আগের দিন থেকে সিলেট বিভাগ জুড়ে ডাকা পরিবহন ধর্মঘট এবং পথে পথে পুলিশি বাধা ডিঙিয়ে সমাবেশে বিপুল লোকসমাগম হয়। নৌকায়, মোটরসাইকেলে, হেঁটে সমাবেশে যোগ দেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। এই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে আর রক্ষা পাবে না। কারণ তারা তাদের ইচ্ছেমতো সংবিধান কাটাছেঁড়া করেছে। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তুলে দিয়েছে। এই সংবিধান আমরা মানি না।’ কেন্দ্র ঘোষিত ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার বিএনপির সিলেট বিভাগীয় এই গণসমাবেশ হয়। নগরীর চৌহাট্টায় আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বেলা সাড়ে ১১টায় সমাবেশ শুরু হয়ে চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা এবং সিলেট বিভাগের চার জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নেতারা বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশস্থল আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ আগের রাতেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মাঠে তাঁবু গেড়ে রাত কাটিয়েছেন বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা নেতাকর্মীরা। গতকাল সকাল থেকে খন্ড খন্ড মিছিল সহকারে সিলেট নগরী এবং আশপাশের উপজেলার বিএনপি নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে আসেন। দুপুরে প্রখর রোদের কারণে মাঠ কিছুটা ফাঁকা থাকলেও মাঠের চারদিকে গাছ ও বহুতল ভবনের ছায়ায় আশ্রয় নেন বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই আবার পূর্ণ হয়ে যায় মাঠ। একপর্যায়ে মাঠ ছাড়িয়ে জনসমাবেশ আশপাশের সড়কগুলোতে বিস্তৃত হয়। বিএনপি নেতারা দাবি করেছেন, সমাবেশ উপলক্ষে সিলেটে চার লাখ লোকের সমাগম হয়েছে। তবে সরকারের চাপে বিভাগ জুড়ে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা না হলে এবং পুলিশ বাধা না দিলে লোকসমাগম আরও বেশি হতো। বিএনপি নেতারা বলেন, ‘সমাবেশ ব্যর্থ করতে সরকার সবরকম অপচেষ্টা চালিয়েছে। এমনকি শনিবার সকাল থেকে সিলেটে মোবাইল ফোনের থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সমাবেশস্থলের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার বিঘ্নিত হয়। এতে সমাবেশস্থলের বিপুল লোকসমাগম ও নেতাদের বক্তৃতা সরাসরি দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বাইরের নেতাকর্মীরা।’ অবশ্য এতকিছুর পরও সমাবেশ সফল হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিএনপি নেতারা।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, ‘এখন আমাদের এক দফা এক দাবিÑ সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বাচন দিতে হবে। এই দাবি কেবল বিএনপির নয়, ভোটের অধিকার হারানো সকল মানুষের। তাই জনগণের এই দাবির বিপক্ষে যারা অবস্থান নেবে তারা গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত হবে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘গত ১৪ বছরে এই সরকার বাংলাদেশকে আবার তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছে। মানুষের সব অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এই অপরাধে জনগণের আদালতে সরকারের বিচার হবে।’ মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই সিলেট থেকেই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেখান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। আজকে এই স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র ফেরাতে এই সিলেট থেকেই আবার যুদ্ধ শুরু হলো।’ তিনি বলেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক-শ্রমিক শান্তিতে নেই। গতকালও চিনির দাম, তেলের দাম বেড়েছে। সবকিছুর দাম বেড়েছে। মানুষ এখন খেতে পারে না। তিন কোটি মানুষ বেকার। তাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে।’ সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা একটি যুদ্ধ শুরু করেছেন। এই যুদ্ধ মুক্তির যুদ্ধ, অধিকার ফিরে পাওয়ার যুদ্ধ, ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার যুদ্ধ। সিলেটের ইতিহাস হচ্ছে যুদ্ধের ইতিহাস, যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস।’
ফখরুল বলেন, ‘সরকার এখন আবার মামলা-মামলা খেলা শুরু করছে। কোনো কিছু ঘটেনি। তবু তারা নাশকতার কথা বলে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। আবার হুমকি দেয়, হেফাজতের মতো অবস্থা হবে। হুমকি-ধমকিতে আর কাজ হবে না। জনগণ আজ জেগে উঠেছে। তারা বিজয় ছাড়া ঘরে ফিরে যাবে না।’
ফখরুল বলেন, ‘আমরা দেশে শান্তি চাই। অশান্তি চাই না। আমাদের দাবি এক সরকারের পতন চাই। রাজপথেই এর ফয়সালা হবে।’
প্রধান বক্তার বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘সরকার পুলিশ ও পেটোয়া বাহিনী দিয়ে হামলা করে, বাস-ট্রাক বন্ধ করে সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জনগণকে আটকে রাখতে পারেনি। তারা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। জনগণ বিশাল সমাবেশ করেছে। বাস-ট্রাক বন্ধ করে প্রতিদিন দেশের কত কোটি টাকার ক্ষতি করা হলো তার জবাব সরকারকে দিতে হবে।’
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ্য করে গয়েশ্বর বলেন, ‘তিনি বলছেন খেলা হবে। কিন্তু দরজা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে যে খেলা, এটা ছাড়া আর খেলা তিনি জানেন না। বিএনপি আনাড়ি খেলোয়াড়দের সাথে খেলে না। খেলা শিখে আসেন। নিরপেক্ষ সরকার নিয়ে খেলেন। শেখ হাসিনাও জামানত হারাবেন।’
গয়েশ্বর রায় বলেন, ‘১০ ডিসেম্বরের পর সরকার পতনের আন্দোলনে নামব। সাহস থাকলে ক্ষমতা ছাড়েন। জিয়াউর রহমান খুনের সাথে শেখ হাসিনা জড়িত কি না তা আমরা খুঁজে বের করব। সব গুম-খুনের বিচার হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে অন্যায়, অত্যাচার জুলুম, নির্যাতন চলছে। বিএনপি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। আমরা জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেব। দিনের ভোট আর রাতে করতে দেওয়া হবে না।’
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মিফতাহ সিদ্দিকীর পরিচালনায় সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, তাহসিনা রুশদীর লুনা, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকী প্রমুখ। সমাবেশে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় সিলেট বিভাগের চার জেলার নেতারাও বক্তব্য রাখেন।
