তবে কি ফাইনালটা হতে যাচ্ছে লিওনেল মেসি বনাম ফ্রান্স? বুধবার রাতে মরক্কোকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখা ফ্রান্সের কোচ থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের কথা শুনলে তাই মনে হবে। টানা দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পথে আর্জেন্টিনা নয়, ফ্রান্সের বড় প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসি। তাকে থামাতে পারলেই হবে ফরাসিদের লক্ষ্যপূরণ। তাই বুধবার রাত থেকেই ফরাসি শিবিরে পড়েছে মেসির ছায়া, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কঠিন মরক্কো-পরীক্ষা উতরে যাওয়া থেকেই ফরাসিদের ভাবনায় ফাইনাল। ক্রোয়েশিয়াকে কাঁদিয়ে যেখানে আগে থেকেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা। সাদা-আকাশিদের মহামঞ্চে নিয়ে আসতে পুরো আসরেই বারবার বিস্ফোরিত হয়েছেন মেসি। অনেকের মতে, ক্রোয়াটদের বিপক্ষেই এ আসরের সেরা খেলাটা খেলেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। সেই ম্যাচ শেষে মেসি নিশ্চিত করে দিয়েছেন, বিশ্বকাপ মঞ্চে শেষ ম্যাচ খেলবেন ১৮ ডিসেম্বর। লুসাইল স্টেডিয়ামের রাতটা আরেকবার নিজের করে নিতে চান, পেতে চান বিশ্বকাপের স্বাদ। তাই সে রাতে নিজেদের উজাড় করে দেওয়ার কথা বলেছেন। তাতে বোঝাই যাচ্ছে, নিজের সেরাটা মেসি তুলে রেখেছেন ১৮ ডিসেম্বরের জন্য। সেখানেই তাকে আরেকবার দিতে হবে শ্রেষ্ঠত্বের।
মেসি যদি ফুটবল রাজ্যের মহারাজা হন, এমবাপ্পে সেই রাজ্যের ভাবী রাজা। পিএসজি সতীর্থ দুই তারকাই স্বমহিমায় ভাস্বর। একজন দাঁড়িয়ে ক্যারিয়ারের ক্রান্তিলগ্নে। আরেকজনের এই তো শুরু। দীর্ঘ দুই দশক দুনিয়াকে সম্মোহিত করে রেখেছেন বাঁ পায়ের জাদুকর। আর গত কয়েক বছরে গতি, ড্রিবল আর নিখুঁত ফিনিশে দৃষ্টি কেড়েছেন এমবাপ্পে। মেসির মতোই ক্লাব ও জাতীয় দল, দুই জায়গাতেই দারুণ উজ্জ্বল ফরাসি তারকা। একটা জায়গায় মেসির চেয়ে এগিয়ে ২৩ বছরের এমবাপ্পে। ২০০৬-২০১৮, চার বিশ্বকাপ থেকে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে মেসিকে। কাক্সিক্ষত শিরোপা ছুঁয়ে দেখা হয়নি কখনই। অথচ এমবাপ্পে তার প্রথম বিশ্বকাপেই পেয়েছেন শিরোপার স্বাদ। এই ফাইনালটাও যদি জিতে যান, তবে এমবাপ্পেকে মেসির কাতারে নিয়ে যেতে বাধ্য হবে। সেটা হলে মেসিকে সিংহাসন ছেড়ে বিদায় নিতে হবে মুকুটহীন সম্রাট হয়ে। এই পরিণতি যে সহজে মেনে নিতে চাইবেন না ভীষণ ছন্দে থাকা এলএমটেন, সেটা খুব বুঝতে পারছেন ফ্রান্সের কোচ-ফুটবলাররা। একদিকে মেসির প্রশংসাও করছেন, আবার এই মেসিকেই থামিয়ে ব্রাজিলের পর দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের প্রতিজ্ঞা তাদের কণ্ঠে।
