রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কি কেবলই একজন ‘নারী লেখক’, কেবলই একজন ‘নারীবাদী চিন্তক’, কেবলই নারীশিক্ষার বিস্তার ঘটানো সফল ‘শিক্ষা আন্দোলনকারী’, নাকি সমাজে নারী-পুরুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখানো একজন ভবিষ্যবাদী ‘চিন্তক-সমাজ সংস্কারক’? রোকেয়াকে আমরা কীভাবে স্মরণ করছি, রোকেয়ার কর্ম ও জীবনকে কীভাবে পাঠ করছি আর তাকে কীভাবে উপস্থাপন করছি নতুন প্রজন্মের কাছে? আজ ‘রোকেয়া দিবস’-এ এসব প্রশ্নের সদুত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ এই মীমাংসা ছাড়া আজকের বাংলাদেশ কিংবা বৈশি^ক বাস্তবতায় রোকেয়ার চিন্তা ও সংগ্রামকে আমরা যথাযথভাবে বুঝতে পারব না।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ছেলেবেলায় পাঠ্যবই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক পরিসরে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আমাদের কাছে উঠে এসেছেন প্রথমত শতবর্ষ আগের একজন মুসলিম নারী লেখক হিসেবে, দ্বিতীয়ত মুসলিম সমাজে নারীশিক্ষার প্রসারে সফল সংগঠক হিসেবে। আরেকটু বড় হয়ে এই দুইয়ের সঙ্গে তৃতীয় যে পরিচয়ে তাকে আমরা জেনেছি তা একজন সংগ্রামী বাঙালি নারীর, যিনি ব্রিটিশ উপনিবেশকালে অবিভক্ত বাংলায় নারী জাগরণের অগ্রদূত। আরও পরে এসে আমরা রোকেয়াকে আলোচিত হতে দেখছি নারীবাদী চিন্তক পরিচয়ে। আসলে এদেশে আমাদের বেড়ে ওঠার কালে কিংবা এখনো সমাজের বিভিন্ন অংশে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে নিয়ে যে চর্চা তা এমন বহু পরিচয় আর বহু ব্র্যাকেটে বন্দি হয়ে থাকা রোকেয়ার। সামগ্রিকভাবে রোকেয়ার পাঠ আর রোকেয়ার উপস্থাপন আমরা এখনো করে উঠতে পারিনি।
রোকেয়া সবচেয়ে বেশি আলোচিত নারীশিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। আমরা তাকে বাংলায় নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে স্মরণ করি। কিন্তু একথা বলি না যে, কেবল বাংলা নয়, অবিভক্ত ভারত কিংবা দক্ষিণ এশিয়ারও নারী শিক্ষা, নারী আন্দোলনের তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। নারীর সার্বিক মুক্তি ও নারী-পুরুষের সমান অধিকার অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রোকেয়া নারীশিক্ষার বিস্তার চেয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘‘আমাদের শয়নকক্ষে যেমন সূর্যালোক প্রবেশ করে না, তদ্রƒপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পায় না।...পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয় তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডী কেরাণি হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী ব্যারিষ্টার, লেডী জজ সবই হইব।’’ খেয়াল করা দরকার রোকেয়া নারীর শিক্ষাকে কেবলই ‘দুই কলম বিদ্যার্জন’ হিসেবে দেখতে চাননি। শিক্ষার প্রশ্নকে তিনি যেমন জ্ঞানার্জনের ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন তেমনি জীবিকার প্রশ্ন তথা সমাজ-রাষ্ট্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ও দায়িত্বপালনের ভিত্তি হিসেবেও দেখেছেন।
নারীশিক্ষা বিস্তারে রোকেয়ার সে সংগ্রাম যে বৃথা যায়নি সে কথা আমাদের সবারই জানা। শত বছরের ব্যবধানে শত বাধাবিপত্তি পেরিয়ে আজ রোকেয়ার মাতৃভূমি বাংলাদেশে নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশে এখন সার্বিকভাবে শিক্ষায় পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ বেশি। প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫০ দশমিক ৫৪ শতাংশই এখন নারী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মতোই উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায়ও ছাত্রীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু রোকেয়ার সংগ্রাম অব্যাহত রাখা যে এখনো কতটা জরুরি তা নিত্যই এই সমাজে রাষ্ট্রে স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান। নারীর শিক্ষা ও স্বাধীন জীবিকার যে তাগিদ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন আমরা সেই লক্ষ্য এখনো বাস্তবায়ন করতে পারিনি। একালেও সমাজের একটা বড় অংশ লেখাপড়া করে নারীর শিক্ষিত হওয়া মেনে নিলেও বিয়ের পর চাকরি করে স্বাবলম্বী হওয়া মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে স্বাধীনভাবে কর্মসংস্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশের নারীদের এখনো পিছিয়ে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষা, গবেষণা, সরকারি- বেসরকারি কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অংশগ্রহণ করলেও নারীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সমাজ ও রাজনীতিতে তীব্রভাবেই বিদ্যমান। সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীর ‘কাজী’ হওয়া আটকে দেওয়ার অপচেষ্টা কিংবা নারী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ গার্ড অব অনার দিতে বাধা দেওয়ার অপচেষ্টায় রাষ্ট্রীয় পরিসরের বাস্তবতটা বোঝা যায়।
