কাতার বিশ্বকাপে সম্প্রীতির বার্তা ও বিতর্ক

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ১২:৩৬ এএম

পারস্য সাগর উপকূলের ছোট দেশ কাতার। বৃহৎ প্রতিবেশী সৌদি আরব ও ইরানের মাঝখানে বিশ্বমানচিত্রে খুঁজে পাওয়া দায়। মরুর বুকে বিস্ময় সে কাতার আয়োজন করেছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আসর ফুটবল বিশ্বকাপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশকে বিটে হারিয়ে আয়োজক দেশের মর্যাদা আদায় করেছিল দেশটি। অভিযোগ ওঠে রাজপরিবার টাকার বিনিময়ে বিশ্বকাপ আয়োজন বাগিয়ে নিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে ফিফা। শেষ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনে তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে প্রথম বিশ্বকাপ, আরব বিশ্বেও প্রথম, কিন্তু কাতারের এই অর্জনে খুশি ছিল না মোড়ল প্রতিবেশী সৌদি আরব। ২০১৭ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন ‘কাতার অবরোধে’ কাতারকে কাবু করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আয়োজক দেশের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। আবহাওয়া, মানবাধিকারসহ নানা ইস্যুতে সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জে পড়তে হয় কাতারকে। কিন্তু সব ছাড়িয়ে কাতার একটি শুভ সূচনা করেছে।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য : নিঃসন্দেহে এশিয়া, ইউরোপ বা আফ্রিকায় তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি রয়েছে, নিজ নিজ মূল্যবোধ রয়েছে, তেমনি আরব বিশ্বেরও। ভারতের বড় বড় শহরগুলোতে গরু হেঁটে বেড়াচ্ছে, ইউরোপের পার্কে পোষা কুকুর থাকছে, আরবে উট’কে প্রিয় পশু হিসেবে সমাদর করা হচ্ছে এই প্রত্যেকটা অনুভূতিকে তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ দিয়ে ভাবতে হবে। নৃবিজ্ঞানী আর বি টেইলর বলেছেন, ‘প্রতিটি সংস্কৃতির প্রথা ও রীতিনীতিসমূহকে সংস্কৃতির বাস্তবতার নিরিখেই মূল্যায়ন করতে হবে।’ ভিন্ন সংস্কৃতিকে গ্রহণ না করা ও শ্রদ্ধা না করা থেকে মূলত জেনোফোবিয়া তৈরি হয়। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, প্রথা ও মূল্যবোধের সঙ্গে একে অপরের পরিচয় ঘটানোর জন্য বিশ্ব ক্রীড়া আসরগুলোর আয়োজন হয়ে থাকে। ফলে কাতারে টুর্নামেন্ট উদ্বোধন যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতির মতো হবে না এটাই স্বাভাবিক। কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কাতারের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের আলোকে গ্রহণ করতে হবে, ইউরোপীয় মানদন্ডে নয়। 

ঐক্যের বার্তা : উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চমৎকার উদার আহ্বান রেখেছে কাতার। অনুষ্ঠানের একটি মুহূর্তে মার্কিন অভিনেতা মরগান ফ্রিম্যান হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিশেষভাবে সক্ষম কাতারের কিশোর তারকা ঘানিম আল মুফতাহ’র দিকে। ঘানিম কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। একজন বিশেষভাবে সক্ষম কিশোরকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করে কাতার বিশ্বের বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার বার্তা দিয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মরগান ঘানিমকে জিজ্ঞেস করেন ‘আমাদের কাছে যতবেশি একত্র হওয়ার উপাদান তার চেয়ে বেশি আলাদা হওয়ার উপাদান, আমরা কীভাবে সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারি?’ কাতারি কিশোর জবাব দেয়, ‘একমাত্র সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা আমাদের এক ছাদের নিচে রাখতে পারে।’ তাদের এই আলোচনা পূর্ব-পশ্চিমের একটি সেতুবন্ধ আলোচনারূপে উপস্থাপিত হয়েছে। পশ্চিমের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা পূর্বের একজন বিশেষভাবে সক্ষম কিশোরের সঙ্গে বিশ্বশান্তি নিয়ে আলোচনা করছে, এরচেয়ে দৃঢ় বার্তা আর কী হতে পারে? এটাই কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর থিম ডায়লগ হিসেবে অক্ষয় হয়ে থাকবে।

কাতারি কিশোর পবিত্র আল কোরআনের সুরা আল হুজরাতের ১৩ নম্বর আয়াতও পড়ে শোনায়। এই আয়াতটির অর্থ, ‘হে মানুষ আমি তোমাদের সবাইকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো।’ এই আয়াত মূলত ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ বা ‘ইউনিটি ইন ডাইভারসিটি’ দর্শনের কথাই বলছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যখন এই বার্তা প্রচারিত হচ্ছিল তখন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ ও তার পিতা ও কাতারের জাতির জনক শেখ হামাদ বিন থানি। মঞ্চের প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন সৌদি যুবরাজ সালমান, জাতিসংঘের মহাসচিব, মিসর, তুরস্ক, ও আলজেরিয়া ও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট। যে সৌদি আরব কাতারকে বিশ্বমঞ্চ থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল সে সৌদি আরবের যুবরাজকে পাশে বসিয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় সহনশীলতার বার্তা দিয়েছে কাতার।