কোচ হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার ফ্রান্সকে ফাইনালে তোলা ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক দিদিয়ের দেশমের চোখে চার বছর আগের মেসি আর এখনকার মেসি এক নয়, ‘সে (মেসি) আসরের শুরু থেকেই সপ্রতিভ। চার বছর আগে আমাদের বিপক্ষে দেখেছি সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলতে। ও এখন খেলছে স্ট্রাইকার পজিশনে। অনেক বেশি স্বাধীন, অনেক বলে থাকছে স্পর্শ এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার তাকে অনেক ফিট দেখাচ্ছে।’ তবে কি দেশম মেনে নিচ্ছেন মেসিই বিশ্বসেরা? এমন প্রশ্নের জবাবটা ফরাসি কোচ দিয়েছেন ঘুরিয়ে, ‘আমরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করব তাকে অকার্যকর করে রাখতে। এই একই কাজটা আমাদের কিছু খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনা করতে চাইবে। আর্জেন্টিনাও এখন আর এক-দুজননির্ভর দল নয়। চার বছর আগের অবস্থানে নেই দলটি।’ ফরাসি ফরোয়ার্ড আন্তোইন গ্রিজমান সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ মেসির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আতলেতিকো মাদ্রিদ তারকার কথায় মিলেছে কঠিন এক লড়াইয়ের আভাস, ‘মেসিকে নিয়ে যে দলই খেলবে, সেই দলটাই হয়ে উঠবে দুর্ধর্ষ। আমরা আর্জেন্টিনাকে এবার যতটুকু দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে তাদের বিপক্ষে খেলা সত্যিই কঠিন। শুধু মেসি নয়, পুরো দলটাই দুর্দান্ত ফর্মে আছে। ফাইনালে তারা গ্যালারি থেকেও অনেক বেশি সমর্থন পাবে। তাই আমাদের সেরা প্রস্তুতি নিয়েই নামতে হবে।’
মরক্কোর বিপক্ষে শুরুতেই ফ্রান্সকে এগিয়ে নেওয়া লেফটব্যাক থিও হার্নান্দেজকে ফাইনালে মেসির কাছে দিতে হবে বড় পরীক্ষা। এই মেসিকে থামানোর কৌশলটা তিনি কতটা রপ্ত করতে পারবেন, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। তবে সেই প্রস্তুতি শুরুর আগেই মেসির প্রশংসা করেছেন এসি মিলান তারকা, ‘তারা দুজনই সেরা। তবে এই আসরে মেসি অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলছে। একই সঙ্গে তার সতীর্থকেও ভালো খেলতে সহায়তা করছে। যেমনটা এমবাপ্পের ক্ষেত্রেও করে (পিএসজির হয়ে)। ফাইনালে দুটি দলেরই গুরুত্বপূর্ণ শিরোপাটা জয়ের সুযোগ আছে। আর্জেন্টিনা আমাদের মতোই দারুণ খেলছে। আমার মনে হয় লড়াইটা হবে শেষ পর্যন্ত।’ ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিতে আসা ফ্রান্সের হয়ে অসাধারণ গোল করেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার অঁরেলিয়ে শুয়ামেনি। তিনি অবশ্য মেসির চেয়ে এমবাপ্পেকে এগিয়ে রাখছেন। আর সেটা ফাইনালেই প্রমাণিত হবে, বিশ্বাস তার ‘আমার কাছে এমবাপ্পেই বিশ্বসেরা; সেটা আমরা ফাইনালেই প্রমাণ করব।’
এই আসরে সমান্তরালে হাঁটছেন মেসি ও এমবাপ্পে। ৫ গোল করে দুজনই গোল্ডেন বুটের অন্যতম দাবিদার। গোল্ডেন বলের ক্ষেত্রেও লড়াইটা দুজনের মধ্যে। যার দল বিশ্বকাপ জিতবে, গোল্ডেন বলটা তিনিই জিতবেন, এমনটাই আলোচনা। কিছুদিন আগেই এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে বলেছিলেন, ‘সময় এখন নতুনের। মেসি-রোনালদোকে এবার থামতে হবে, তাদের জায়গা নেবে নতুন প্রজন্মের অন্য কেউ।’ কথাটা নিজেকে উদ্দেশ করেই বলা ফরাসি তারকার।
আর সেটা প্রমাণের সেরা মঞ্চ রবিবারের ফাইনাল। কথার প্রমাণ দিতে মেসিকে ছাপিয়ে সেরা হতে হবে এমবাপ্পেকে। আর ক্লাব ফুটবলে বিশ্বের তর্কাতীত সেরা মেসি চাইবেন আর্জেন্টাইন জার্সিতে অমরত্ব পেতে।