নিজ সময়ে রোকেয়ার শিক্ষাভাবনা ও শিক্ষাবিস্তারের সংগ্রামের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতার একটা তুলনা আমরা দেখলাম বটে। কিন্তু লেখক-চিন্তক-সমাজসংস্কারক হিসেবে রোকেয়ার সামগ্রিক মূল্যায়ন এমন ছোট পরিসরে সম্ভব নয়। তবু নারীবাদী-কল্পবিজ্ঞান লেখক হিসেবে রোকেয়ার বিশেষ কৃতিত্বের বিষয়টি আলোচনা জরুরি। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে রোকেয়ার নারীবাদী-কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসটি একদিকে যেমন তার নারীবাদী চিন্তার এক বিশেষ রূপকে সামনে নিয়ে আসে তেমনি কল্পবিজ্ঞানের বিচারেও এই রচনা বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। সরাসরি বলা ভালো, রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ আমাদের জানা মতে, কেবল বাংলা বা ভারত নয় পৃথিবীর প্রথম নারীবাদী-কল্পবিজ্ঞান কাহিনী।
আজ থেকে ১১৭ বছর আগে ১৯০৫ সালে ইন্ডিয়ান লেডিস ম্যাগাজিনে আর এস হোসেন নামে ‘সুলতানাস ড্রিম’ নামে ইংরেজি ভাষায় এই নারীবাদী-কল্পবিজ্ঞান কাহিনী লিখেছিলেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। এরপর ১৯২২ সালে, অর্থাৎ ঠিক একশ বছর আগে রোকেয়া নিজেই কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে উপন্যাসটি ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে বাংলায় অনুবাদ করেন। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ পড়লে যে বোঝা যায় সেকালের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমসাময়িক বিজ্ঞান চর্চার বিষয়ে রোকেয়ার একটি স্বচ্ছ ধারণা ছিল। উপন্যাসটি আসলে উচ্চমানের এবং আদর্শ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী যা একইসঙ্গে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার সার্থক রূপায়ণও। সেকালে এবং বহু পরেও এই রচনাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি।
খেয়াল করা দরকার, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞানের ছাত্রী না হয়েও তিনি বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎমুখী যে সব উৎকর্ষের চিন্তা করেছিলেন একালে আমরা সেসবই বাস্তবায়িত হতে দেখেছি। সুলতানার স্বপ্নে বর্ণিত ভবিষ্যবাদী বিজ্ঞানের উপাদানগুলোর মধ্যে কেবল একটির কথাই এখানে উল্লেখ করছি। সেটা উড়োজাহাজ। আমরা জানি, ১৯০৩ সালে আকাশে উড়লেও রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের উড়োজাহাজের কারিগরি বৃত্তান্ত ১৯০৮ সালের আগে বিস্তারিত কোথাও প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৫ সালে। এছাড়া রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের বিমানের ইঞ্জিন চালু হয়েছিল শুষ্ক-ব্যাটারি ও চার অশ্বশক্তির তেলের-ইঞ্জিন দিয়ে। আর রোকেয়ার ‘বায়ুযান’ বা উড়োজাহাজ চালু ও চালিত হয়েছিল বিদ্যুৎ দিয়ে। এই বিবেচনায় রোকেয়ার কল্পবিজ্ঞান তখনকার বাস্তবতার চেয়ে নিদেনপক্ষে একশ বছর এগিয়ে ছিল!
সুলতানার স্বপ্নে রোকেয়া লিখেছিলেন, ‘এখানে আপনি কোনো পুরুষের সামনে পড়বেন না। কারণ এ দেশের নাম নারীস্থান। এখানে স্বয়ং পুণ্য নারীবেশে রাজত্ব করেন।’ রোকেয়া সেকালে নারী-পুরুষের সমমর্যাদা ও অংশগ্রহণের একটা ভবিষ্যবাদী চিত্রকল্প হাজির করেছিলেন এই রচনায়। আর তিনি সেটা করেছিলেন, পাশার ছক পুরোপুরি উল্টে দিয়ে। অর্থাৎ বাস্তব দুনিয়ায় নারীকে অন্তঃপুরে আটকে রেখে পুরুষের দুনিয়া শাসনের বিপরীত চিত্র তিনি এঁকেছিলেন সুলতানার স্বপ্নে। যে সময়ে তিনি ‘নারীস্থান’-এ পুরুষকে সন্তান আর ঘর-সংসারের দায়িত্ব দিয়ে নারীকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে দিয়েছিলেন সেই পৃথিবীতে তখনো কোনো দেশে-রাষ্ট্রেই নারীদের ভোটাধিকার বলেও কিছু ছিল না। এখনকার সংজ্ঞায় ‘নারী-অধিকার’ বলেও কোনো কিছু ছিল না। কিন্তু তিনি দেখিয়েছিলেন দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিলে কীভাবে নারী ও পুরুষরা মিলে একটা আদর্শ ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। কারণ পুরুষরা শাসন করে পেশিশক্তি দিয়ে যার লক্ষ্য থাকে ক্ষমতা; আর নারীরা শাসন করে বুদ্ধি ও মমতা দিয়ে যার লক্ষ্য শান্তি ও কল্যাণ। আর সেটা হতে পারে তখনই যখন ‘নারীস্থানে’ পুরুষরা নারীর মতোই ‘মাতৃত্বের গুণাবলি’ তথা সৃজন ও রক্ষণের গুণাবলি অর্জন করতে পারে। আজকের সহিংসতা-হানাহানিতে জর্জরিত বাংলাদেশ কিংবা আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে রোকেয়ার স্বপ্নের সেই ‘নারীস্থান’ ভীষণভাবেই প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কি তা মেনে নিতে প্রস্তুত? শান্তি ও কল্যাণে ব্রতী রোকেয়ার সেই নারীস্থান কত দূরে?
লেখক : দেশ রূপান্তরের সহকারী সম্পাদক
