২০০৮ সালে লালদীঘির মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজ হাতে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই ঘোষণা যে তিনি কথার কথা দেননি, তার প্রমাণ রেখেছেন নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর। উন্নয়নের কার্যক্রম নিজ হাতে করতে নিজের দলীয় মানুষকে বসিয়েছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান পদে। এই পদে সরকারের বিভিন্ন ক্যাডারের লোকজন ডেপুটেশনে থাকত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বপ্রথম এই পদে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর তার হাত দিয়ে সর্বপ্রথম বহদ্দারহাট মোড়ে ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিলেন। শুধু সিডিএ নয়, চট্টগ্রামের আরেকটি সংস্থা চট্টগ্রাম ওয়াসায় সরকারের প্রশাসনের কর্মকর্তারা ডেপুটেশনে চেয়ারম্যান পদে থাকত। এই পদেও একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর গত ১০ বছরে এই দুই সংস্থার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সিডিএ’র মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার মাধ্যমে নগরীতে সুপেয় পানি নিশ্চিত করা হলেও অর্থনীতির প্রবেশদ্বার খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া হয়েছে অনেকগুলো প্রকল্প। কর্ণফুলী নদী ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্য রক্ষার পাশাপাশি নতুন লাইটার জেটি (ছোট জাহাজ ভেড়ানোর ঘাট) নির্মাণ করা হয়েছে সদরঘাটে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে ২০০৭ সালে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নির্মাণের পর এ বছর নির্মিত হলো পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। নির্মাণের পথে রয়েছে আগামীর বন্দর খ্যাত বে-টার্মিনাল এবং মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। এই গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর রিজিওনাল হাব হয়ে উঠছে।
টানেল আর স্বপ্ন নয়, নতুন বছরে চলবে গাড়ি : কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের সেই ঘোষণার পর অনেকে তা স্বপ্ন কিংবা অলীক ঘোষণা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে চীনা অর্থায়নে নির্মাণকাজ শেষ করে তা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। গত ২৬ নভেম্বর একটি টিউবের পূর্ত কাজ শেষের উদ্বোধন হলো এবং দ্বিতীয়টা শেষ হলেই নতুন বছরে গাড়ি চলাচল করবে। এ বিষয়ে চিটাগাং চেম্বারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে ওয়ান সিটি টু টাউনের আদলে কর্ণফুলী নদীর অপর পারে (দক্ষিণ অংশ) এখন শিল্পায়ন ও নগরায়ণ হবে।’
জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্প : ২০১৭ সালে যখন জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়, তখনই তা ইতিহাস হয়ে যায়। চট্টগ্রামের মানুষের জন্য এত বড় বাজেটের কোনো প্রকল্প আগে নেওয়া হয়নি। প্রতিবছর বর্ষা এলেই বৃষ্টিতে জলমগ্ন নগরীতে পরিণত হতো চট্টগ্রাম। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সিডিএ’র মাধ্যমে প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরকে। গত বছর এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও সময় ও বাজেট বাড়ানো হয়। নগরবাসীর প্রত্যাশা, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত সাগর পাড়ে আউটার রিং রোড বাস্তবায়নের পাশাপাশি পাহাড়ের ভেতরে দিয়ে বায়েজীদ বাইপাস নামে আরেকটি রোড চালু হয়েছে। এই দুই রোড নেটওয়ার্ক নগরীকে বৃত্তাকারভাবে যুক্ত করেছে। আউটার রিং রোড দিয়ে টানেল হয়ে কক্সবাজারমুখী গাড়িগুলো যাতায়াত করতে পারবে। অপরদিকে বায়েজীদ বাইপাস হয়ে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিমুখী গাড়িগুলো চলাচল করতে পারবে। এই দুই রোডের পাশাপাশি লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শহরের ভেতর দিয়ে দ্রুত যান চলাচলে সহায়তা করবে। ইতিমধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল কাজ শেষের পথে।
৩৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর : উপমহাদেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল খ্যাত ‘বঙ্গবন্ধু শিল্প নগর’। সাগরের বুকে জেগে ওঠা প্রায় ৩০ হাজার একর ভূমিতে দেশের আগামীর অর্থনীতির ভিত হিসেবে গড়ে তুলতে ২০১৮ সালে কাজ শুরু হয়। এ পর্যন্ত ১৩৬টি প্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ১৭টি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলছে। ইতিমধ্যে ৪টি (এশিয়ান পেইন্টস কারখানা, সামুদা কনস্ট্রাকশন, ম্যাকডোনাল্ড ও জাপানের নিপ্পন কোম্পানি) প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে পণ্য উৎপাদন শুরু করেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক জোন অথরিটির (বেজা) তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠতে থাকা এই শিল্পনগর হবে আগামীর অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার পশ্চিমে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গড়ে উঠছে উপমহাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর। বঙ্গোপসাগর থেকে উপকূলের দিকে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, ৩৫০ মিটার চওড়া ও ১৬ মিটার গভীরতায় ড্রেজিং করে নির্মাণ করা হয়েছে নীল জলরাশির এই জেটি (জাহাজ ভেড়ানোর ঘাট)। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০২৬ সালে জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ যথাসময়ে শেষ করতে পারব। আর এটি হলে চট্টগ্রাম বন্দর সক্ষমতায় আরও এগিয়ে যাবে।’
বন্দরের বিদ্যমান চ্যানেল (যে পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করে) দিয়ে এখন ৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ছে জেটিতে। তবে আগামীতে ১৬ মিটার ড্রাফটের বেশি জাহাজ ভিড়বে। আর এতেই গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা পাচ্ছে এই বন্দরটি। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্মিত এই প্রকল্পের বাজেট ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
আগামী বছর ট্রেন যাবে কক্সবাজার : দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের আওতায় ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে আগামী বছরের মাঝামাঝিতে। এখন পর্যন্ত ৭২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আগামী বছরের শেষ নাগাদ ট্রেন চলাচল করতে পারে। নির্মাণ কার্যক্রম প্রায় শেষের পথে।’ কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ চালু হলে পর্যটন খাত ছাড়াও লবণ, মৎস্য, কৃষিসহ অন্যান্য খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম পর্যন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেলপথ নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার এবং রামু থেকে কক্সবাজার ১২ কিলোমিটার। তবে আপাতত রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার রেললাইনের কাজ হচ্ছে না। ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকারর প্রকল্পের অর্থায়ন করেছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার।
ওয়াসার স্যুয়ারেজ ও সুপেয় পানি প্রকল্প : ১৯৮৭ সালের পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ওয়াসা কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ওয়াসায় চেয়ারম্যান পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগদানের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৩৮ কোটি লিটার পানি উত্তোলনের তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার স্যুয়ারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। কর্ণফুলী নদীর ওপারে বোয়ালখালীর ভান্ডালজুড়িতে আরও একটি প্রকল্প থেকে দৈনিক ৬ কোটি লিটার পানি উৎপাদনে আসছে আগামী বছর। সেই পানি যাবে বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলায়।
বাকি মেট্রোরেল ও কালুরঘাট সেতু : চট্টগ্রামে মেট্রোরেলের কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেকবার বলেছেন। তা নিয়ে কিছুটা অগ্রগতিও হয়েছিল। তবে সর্বশেষ অগ্রগতি হলো গত ২২ নভেম্বর একনেক সভায় মেট্রোরেলের সমীক্ষার জন্য ৭০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে একনেক সভায় তিনি অনুমোদন দিয়েছেন। এই সমীক্ষার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত হবে মেট্রোরেলের ভবিষ্যৎ। অপরদিকে কালুরঘাট সেতুর কথা অনেক বলেছেন বোয়ালখালীর প্রয়াত সংসদ সদস্য মাঈনুদ্দিন খান বাদল। কিন্তু তিনি জীবদ্দশায় এই সেতুর কাজ দেখে যেতে পারেননি। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কালুরঘাট সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত দিলেও ডিজাইন জটিলতায় আটকে রয়েছে।
এ বিষয়ে চিটাগাং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামের একটি সেতু এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে, সেটি হলো কালুরঘাট সেতু। এ ছাড়া চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে নেওয়ার পর অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। আর এগিয়ে নেওয়ার এই ধারা অব্যাহত রাখতে দ্রুত বে-টার্মিনালের কাজ শুরু করতে হবে। এটা ছাড়া আগামীর চট্টগ্রাম তথা দেশের উন্নয়ন থমকে যেতে পারে।’
একই মন্তব্য করেন চিটাগাং চেম্বারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আধুনিক চট্টগ্রামের জন্য এখন মেট্রোরেল প্রয়োজন। ঢাকায় চালু হয়ে গেছে, চট্টগ্রামে এখনই কাজ শুরু করতে হবে। তবে আশার কথা ইতিমধ্যে সমীক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’