুবিয়ে রাখা হতো। প্রতিটি পাত্রের গায়ে নম্বর লিখে রাখা হতো, যাতে কার মস্তিষ্ক কোনটি, তা শনাক্ত করা যায়। এভাবেই জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া মস্তিষ্কগুলো কোন্ কোন্ রোগীর। তবে ১ নম্বর মস্তিষ্কটি কার, তা এখনও জানা যায়নি।
সিএনএন জানিয়েছে, সম্প্রতি ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৯ হাজার ৪৭৬টি পাত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার পাত্রে ডিমেনশিয়া রোগীর মস্তিষ্ক পাওয়া গেছে। বাকিগুলো অন্যান্য রোগীর বলে ধারণা।
সিএনএনে তথ্যচিত্রটি প্রকাশের পর এটি নিয়ে রীতিমতো হইচই শুরু হয়েছে। অনেকে এটির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকেই মস্তিস্কগুলো পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি তুলেছেন। আবার অনেকেই এর জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
