ভর্তির আগেই শিক্ষাজট

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:৫২ এএম

সাধারণত প্রত্যেক ইংরেজি বছরের নভেম্বরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়। করোনার কারণে ২০২০ সাল থেকেই এ রীতিতে ছন্দপতন ঘটে। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেরিতে শুরু ও শেষ হওয়ায় পিছিয়ে যায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া। দুই বছর ধরে ভর্তির আগেই এক বছরের সেশনজটে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সবার চেয়ে দেরিতে ভর্তি হতে হচ্ছে ৩২ গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।

২০২১ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শেষ হয় গত বছর ৩০ ডিসেম্বর। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ভর্তি প্রক্রিয়া সবেমাত্র শেষ হয়েছে। অথচ একই সময়ে পাস করে যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তাদের পঠনক্রমের এক বছর পার হয়ে গেছে। এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষাও শেষ হয়েছে ১৩ ডিসেম্বর। অথচ এর আগেই তাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে প্রস্তুতি তাতে তাদেরও ভর্তির জন্য অন্তত এক বছর বসে থাকতে হবে।

জানতে চাইলে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ও চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন গুচ্ছভর্তি শুরু হয়েছিল তখন ভর্তিতে বেশ কিছুটা দেরি হয়েছিল। এ বছর আমরা কম সময়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করেছি। ভর্তির সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছর সময় আরও কমে আসবে।

শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, অনেক দিন ধরেই পাবলিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হয়। এবারও ব্যতিক্রম হবে না। এইচএসসি পরীক্ষা যেহেতু ১৩ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে, আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারির আগেই ফল প্রকাশ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যদি ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হয়, তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন ফল প্রকাশের সাত-আট মাস পর ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করবে? মার্চেই কেন ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করা যায় না? হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটু বেশি চাপ নিতে হবে, তবে শিক্ষার্থীদের জীবনের ছয়-সাত মাস তো রক্ষা করা সম্ভব।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২০ হাজারের ওপরে। তারা বছরে দুই-তিনবার শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও আসনের চেয়ে কয়েকগুণ শিক্ষার্থী আবেদন করছে। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা শেষে উত্তীর্ণরাই পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম। তবু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার জন্য অনেক সময় লাগছে।

জানা যায়, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে গত দুই বছর ধরে বড় পরিসরে চালু হয়েছে গুচ্ছভর্তি পরীক্ষা। অথচ এ পরীক্ষাতেই বেশি সময় লাগছে। গুচ্ছভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে ৩২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত। তাই ইচ্ছে করলেই কেউ উদ্যোগ নিয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারছে না। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মতো ভর্তি করছে। ফলে একই শিক্ষার্থীর নাম একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাতালিকায় আসছে। পদ্ধতিগত জটিলতায় তাদের ভর্তি সম্পন্ন করতে পাঁচ-ছয় মাস লেগে যাচ্ছে। তবে যেসব বড় বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছের বাইরে আছে তারা কিছু আগে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করতে পারছে। নাম প্রকাশ না করে গুচ্ছভুক্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত তৃতীয় বা চতুর্থ স্টেপে শিক্ষার্থীরা গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসে। প্রথমে মেডিকেল, এরপর ইঞ্জিনিয়ারিং, তারপর বড় বিশ্ববিদ্যালয়; একেবারে শেষে শিক্ষার্থীরা গুচ্ছে আসে। যদি আমরা আগে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করি, তাহলে দেখা যাবে, অনেক শিক্ষার্থীই ভর্তির পর অন্যত্র চলে যাবে। তাই গুচ্ছ নয়, সবাইকে সমন্বিতভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এখন এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, এখনই ভর্তির আলোচনা শুরু করতে হবে, যাতে ফল ঘোষণার পরই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এ উদ্যোগ নিলে ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করা যায়।

আগে সাধারণত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি শেষ হওয়ার পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হতো। গত দুই বছরে এ ব্যবস্থা থেকে তারা অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে এখন ভর্তি পরীক্ষা হয় না, জিপিএর ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তারা এ বছর সবার আগে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করেছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়া শেষে এ বছরের ৩ জুলাই ক্লাস শুরু করলেও গুচ্ছভুক্ত ৩২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাই শেষ হয়েছিল সেপ্টেম্বরে। আগামী বছরও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আগেই ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউজিসি সূত্র জানায়, দেশে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৫৩টি। এসবের মধ্যে শিক্ষাকার্যক্রম চালু আছে ৫১টির। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরাসরি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত