যুক্তরাজ্যে ধীরে ধীরে তীব্র খাদ্য সংকট ধেয়ে আসছে বলে সতর্কতা জারি করলেন দেশটির কৃষকদের সংগঠন ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়ন (এনএফইউ)। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে- জ্বালানি ও সারের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে টমেটো, শসা, নাশপাতিসহ ও অন্যান্য ফল ও শাকসবজির উৎপাদন কমানোর পরিকল্পনা নিচ্ছেন কৃষকরা। ইতোমধ্যেই বিগত বছরগুলোর তুলনায় বাজারে শাকসবজি ও ফলমূলের যোগান উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে।
এছাড়া হাঁস-মুরগির খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ও বার্ড ফ্লুর সংক্রমণের ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হাঁস-মুরগি মের ফেলায় বর্তমানে বাজারে ডিম ও হাঁস-মুরগির দাম প্রতিদিন বাড়ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
হাঁস-মুরগির খাবারের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে ব্যাপক হারে বেড়েছে পশুখাদ্যের দামও। বর্তমান বাজারে পশুখাদ্যের যে দাম, তা দুধের দামের চেয়ে বেশি। এছাড়া পশুখাদ্যের দামের উর্ধ্বগতির কারণে কৃষকরা তাদের গবাদি পশুর বংশবিস্তারেও নিয়ন্ত্রণ আনার পরিকল্পনা করছেন। ফলে অদূর ভবিষ্যতে মাংসের দামও বেড়ে যাবে।
এনএফইউয়ের প্রেসিডেন্ট মিনেটে ব্যাটারস বিবিসিকে বলেন, ‘জ্বালানি, সার ও পশুখাদ্য- আধুনিক কৃষির এই অত্যাবশ্যক উপাদানগুলোর দাম যুক্তরাজ্যে বেড়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। আমাদের হিসাব বলছে, ২০১৯ সালের তুলনায় বর্তমানে বাজারে এই তিন উপাদানের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ।’
‘কৃষির কাঁচামালের দাম অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোমধ্যে খাদ্যপণ্যের বাজারে তার প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে। আমরা যদি কেবল ডিমের বাজারে মনযোগ দেই, সেক্ষেত্রে আমি বলব- ডিম উৎপাদনে আমাদের ব্যাপক সাফল্য আছে এবং দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাজ্য ডিমে স্বয়ংসম্পূর্ণ। গত বছর পর্যন্ত আমাদের এই সাফল্য ছিল; কিন্তু প্রতিবছর গড়ে যুক্তরাজ্যের যে পরিমাণ ডিমের উৎপাদন হয়, চলতি বছর তার চেয়ে ৩২ কোটি ডিম কম উৎপাদন হয়েছে।’
এছাড়া সার ও জ্বালানির দাম বাড়ায় শাকসবজি ও ফলমূলের চাষ রীতিমতো হুমকির মুখে রয়েছে উল্লেখ করে এনএফইউ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘মূল ব্যাপার হলো- সরকার খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দেবে কিনা। যদি সরকার এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে কৃষকরা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে। উৎপাদন কম হলে বাজারে পণ্যের যোগান কম আসবে এবং খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে থাকবে। ফলে দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যাবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
খুচরা খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা যে চলতি বছর ব্যাপক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা স্বীকার করেছেন দেশটির খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়ামের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু ওপিয়েও। বিবিসিকে তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর খাদ্যপণ্যের পাইকারি ক্রয় বাবদ অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে খুচরা ব্যবসায়ীদের।
বিবিসির নিজস্ব বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্রিটেনের খুচারা বাজারে দুধ-ডিম-পনির-শাকসবজি-মাংসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের যে দাম, তা গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
দেশের কৃষকদের আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের দাবি জানিয়ে এনএফইউয়ের প্রেসিডেন্ট মিনেটে ব্যাটারস বলেন, ‘সরকার যদি কৃষকদের প্রণোদনা না দেয়, সেক্ষেত্রে কৃষকরা তাদের পেশা ছাড়তে বাধ্য হবে। ব্রিটেনে ইতোমধ্যে গত তিন বছরে প্রায় ৭ হাজার নিবন্ধিত কৃষি খামার বন্ধ হয়ে গেছে।’
গত কয়েক মাস ধরেই বিভিন্ন সংস্থা হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল চলতি বছরের খরা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্যে কৃষি উৎপাদন কমে যাবে এবং শীতকালে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেবে। এবার দেশটির কৃষকরাও একই কথা বললেন।