অনন্য কাতার : শুধু ফুটবল আয়োজন নয়, এর আগে থেকেই ধীরে ধীরে বিশ্বের বুকে একটি কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী ও শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে মাত্র ৩ লাখ জনসংখ্যার কাতার। লেবানন, ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া, লিবিয়া, সুদানসহ বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যস্থতা করেছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র- তালেবান শান্তি প্রক্রিয়ার মূল সঞ্চালক ছিল কাতার। মূলত কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। এছাড়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজক ছিল কাতার। বর্তমানে তুরস্ক-সৌদি আরব, ইরান-সৌদি আরব বিরোধ নিষ্পত্তির প্রস্তাবও দিয়ে রেখেছে দেশটি। কাতারের এসব মধ্যস্থতার ভূমিকায় সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করছে কাতারের মালিকানাধীন নিউজ মিডিয়া ‘আলজাজিরা’। তেল ও গ্যাসে কাতারের অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠলেও এয়ারলাইনস ও ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবে রয়েছে তাদের বিশাল বিনিয়োগ। রূপকল্প ২০৩০-এর অংশ হিসেবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় বিশেষ অবস্থান করে নেওয়ার পরিকল্পনা কাতারের। বিশ্বের টপ র‌্যাংকিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শাখা রয়েছে কাতারে। এখন সেসব বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটদের ৪২ শতাংশই নারী। এছাড়া ‘কাতার ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে বিশ্বের নানা জায়গায় চ্যারিটি করা হচ্ছে। এসবের মূল ভাবনায় আছেন সাবেক আমির শেখ হামাদের স্ত্রী ও বর্তমান আমিরের মা শায়খা মোজাহ।

তবু ষড়যন্ত্রের যেন শেষ নেই : সৌদি আরবের ব্রিটিশ সেন্টারে স্ট্র্যাটেজিক রাজনীতি বিশ্লেষক আমজাদ তাহা দাবি করেছেন কাতার ও ইকুয়েডর ম্যাচটি ফিক্সড। ম্যাচে যেন ইকুয়েডর হেরে যায় তার জন্য ইকুয়েডরের চারজন ফুটবলারকে ঘুষ দেওয়া হয়। ৯২ বছরের বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাসে প্রথম স্বাগতিক দেশ হিসেবে হেরে গিয়ে কাতার সে গুজবের জবাব দিয়েছে। এই বিশ্বকাপে কাতার খরচ করেছে প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার। প্রথম ম্যাচে যে ইকুয়েডর কাতারকে হারিয়েছে তাদের জিডিপি মাত্র ১০০ বিলিয়নের কিছু বেশি আর ২৫ শতাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এই দারিদ্র্যপীড়িত ইকুয়েডর অনায়াসে হারিয়ে দিল এক বিশ^কাপেই ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলা একটি ধনী দেশকে। এটাই ফুটবলের সৌন্দর্য। প্রতিবেশী থেকে যখন গুজব রটানো হচ্ছিল তখন কাতারের আমির স্বাগত বক্তব্যে বলছিলেন, ‘বিশ্ববাসী আপনাদের কাতারে স্বাগত, আরব বিশ্বে স্বাগত।’

মানবাধিকার বিতর্ক : কাতারের বিরুদ্ধে স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় শ্রমিকদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের। এই অভিযোগে বিবিসি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করেনি। কাতার নয় শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। নিউ ইয়র্ক থেকে সিডনি, দোহা থেকে দুবাই বড় বড় ইমারত নির্মাণ হয়েছে শ্রমিকদের ঘামে-রক্তে। শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে পুঁজিপতিদের পুঁজি জ্যামিতিক হারে বেড়েছে এসব দেশে। প্রত্যেক সিভিলাইজেশনের রয়েছে শ্রমিক শোষণ করার নিষ্ঠুর ইতিহাস। মুঘল সাম্রাজ্যের কালজয়ী নিদর্শন তাজমহল নির্মাণেও শ্রমিকদের অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল। আবার মুঘল সাম্রাজ্যের মূল্যবান রতœ লুট করেছিল ব্রিটিশরা। এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার বহু দেশকে শোষণ-শাসন করেই আজ ইউরোপ-আমেরিকা এত সমৃদ্ধ হয়েছে। ইউক্রেনীয় রিফিউজিদের প্রতি ইউরোপের যে ব্যবহার ছিল সিরিয়ান রিফিউজিদের প্রতি তা ছিল না। আবার ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইউক্রেনীয় শিক্ষার্থীদের ইউরোপের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলেও তাদের অ-ইউরোপীয় সহপাঠীদের পাঠানো হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে। এখানে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ইউরোপের চিত্রই স্পষ্ট হয়। কিন্তু ইউরোপীয়দের সেকালের কলোনিয়ালিজমের অপরাধের কারণে এখনকার ইউরোপ মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে যে অবস্থান নিয়েছে তা খারিজ করা যায় না। কাতার একটি সুন্দর ও নির্র্মোহ আয়োজন করেছে বলে তার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মজুরি ও নির্মাণকাজে নিহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না তা নয়।

আসলে এসব ক্ষেত্রে তুলনামূলক আলোচনা বরং ঘটনার ভয়াবহতাকে হালকা করে দেয়। কাতার ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে পেরেছে কিন্তু নির্মাণ শ্রমিকদের ইন্স্যুরেন্স কেন দিতে পারবে না, কেন নিহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেবে না!  বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রয়েছে কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সে। এখনো দক্ষিণ এশিয়ার লাখ লাখ পরিবারে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স না এলে ঈদ, পূজা, দিওয়ালিতে নতুন জামা জোটে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব শ্রমিক অদক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন হওয়ার কারণে তারা ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, ইন্স্যুরেন্স সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম আইন ও অভিবাসন আইন নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কাতার একটি স্ট্যান্ডার্ড ও জবাবদিহিমূলক শ্রমিক ও অভিবাসী আইন প্রণয়ন করলে বিশ্বের বুকে কাতারের অবস্থান আরও অনন্য হয়ে উঠবে।

লেখক: কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত