গতিবারুদ এমবাপ্পে কি ভাঙবেন সেসনি দেয়াল

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:০৪ এএম

কিলিয়ান এমবাপ্পে

সবার চোখ মেসি-নেইমার-রোনালদোতে। অথচ এমবাপ্পে যে তাদের পেছনে ফেলে ছুটছেন সে খবর কি আছে? বয়স মাত্র ২৩ অথচ বিশ্বকাপে নিজের নামের পাশে ৭ গোল বসিয়ে ফেলেছেন। এই আসরে ইতিমধ্যে ৩ গোল নিয়ে সেরা স্কোরারও। বিশ্বকাপও জিতেছেন ওই ছোট বয়সেই। কিন্তু বয়সটা কাঁচা বলে ভুলও আছে এমবাপ্পের। পিএসজি তারকার ভুলেই গত ইউরো থেকে শেষ ১৬-তেই বিদায় নিয়েছিল ফ্রান্স। পোল্যান্ডের বিপক্ষে আজকের ম্যাচে আবারও শেষ ১৬ ফ্রান্স ও এমবাপ্পের সামনে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের প্রায়শ্চিত্ত এবার করতে হবে এই ফরোয়ার্ডকে।

চার বছর আগে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করাদের একজন হয়ে যান এমবাপ্পে। তাও কিশোর বয়সে একমাত্র ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের পর। বিশ্বকাপে যে কাজটি করে দেখাতে পরেননি মেসি-রোনালদো।  নেইমার তো তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলছেন। তার সামনে সুযোগ আছে। এবার নেইমারকে পেছনে ফেলেই এগিয়েছেন এমবাপ্পে। ডেনমার্কের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে জোড়া গোল করে মোট ৭ গোল পূর্ণ করেন। বিশ্বকাপে নেইমারের ৬ গোল। এখন ৭ গোল নিয়ে লুইস সুয়ারেজের পাশে এমবাপ্পে। এরপরই মেসি ও রোনালদো দুজন। পোল্যান্ডের বিপক্ষে ১ গোল পিএসজি ফরোয়ার্ডকে বিশ্বের সেরা দুজনের পাশে রাখবে। আর এক গোল তাদের টপকে এগিয়েও দেবে। নিশ্চিতভাবেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলস্কোরার মিরোসøাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভাঙার যোগ্যতা শুধু এমবাপ্পেতেই আছে। গ্রুপের শেষ ম্যাচে তিউনিশিয়ার বিপক্ষে বিশ্রামে ছিলেন। বদলি হয়ে নেমেও গোল পেয়েই যাচ্ছিলেন প্রায়। এমন ছুটন্ত পারফরমারকে পোল্যান্ড রুখবে কী করে।

পিএসজিতে মেসি ও নেইমারের ছায়ার নিচে পড়ে থাকেন বলে নিজের আসল খেলাটা দেখাতে পারেননি অনেক সময়। তবে বিশ্বকাপে এমবাপ্পের সেই সমস্যা নেই। আসরের আগে ফ্রান্সের এক নম্বর নাম্বার নাইন করিম বেনজেমা ইনজুরিতে পড়ায় পুরো লাইমলাইট চলে আসে এমবাপ্পের ওপর। এখন একক রাজত্বে বেশ সফলও হচ্ছেন। তাই তরুণ এই স্ট্রাইকারের ওপরই ফ্রান্সের মূল ভরসা। পেলে যেমন ১৯৬২-তে শেষবার টানা বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব ব্রাজিলকে এনে দিয়েছেন, এমবাপ্পেও এবার তা করে দেখাবেন!

কোচ দিদিয়ের দেশমের বিশ্বকাপ এমবাপ্পের সেই যোগ্যতা হয়েছে। গত বিশ্বকাপের এমবাপ্পের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে কোচ বলেন, ‘পিএসজির বিষয় নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই। সেখানে ভালো করা বা ফ্রান্সের করিমের সঙ্গে তুলনা এসব ওর মাথায় নেই। ওর মধ্যে অহং নেই। ওর পারফরম্যান্সই ওকে কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সে এখন আর ১৮ বছরের না। অনেকটাই অভিজ্ঞ। অবশ্যই সে এই বিশ্বকাপে আমাদের মূল ফুটবলার।’ শুধু বিশ্বকাপের গোলের দিক থেকেই নয়। এই তরুণ বয়সেই ফ্রান্স কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানকেও গোলের দিক থেকে ছুঁয়ে ফেলেছেন এমবাপ্পে। ১০৬ ম্যাচ খেলা জিদানের গোল সংখ্যা ৩১টি। এমবাপ্পে মাত্র ৬১ ম্যাচে এই সংখ্যা ছুঁয়েছেন। তাই দেশম সবাইকে এমবাপ্পের বয়স নিয়ে আর কথা না বলার অনুরোধ করেন, ‘আপনারা দেখবেন সে ফ্রান্স গ্রেটদের পেছনে ফেলেছে। এখন সে জিদানের পাশে। গোলের দিক থেকে এইসব কিন্তু বিরাট অর্জন। এত ছোট বয়সেই সে এই অর্জনগুলো পেয়েছে। যেহেতু এই পর্যন্ত এসেছে তাই ওর যথেষ্ট পরিপক্বতাও হয়েছে। তাই ওর বয়স নিয়ে আর কথা না বলাই ভালো।’ ১৯৮২ বিশ্বকাপের পর ফ্রান্স-পোল্যান্ড এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে। এই ম্যাচে এমবাপ্পে যে ফলাফলে বিরাট ভূমিকা রাখবেন তা বিশ্বাস করেন অপর ফরোয়ার্ড অ্যান্তোইন গ্রিজমানও। তরুণ সতীর্থকে ধরাছোঁয়ার বাইরে উল্লেখ করে গ্রিজমান বলেন, ‘২০১৮ সালে সে যেমন ছিল এখন সেই একই এমবাপ্পে নেই। খুব বড়ভাবেই সে এখন দলের অংশ। সবার সঙ্গে কথা বলে, মজা করে। সে জানে মিডিয়া, সমর্থক এমনকি আমরাও তার দিকে তাকিয়ে। সে যা করবে সব কিছুই ধরা পড়বে কিন্তু আমি বলব এমবাপ্পে ধরাছোঁয়ার বাইরে।’

ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এমবাপ্পে সত্যিকার গোলাবারুদ। বল পায়ে পড়লেই তার ডান প্রান্ত দিয়ে ডি বক্সে ঢুকে পড়া এবং মুহূর্তেই অদৃশ্য শট নেওয়া যে কোনো দলের জন্যই বিপদ। আজ সেই বিপদে পড়তে যাচ্ছে পোল্যান্ড।

ওজিয়েচ সেসনি

সবসময় এমন হয় না। এক দল বড় কোনো আসরে ভালো করছে আর বাহবা পাচ্ছেন একজন গোলকিপার। পোল্যান্ডের জন্য এবার কিন্তু এই ব্যতিক্রমটাই হচ্ছে। আর নির্দিষ্ট করে বললে ওজিয়েচ জেসনি। ১৯৮৬ সালের পর প্রথম বার শেষ ১৬-তে পা রাখায় পোল্যান্ডের এই গোলরক্ষককেই ধন্যবাদ দিতে হচ্ছে। অথচ আগের টুর্নামেন্টগুলো সবসময় বাজে কেটেছে সাবেক আর্সেনাল তারকার। লাল কার্ড, ইনজুরি, আত্মঘাতী গোল বিভিন্ন টুর্নামেন্টে নানা কান্ড বাধিয়ে বসেন জেসনি। অথচ এবার পুরো ব্যতিক্রম ও নায়কের চেয়ারে। ২০০২’র পর এক বিশ্বকাপে দুটো পেনাল্টি ফিরিয়ে দেওয়া প্রথম গোলরক্ষক হওয়ার গৌরব নিয়ে এবার বিশ্বের অন্যতম সেরা তরুণ ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পেকে রুখতে নামবেন জেসনি।

আগের আসরগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে বিশ্বকাপের শুরুতে একজনের প্রশ্ন ছিল এবার কী করবেন? জেসনির উত্তর, ‘প্রতি আসরের কিন্তু আলাদা ইতিহাস থাকে।’ সত্যি হতাশার অতীত ভুলে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন জেসনি। জুভেন্তাস তারকা প্রথম রাউন্ডে সৌদি আরবের বিপক্ষে সালেম আল-দাওসারির পেনাল্টি আটকে দেন। ওই ম্যাচেই দুটো অবিশ্বাস্য সেভও করেন। শেষে জেসনি বলেছিলেন, ‘গোলকিপারদের জন্য এমন কিছু করা আনন্দের। কারণ আমরা তো আর গোল করে হিরো হতে পারি না। গোলের বড় সেভ করেই দলের হয়ে ভূমিকা রাখি।’

তবে জেসনির ইচ্ছে ছিল পৃথিবীর সেরার মুখোমুখি হওয়া। গ্রুপ পর্বেই সে ইচ্ছেপূরণ হয়েছে তার এবং জেসনি জিতেছেনও। একটু বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্ত হলেও তা মেনে নিতেই হয়েছে জেসনি ও পোল্যান্ডকে। এরপর মেসির পেনাল্টি সেভ। ৯৩ গোলের মালিককে দারুণভাবে রিড করে বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাম হাতে পেনাল্টি শট সেভ করেন জেসনি। ওই একটি সেভে পোল্যান্ড হার রুখতে পারেনি। তবুও সেই গোল ফেরানোটা শেষদিকে কতটা কাজে দেয় তা বোঝাই যায় তাদের দ্বিতীয় রাউন্ড যাত্রায়। মেক্সিকোর চেয়ে গোল গড়ে এক গোল কম হওয়ায় তাদের টপকে পরের রাউন্ডে পোল্যান্ড। তবে মেসির পেনাল্টি সেভটাকে ক্যারিয়ারে আলাদা অর্জন বললেন জেসনি। এর জন্য চেষ্টার পাশে ভাগ্যও পেয়েছেন, ‘এই বিশ্বকাপে আমি দুবার ভাগ্যবান ছিলাম। হ্যাঁ, এটাও ঠিক যে আমি খুব পরিশ্রম করেছি নিজেকে নিঁখুত করার জন্য। তবুও যখন আপনি মেসির পেনাল্টি সেভ করবেন তখন আপনার ভাগ্যের দরকার হবেই।’

মেসির সঙ্গে বড় যুদ্ধটা শেষ করে আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি জেসনির। ফ্রান্সের সঙ্গে তার দায়িত্বটা আরও বেশি। অলিভিয়ের জিরু, অ্যান্তোইন গ্রিজমানরা আছেন তবে প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় বিপদ এমবাপ্পেকে নিয়ে। কিন্তু মজার ছলে শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা ৩২ বছর বয়সী জেসনি জানিয়ে দিলেন প্রস্তুত আছেন যে কাউকে থামানোর জন্য, ‘ফ্রান্স ফেভারিট। বিশ্বকাপে তারা অন্যতম সেরা দল। আমরাও নিজেদের সেরাটা দিয়ে এই রাউন্ড পার হওয়ার চেষ্টা করব। আর এমবাপ্পের বিষয়ে যদি বলি, ওকে থামানো মূল বিষয় যদি হয় তাহলে আমাকে থামাবে কে?’ এই আসর দারুণ কাটলেও জেসনির আগের বড় টুর্নামেন্টগুলো সহজ ছিল না। ২০১২ ইউরোতে তারা ছিল স্বাগতিক। সেবার প্রথম ম্যাচেই ইনজুরিতে পড়ে পুরো আসরের জন্য ছিটকে যান। ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষকে বাজে চার্জ করে লাল কার্ড দেখেছিলেন। আর ২০২০ ইউরোতে প্রথম ম্যাচে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে আত্মঘাতী গোল করেন। কিন্তু চলতি বিশ্বকাপের সাফল্য জেসনিকে আগের সবকিছু ভুলে যেতে সাহায্য করবে। অতীত ভুলে তাই সর্বোচ্চ উপভোগ করছেন এবার। এমনটাই যে গত ম্যাচে রেফারির পেনাল্টি সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে মেসির সঙ্গে ১০০ ইউরো বাজি ধরেছিলেন। সেই ঘটনার বিষয়ে জানিয়ে জেসনি বলেন, ‘আমি ওকে বলেছিলাম ১০০ ইউরো বাজি ধরো রেফারি পেনাল্টি দেবে না। কিন্তু আমি হেরেছি। জানি ফিফা এটা জানলে আমাদের বহিষ্কার করে দিতে পারে। অবশ্য এটা নিয়ে আর ভাবছি না। আমরা দুজনই এখন পরের রাউন্ডে। মেসিও হয়তো ১০০ ইউরো নেবে না কারণ এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ তার আছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত